ওমানে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একসঙ্গে প্রাণ হারানো আপন ৪ ভাইয়ের লাশ দেশে আনার পর আজ বুধবার সকালে গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর বান্দারাজার পাড়া নেওয়া হয়। এ সময় তাদের লাশ একনজর দেখতে আগে থেকে পরিবার-স্বজনসহ শত শত মানুষ সেখানে অপেক্ষা করছিল। সকাল ৭টার দিকে রাশেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলামের কফিনবন্দি লাশ বাড়ির উঠানো পাশাপাশি রাখা হয়।
এ সময় পরিবার-স্বজনদের কান্না-আহাজারিতে এক হৃদয়বিদায়ক দৃশ্যের অবতারণা হয়। কিছুক্ষণ পর মা খাদিজা বেগম এসে একে একে দেখতে পান পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে ওমানে যাওয়া তার ৪ ছেলের কেউ বেঁচে নেই। মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ পর অবশেষে গতকাল মঙ্গলবার তাঁদের মা দেখে জানতে পারেন তাঁর চার ছেলে আর বেঁচে নেই। মায়ের অজান্তেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন তাঁরা।
এক সঙ্গে চার ছেলের লাশ দেখে খদিজার আহাজারিতে সেখানে উপস্থিত লোকজনের কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। অঝোরে বুক চাপড়ে কান্না করতে করতে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়েন মা।
এ দিকে মায়ের পাশাপাশি আহাজারি করছিলেন নিহত রাশেদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুমা আক্তার ও শাহেদুল ইসলামের স্ত্রী শান্তা আকতারও। তারাও কিছুক্ষণ পর পর জ্ঞান হারাচ্ছিলেন। শুধু পরিবারের সদস্যরাই নয়, একসঙ্গে চার ভাইয়ের মৃত্যুতে পুরো রাঙ্গুনিয়া যেন শোকে ভাসছে। যারা সান্ত্বনা দিতে গেছেন সবাই কান্নায় ভেঙে পড়েন। বুধবার সকাল ১১টার দিকে স্থানীয় লালানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে চার ভাইয়ের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
এতে ইমামতি করেন নিহত চার ভাইয়ের বেঁচে থাকা একমাত্র ভাই হাফেজ মুহাম্মদ এনাম। জানাজায় হাজারো মানুষ অংশগ্রহণ করেন। পরে স্থানীয় মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়েছে ৪ ভাইকে।
এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে ৪ ভাইয়ের লাশ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ওই রাত ১১টার দিকে দুটি ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশগুলো রাঙ্গুনিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। বুধবার ভোরে নিজ গ্রামে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের মাতম নেমে আসে।
লাশ বাড়িতে পৌঁছানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সকাল থেকে দলে দলে নারী-পুরুষ, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ শেষবারের মতো তাদের দেখতে ভিড় করেন। স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কেউ আপনজন হারানোর বেদনায়, কেউ প্রতিবেশী হারানোর শোকে, আবার কেউ শৈশবের বন্ধুকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা জানান, একই পরিবারের চার ভাইয়ের একসঙ্গে মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না কেউই। পাশাপাশি রাখা চারটি কফিনের দৃশ্য অনেককেই আবেগাপ্লুত করে তোলে। পুরো এলাকায় নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া।
নিহতরা বান্দারাজার পাড়া এলাকার মৃত আবদুল মজিদের সন্তান। নিহতদের মধ্যে বড় ভাই রাশেদুল ইসলাম বিবাহিত ছিলেন। তার পরিবারে স্ত্রী, তিন বছর বয়সী এক কন্যা ও তিন মাস বয়সী এক পুত্রসন্তান রয়েছে। মেজ ভাই শাহেদুল ইসলামও বিবাহিত ছিলেন। ছোট দুই ভাই সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম অবিবাহিত ছিলেন।
জানা যায়, গত ১৩ মে সন্ধ্যায় ৪ ভাই ওমানের বারকা এলাকা থেকে মুলাদাহর উদ্দেশে রওনা হন। রাত ৮টার পর তাদের একজন এক আত্মীয়কে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে অসুস্থতার কথা বলেন। নিজেদের লোকেশন পাঠিয়ে বলেন, গাড়ি থেকে বের হওয়ার মতো অবস্থাও তাদের নেই। পরে একটি ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়ির দরজা খুলে তাদের লাশ উদ্ধার করে। গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এক্সজস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসগ্রহণের ফলে ওই চারজনের মৃত্যু হয়েছে।