জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া-বাইগুনি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা বিএনপির সদস্য এবং প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি সদস্য আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন, সরকারি প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) অনুযায়ী কাজ না করা, শ্রমিকের পরিবর্তে এক্সকাভেটর (ভেকু) ব্যবহার, খননকৃত মাটি বিক্রি, ভুয়া মাস্টাররোল তৈরি, প্রকৃত দরিদ্র শ্রমিকদের বাদ দিয়ে বিত্তবান ব্যক্তি ও স্বজনদের শ্রমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং বৃক্ষরোপণের বরাদ্দের যথাযথ ব্যবহার না করার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের সভাপতি বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারি নীতিমালা ও প্রাক্কলন অনুসরণ না করেই দায়সারাভাবে কাজ এবং নানা অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাটের চেষ্টা করেছেন।
কালাই উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উদয়পুর ইউনিয়নের তালোড়া-বাইগুনি খাল পুনঃখনন প্রকল্পে প্রায় ৫২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির আওতায় ২ হাজার ১০০ মিটার খাল পুনঃখননের পাশাপাশি খালের পাড় সংরক্ষণ ও পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় নয় লাখ টাকা ব্যয়ে নারিকেল গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় গত ১৩ মে এবং শেষ হওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল ২৯ জুন ২০২৬। সরকারি সিডিউল অনুযায়ী খালের ওপরের প্রস্থ ২০ ফুট, গ্রামের ভেতরের কিছু অংশে ১৫ ফুট, তলদেশের প্রস্থ ৮ ফুট এবং গভীরতা ৫ ফুট রেখে ১২৫ জন শ্রমিকের মাধ্যমে খননকাজ সম্পন্ন করার কথা ছিল।
তবে সরেজমিন দেখা গেছে, সরকারি প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) ও বাস্তব কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে। খালের অল্প কিছু অংশ ছাড়া অধিকাংশ স্থানে নির্ধারিত প্রস্থ ও গভীরতা বজায় রাখা হয়নি। কোথাও কোথাও তলদেশের প্রস্থ মাত্র ৫ ফুট পাওয়া গেছে, আবার কোথাও প্রায় ৫০০ মিটার এলাকায় খননের কোনো চিহ্নই মেলেনি। আবার কোথাও দীর্ঘ অংশজুড়ে কচুরিপানা অপসারণ না করায় পানি চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক স্থানে কেবল উপরের অংশ সামান্য কেটে দায়সারাভাবে কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে অল্প সময়ের মধ্যেই খালটি পুনরায় ভরাট হয়ে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পে ১২৫ জন শ্রমিকের মাধ্যমে কাজ হওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ সময় মাঠে শ্রমিকের দেখা মেলেনি। প্রায় পুরো কাজই এক্সকাভেটর দিয়ে করা হয়েছে। অথচ কাগজে-কলমে ১২৫ জন শ্রমিকদের নামে মাস্টাররোল প্রস্তুত করে সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। অনেক দরিদ্র মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে ব্যাংক হিসাব খোলা হলেও পরে তাদের কাজে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে এবং অনেকেই এখনো কোনো মজুরি পাননি।
অন্যদিকে প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে বিত্তবান ব্যক্তি, আত্মীয়-স্বজন ও প্রভাবশালীদের শ্রমিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও উঠেছে। একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বর্ষা মৌসুমে পানির মধ্যে কাজ দেখিয়ে অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরির জন্যও ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ ধীরগতিতে পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের বিল প্রস্তুত ও পরিমাপের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের কর্মসংস্থান কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়েছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
প্রকল্পে প্রায় নয় লাখ টাকা ব্যয়ে নারিকেল গাছ রোপণের কথা থাকলেও সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ গাছই শুকিয়ে মারা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের চারা, যথাযথ পরিচর্যার অভাব এবং দায়সারাভাবে কাজ করায় সরকারি এই বরাদ্দের সুফলও পাওয়া যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন তালিকাভুক্ত শ্রমিক জানান, প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে অনেকেই ভয় পান। শ্রমিক তালিকায় প্রকৃত দরিদ্র মানুষের পরিবর্তে বিত্তবান ব্যক্তি, ব্যবসায়ী এবং প্রকল্প সভাপতির আত্মীয়- স্বজনদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা মাঠে কাজ না করলেও তাদের নামে সরকারি টাকা উত্তোলন করে আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রভাবের কারণে অভিযোগ করেও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি।
বাইগুনী গ্রামের বাসিন্দা সুমীর জালাল বলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি সম্পূর্ণ সাজানো। লোক দেখানোভাবে কাজ করে সরকারি অর্থ লুটপাটের চেষ্টা চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের কিছু কর্মকর্তাও কমিশনের মাধ্যমে এসব অনিয়মে সহযোগিতা করছেন। অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি।’
বাইগুনী গ্রামের পল্লী চিকিৎসক আব্দুল জলিল মন্ডল বলেন, ‘সরকারি নকশা অনুযায়ী খাল খনন করা হলে এলাকার কৃষকরা উপকৃত হতেন। কিন্তু যেভাবে কাজ হয়েছে, তাতে এক বর্ষাতেই আবার খাল ভরাট হয়ে যাবে। এতে সরকারের কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল জনগণ পাবে না।এটা উন্নয়ন নয়, প্রকল্পের নামে বড় ধরনের পুকুরচুরি।’
তবে প্রকল্প সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আমজাদ হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার খাল কাটা শতভাগেরও বেশি হয়েছে। সঠিকভাবে পরিমাপ করলে কোথাও নির্ধারিত মাপের চেয়েও বেশি পাওয়া যাবে। কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় কিছু জায়গায় বেশি গভীর করে খনন করা হয়েছে। মাটি বিক্রি কিংবা স্বজনপ্রীতি করে মাস্টাররোলে নাম দেওয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হাসিবুল ইসলাম বলেন, সরেজমিনে পরিদর্শনে আমরা কিছু স্থানে ইস্টিমেট অনুযায়ী কাজ না হওয়ার বিষয়টি পেয়েছি। যেসব অংশে নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ হয়নি বা কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে, সেগুলোর বিল দেওয়া হবে না। পুনরায় সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করার পরই বিল পরিশোধ করা হবে। শ্রমিক তালিকা, মাস্টাররোল ও অন্যান্য অভিযোগও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম আরা বলেন, ‘সরেজমিনে পরিদর্শনে কিছু স্থানে সরকারি প্রাক্কলন (ইস্টিমেট) অনুযায়ী কাজ না হওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। যেসব স্থানে নির্ধারিত মান ও নকশা অনুযায়ী কাজ হয়নি, সেসব কাজ পুনরায় সম্পন্ন করতে হবে। কাজের প্রকৃত পরিমাণ যাচাই করেই বিল পরিশোধ করা হবে।তদন্তে অন্য কোন অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।সরকারি অর্থের অনিয়ম কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’





