বনগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পটি গড়ে উঠেছে খোয়াই নদীর পাশে। প্রকল্পের ঘরে ঠাঁই মেলে ১৬০টি ভূমিহীন পরিবারের। তবে নিরাপদ আশ্রয়টিতে এখন চলছে আতঙ্ক। দীর্ঘদিন ধরে পাশেই চলছে অবৈধভাবে বালু তোলা। এতে প্রকল্পের ঘর নদীভাঙনের শিকার হতে পারে—এমন আশঙ্কা সেখানকার বাসিন্দাদের।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বনগাাঁও এলাকার এই আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘেঁষে ড্রেজারের মাধ্যমে অবৈধভাবে বালু তোলার অভিযোগ ইজারাদারের বিরুদ্ধে। এর সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারাও যুক্ত বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
এদিকে অবৈধভাবে বালু তোলার কারণে নদীভাঙনে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ছাড়াও হুমকিতে পড়েছে আশপাশের কৃষিজমিও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নাকের ডগায় দীর্ঘ দুই মাস ধরে এ কার্যক্রম চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বনগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন এলাকায় খোয়াই নদীতে অন্তত ২৫টি ড্রেজার দিয়ে দিন-রাত বালু তোলা চলছে। বালুমহালের সীমানা নির্ধারণ করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাইনবোর্ড বসানোর কথা থাকলেও ঘটনাস্থলে তা চোখে পড়েনি।
রাজার বাজার বালুমহালের ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের সম্মতিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গত দুই মাস ধরে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তারা বলছেন, ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে নদীর তলদেশ থেকে অবাধে বালু তোলায় নদীর পাড় দুর্বল হয়ে পড়েছে। এতে চলতি বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের ভাঙনের আশঙ্কায় আতঙ্কিত আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বাংলা ১৪৩৩ সনের জন্য প্রায় ২৭ কোটি টাকায় রাজার বাজার বালুমহালের ইজারা পায় রাহী ট্রেডার্স, যা পরিচালনা করছেন সেলিম মিয়া।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের দাবি, অবিলম্বে অবৈধভাবে বালু তোলা বন্ধ করে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৬০টি পরিবারকে যেন রক্ষা করে সরকার।
আইন অনুযায়ী আশ্রয়ণ প্রকল্প, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা এবং আবাসিক এলাকার অন্তত এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে বালু তোলা নিষিদ্ধ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই আইন অমান্য করে প্রকল্পের পাশেই ড্রেজার বসিয়ে বালু তোলা হচ্ছে।
বনগাঁও আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা সরদার আ. জলিল অভিযোগ করে বলেন, ‘শুধু নদী থেকেই নয়, প্রকল্পসংলগ্ন ১৩টি পরিবারের মালিকানাধীন জমিও দখল করে সেখানে বিশাল বালুর ডিপো গড়ে তোলা হয়েছে। একাধিকবার প্রতিবাদ করেও আমরা কোনো প্রতিকার পাইনি।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন এলাকায় স্থানীয় আহম্মদাবাদ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাবরু মিয়া, ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি মোস্তফা হোসেন মস্তু ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা আল আমিনসহ বেশ কয়েকজন বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা বাবরু মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি তা ধরেননি। অন্যদিকে আরেক অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা আল আমিন বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জামায়াত নেতা মোস্তফা মস্তু দাবি করেন, ‘সরকার নির্ধারিত সীমানার মধ্যেই বালু তোলা হচ্ছে। যদি তীরবর্তী বসতবাড়ির কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়, তাহলে আমরা ক্ষতিপূরণ দেব।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জের সহসভাপতি তোফাজ্জল সুহেল বলেন, ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রশাসন যদি ব্যবস্থা না নেয়, তবে আশ্রয়ণের পরিবারগুলো মাথা গোঁজার ঠাঁই হারাবে।
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গালিব চৌধুরী বলেন, বালুর বিষয়টি এসি ল্যান্ড দেখবেন। সব দায়দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তৌফিক আনোয়ার বলেন, শিগগিরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. আবুল হাসেম বলেন, ‘অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। অনিয়মের প্রমাণ মিললে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, ‘কিছুদিন আগে বনগাঁও এলাকা পরিদর্শন করেছি। তখন সব ঠিকটাক ছিল। যদি আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘেঁষে ইজারাদার বালু তোলেন, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’