পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার বাকডোকরা খাল খনন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দায়সারা খনন, কালভার্ট নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার এবং শ্রমিকের পরিবর্তে এসকেভেটর দিয়ে বেশিরভাগ কাজ করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এদিকে, অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় কাজ বন্ধ রেখে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের বিশেষ উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী-খালসহ জলাশয় খননের কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের বাকডোকরা খাল খননের উদ্যোগ নেয় উপজেলা প্রশাসন। কাজ শুরু হয় চলতি বছরের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে। বাকডোকরা কুলাডাঙ্গী পুল থেকে পশ্চিমে আব্বাস আলীর জমি পর্যন্ত ৬০৫ মিটার দীর্ঘ খাল খনন, দুটি কালভার্ট নির্মাণ, পাইপ স্থাপন ও বৃক্ষরোপণে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫১ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৫ টাকা।
আটোয়ারী প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য মতে, এর মধ্যে শ্রমিকদের মাধ্যমে খননে ২৫ লাখ ৬২ হাজার ৮০০ টাকা, এসকেভেটর দিয়ে তিন লাখ ৫৬ হাজার টাকা, আরসিসি পাইপ বসাতে ছয় লাখ ৪৭ হাজার টাকা, কালভার্ট নির্মাণে ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮৫০ টাকা, ঘাস লাগানো বাবদ ৭৬ হাজার ৩৮১ টাকা এবং বৃক্ষরোপণের জন্য চার লাখ ৬১ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে প্রকল্পের তথ্যের সঙ্গে এই তথ্যেও গড়মিল দেখা যায়। প্রকল্পের বরাদ্দে দুটি কালভার্ট বাবদ বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ১৬ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে উল্লেখিত স্থানে কোনো খাল না থাকলেও কাগজে-কলমে সেখানে খাল দেখানো হয়েছে। এমনকি খাল খননে বেশিরভাগ কাজ শ্রমিক দিয়ে করানোর কথা থাকলেও শুরুতেই এসকেভেটর (খনন যন্ত্র) দিয়ে করা হয় বেশিরভাগ কাজ। পরে চালানো হয় শ্রমিক দিয়ে লোক দেখানো দায়সারা খনন।
এদিকে, প্রকল্পের শুরুতে একটি কালভার্ট নির্মাণের কথা থাকলেও তা সংশোধন করে জুড়ে দেওয়া হয় আরেকটি কালভার্ট। এই কালভার্ট নির্মাণে ইট রডসহ নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তারা উপজেলা প্রশাসন বরাবর অভিযোগ জানালে কাজ বন্ধ রেখে তদন্তের নির্দেশ দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী।
বিষয়টি তদন্তে উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফয়সালকে প্রধান করে কমিটি গঠন করা হয়।
অন্যদিকে, খাল খনন প্রকল্পের সাত সদস্যের কমিটিতে যাদের রাখা হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই বিএনপি নেতা ও সমর্থক। তবে তারাও জানেন না কী প্রক্রিয়ায় কাজ করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এই খাল খননে শুরু থেকেই অনিয়ম হয়ে আসছে। ঠিকমতো কাজ হয়নি। কালভার্টের কাজ হচ্ছে ইটের গুঁড়ো দিয়ে। এভাবে কাজ হওয়ায় কিছু মানুষের পকেটে টাকা ঢুকলেও সরকারের মহৎ উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।’
কাজল নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে কোনো খাল ছিল না। ফলে প্রয়োজন নেই এমন জায়গায় খাল খনন করায় আমাদের ৯০ শতাংশ মানুষের ক্ষতি হয়েছে। খননের মাটি আমাদের জমির ওপর ফেলা হয়েছে।’
কমিটির সদস্য ময়না বেগম বলেন, ‘আমাকে না জানিয়ে কমিটিতে রাখা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘কাজ করার কথা ছিল শ্রমিক দিয়ে, কিন্তু করা হচ্ছে ভেকু মেশিন দিয়ে। শুনেছি ১১৯ জন শ্রমিকের তালিকা করা হয়েছে, যারা চেয়ারম্যান ও দলীয় লোকজন।’
প্রকল্পের সভাপতি ও আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত ইউপি সদস্য করুনা রানী পাল বলেন, ‘আমার মা অসুস্থ। আমি বগুড়ায় আছি। আমি যেসব জায়গায় প্রয়োজন সাক্ষর দিয়ে আসছি। বাকি সবকিছু করছেন চেয়ারম্যান। কোথায় কী কাজ হয়েছে, ভালো না মন্দ- আমি কিছুই জানি না।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ীই কাজ করছিলাম। কালভার্ট নির্মাণে এক ট্রলি নিম্নমানের ইটের খোয়া আনা হয়েছিল, পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের ৪৩ দিনের কাজ শেষ হয়েছে। তারা মজুরি পেয়ে গেছে। তদন্তের কারণে এখন কাজ বন্ধ রয়েছে।’
আলোয়াখোয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাক্কারুল আলম অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘স্থানীয়দের সঙ্গে পরামর্শ করেই খাল খনন কাজ করা হয়েছে।‘
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবী বলেন, ‘অনিয়মের অভিযোগ মেলায় আমরা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত প্রতিবেদন পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’




