জীবনের সবটুকু ভালোবাসা আর ত্যাগ দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছিলেন ৮০ বছর বয়সী আরশের নেছা। অথচ বার্ধক্যে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়িতে। দুই ছেলের পাকা দ্বিতল ভবন থাকা সত্ত্বেও বাইরে মানবেতর অবস্থায় বসবাস করা এই বৃদ্ধা মায়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাকে ছেলেদের বাড়ির একটি কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঞ্ছারামপুর পৌর এলাকার টিএনটি পাড়ার বাসিন্দা আরশের নেছার চার ছেলে—রহিম, মোমেন, হুমায়ুন ও প্রয়াত ইয়াছিন এবং এক মেয়ে রয়েছেন। দুই ছেলের আলিশান দ্বিতল ভবন থাকলেও বৃদ্ধা মাকে বাড়ির বাইরে একটি খুপরিতে থাকতে হতো। বৃষ্টি, রোদ ও মশার যন্ত্রণার মধ্যে অসুস্থ অবস্থায় মানবেতর জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি।
রবিবার (১২ জুলাই) বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে রাত ১০টার দিকে উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসে। এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তারিকুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. রবিউল হাসান ভূঁইয়া এবং উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শাহ জালাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে বৃদ্ধা মায়ের জন্য ছেলেদের ভবনের ভেতরে একটি কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে শুকনো খাবার ও নগদ ১০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘একজন বাবা কিংবা মা বার্ধক্যে বিলাসবহুল জীবন চান না। তাঁরা শুধু চান সন্তানের ঘরে একটুখানি জায়গা, দুই বেলা দুমুঠো ভাত আর একটু সম্মান। আজ আমরা সন্তান, একদিন আমরাও বৃদ্ধ হব। তাই পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ববোধ সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কি সত্যিই সভ্য হচ্ছি, নাকি শুধু আমাদের বাড়িগুলো পাকা হচ্ছে অথচ হৃদয়গুলো পাথরে পরিণত হচ্ছে—এই প্রশ্ন আজ আমাদের সবার সামনে।’
ইউএনও জানান, পরিবারটির বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
বৃদ্ধা আরশের নেছার কাছে সন্তানদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে বৃদ্ধার বড় ছেলে ব্যবসায়ী হুমায়ুন মিয়া মুঠোফোনে বলেন, ‘আমিসহ আমরা সবাই মায়ের সঙ্গে অন্যায় করেছি। আমাদের ভুল হয়েছে। এখন থেকে আর মাকে ঘরের বাইরে রাখব না। ভবনের ভেতরেই রাখব।’
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (১৩ জুলাই) হুমায়ুন মিয়া ও রহিম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ভবিষ্যতে মায়ের প্রতি কোনো ধরনের অবহেলা করবেন না—মর্মে লিখিত মুচলেকা দেন এবং নিজেদের ভুলের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেন।




