বেনাপোল স্থলবন্দরে যানজট কমানো, যাত্রীসেবা উন্নত করা এবং পরিবহন ব্যবস্থাকে পরিকল্পিতভাবে পরিচালনার জন্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পৌর বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। তবে জনগণের অর্থে নির্মিত এই অবকাঠামোটি দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর ধরে কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বাস টার্মিনালটি থেকে এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত কোনো জনসেবা পাওয়া যায়নি। দুই দফা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী হয়নি। ফলে কোটি কোটি টাকার প্রকল্পটি আজও কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারেনি।
সম্প্রতি সরেজমিনে কাগজপুকুর এলাকায় নির্মিত বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বিশাল চত্বরটি প্রায় ফাঁকা। যাত্রী ছাউনি, টিকিট কাউন্টার, বাস পার্কিং, অভ্যন্তরীণ সড়কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও সেখানে নেই যাত্রীদের ভিড় কিংবা বাসের নিয়মিত চলাচল। মাঝে মধ্যে দু-একটি বাস অবস্থান করলেও অধিকাংশ সময় টার্মিনালটি জনশূন্য থাকে। অন্যদিকে নোম্যান্সল্যান্ডসংলগ্ন পুরোনো চেকপোস্ট এলাকায় আগের মতোই বাস ওঠানামা করায় প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় টার্মিনালটি এখন মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর নির্জন পরিবেশের সুযোগ নিয়ে সেখানে অসামাজিক কর্মকাণ্ডও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মতে, নিয়মিত বাস চলাচল ও মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে এসব অপতৎপরতা অনেকাংশে কমে আসবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের প্রধান স্থলবন্দর ও আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট হিসেবে বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাতায়াত করেন। একই সঙ্গে শত শত পণ্যবাহী ট্রাকও এ বন্দর ব্যবহার করে। কিন্তু যাত্রীবাহী বাসগুলো এখনো নোম্যান্সল্যান্ডসংলগ্ন পুরোনো চেকপোস্ট এলাকায় প্রবেশ করায় যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই যানজট লেগে থাকে। চেকপোস্ট, বেনাপোল বাজার ও আশপাশের এলাকার মানুষের জন্য এটি দীর্ঘদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। অফিস সময়, সরকারি ছুটি ও উৎসবের মৌসুমে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়।
এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই বেনাপোল পৌরসভা শহরের প্রবেশমুখ কাগজপুকুর এলাকায় আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। বেনাপোল পৌরসভা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাস-ট্রাক টার্মিনাল, পাঁচ কিলোমিটার সড়ক এবং দুই কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণের জন্য প্রথমে ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে জমির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় আরো ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের আবেদন করা হয়।
২০১৭ সালের ২৩ জুলাই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। ২০১৮ সালের মে মাসে নির্মাণকাজ শুরু হলেও অর্থসংকটের কারণে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে নির্মাণ সম্পন্ন হলেও টার্মিনালটি কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. কাজী নাজিব হাসান বেনাপোল পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আজাহারুল ইসলামের নির্দেশনায় ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর আবারও টার্মিনাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। কয়েকদিন বাস চলাচল করলেও মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে পরিবহনগুলো আবার পুরোনো চেকপোস্টে ফিরে যায়। বর্তমানে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষায় টার্মিনালে দু-একটি বাস রাখা হলেও অধিকাংশ বাসই আগের জায়গা ব্যবহার করছে।
পরিবহন-সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন টার্মিনাল পুরোপুরি চালু করা গেলে চেকপোস্ট এলাকার দীর্ঘদিনের যানজট অনেকটাই কমে যেত। কিন্তু পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অনাগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সমন্বয়ের অভাবে তা সম্ভব হয়নি। ফলে একদিকে সরকারি বিনিয়োগ অকার্যকর হয়ে রয়েছে, অন্যদিকে নাগরিক দুর্ভোগও অব্যাহত আছে। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় টার্মিনালের বিভিন্ন অবকাঠামো ধীরে ধীরে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়ছে। নিয়মিত ব্যবহার না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণও ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এসব স্থাপনা সংস্কারে আবারও সরকারি অর্থ ব্যয় করতে হবে।
টার্মিনালটি চালু না হওয়ায় সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়নি। বাস কাউন্টার, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, ফার্মেসি ও যাত্রীসেবা কেন্দ্র গড়ে ওঠার কথা থাকলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বেকার যুবকদের সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের সুযোগ নষ্ট হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, যানজটের কারণে আমদানি-রপ্তানির পণ্য পরিবহনেও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে। পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস একই সড়কে চলাচল করায় দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়, এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় উভয়ই বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, প্রতিদিন যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। অথচ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাস টার্মিনালটি ব্যবহারই করা হচ্ছে না। এটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন।
ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন বলেন, নতুন টার্মিনাল সচল হলে চেকপোস্ট এলাকার চাপ অনেক কমে যেত। এখন সরকারি সম্পদ যেমন অব্যবহৃত পড়ে আছে, তেমনি সাধারণ মানুষও দুর্ভোগে পড়ছে।
ইজিবাইকচালক হাসান শেখ বলেন, একসঙ্গে অনেক বাস চেকপোস্ট এলাকায় দাঁড়ালে পুরো সড়ক বন্ধ হয়ে যায়। নতুন টার্মিনাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করলে যানজট অনেকটাই কমবে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা শুধু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেটি জনগণের কাজে কতটা লাগছে সেটিই আসল বিষয়। বেনাপোল বাস টার্মিনালের ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া বলেন, নবগঠিত সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিক, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, পুলিশ, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত সমন্বয় বৈঠক করুক। প্রয়োজনে প্রশাসনিক নির্দেশনার মাধ্যমে সব দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলা বাসকে নতুন টার্মিনাল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি টার্মিনালে নিরাপত্তা জোরদার, নিয়মিত পুলিশি টহল, সিসিটিভি স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করারও দাবি জানান তিনি।
যশোর-১ (শার্শা) আসনের সংসদ সদস্য আজিজুর রহমান বলেন, বেনাপোল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর। এখানে দীর্ঘদিনের যানজট ও নাগরিক দুর্ভোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। জনগণের অর্থে নির্মিত কোনো সরকারি স্থাপনা বছরের পর বছর অকার্যকর পড়ে থাকা কাম্য নয়। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পৌরসভা, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে বাস টার্মিনালটি কীভাবে কার্যকরভাবে চালু করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি টেকসই সমাধান বের করার চেষ্টা থাকবে, যাতে যানজট কমার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা এর সুফল পান।







