জন্ম থেকেই যার দুটি হাত নেই, সমাজ যাকে অবহেলা করেছে আর অভাবের তাড়নায় বাবা একসময় যাকে সার্কাসে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সেই আয়েশা আক্তার আজ বাংলাদেশের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য প্রতীক। সব বাধা জয় করে, পা দিয়ে লিখে সদ্য মাস্টার্স পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ (ফার্স্ট ক্লাস) অর্জন করেছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়াহাট গ্রামের এই তরুণী।
আয়েশার এই দীর্ঘ এক যুগের লড়াই, অশ্রু আর সাফল্যের গল্প নিয়ে নির্মিত হয়েছে বিশেষ প্রামাণ্য তথ্যচিত্র ‘পায়ের ছাপ’। প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের প্রযোজনায় এটি পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেছেন চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি ও সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা মল্লিক। গত ১৭ মে রাত ১০টা ২০ মিনিটে চ্যানেল আইয়ের পর্দায় ২৪ মিনিট ২০ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের এই তথ্যচিত্রটি প্রচারিত হওয়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডেরও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে এই ডকুমেন্টারিটি।
তথ্যচিত্রে উঠে এসেছে, কিভাবে শৈশবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আয়েশাকে ভর্তি করতে চাননি। কিন্তু স্থানীয় একজন শিক্ষক সমাজ ও প্রশাসনের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে আয়েশাকে টেনে নেন। ২০১২ সালে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে এইচএসসি পাসের পর আয়েশার জীবন বদলে যায় চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত মোস্তফা মল্লিকের করা একটি রিপোর্টের মাধ্যমে। সাংবাদিক মোস্তফা মল্লিকের হাত ধরে আয়েশা প্রথম ঢাকায় এসে ‘কিংবদন্তি অ্যাওয়ার্ড’ পান, এককালীন ২ লাখ টাকাও দেওয়া হয় তাকে। এই টাকা দিয়ে ছোট্ট টিনের ঘরটি পাকা করেন আয়েশা। পরবর্তীতে একজন ফ্রান্সপ্রবাসী ব্যবসায়ীর সহায়তায় আয়েশা উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যান এবং ২০২৫ সালে মাস্টার্সে প্রথম বিভাগ অর্জন করেন।

আয়েশার এই সাফল্যে বুয়েটের অধ্যাপক ড. এ বি এম হারুন উর রশীদ, সাউথ অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহফুজুল আজিজ, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আব্দুল্লাহ্-আল-মামুন আয়েশাকে পুরো জাতির অনুপ্রেরণা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেন, শহরের সব সুবিধা পেয়ে ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া আর প্রত্যন্ত গ্রামের হাতহীন আয়েশার ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার তফাত আকাশ-পাতাল। সে অনেকের জন্য আই-ওপেনার।
মাস্টার্স শেষ করে আয়েশা এখন ঘরে বসে চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনা পয়সায় পড়াচ্ছেন। তবে অভাবের সংসার আর একটি স্থায়ী চাকরির আকুতি এখনো কাটেনি। তথ্যচিত্রটি প্রচারের পর আয়েশার পাশে দাঁড়িয়েছে চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুল রেজা সাগর ঘোষণা দিয়েছেন, স্থায়ী চাকরি না হওয়া পর্যন্ত চ্যানেল আই আয়েশাকে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে সম্মানি দেবে।
পরিচালক মোস্তফা মল্লিক অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, ‘বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আমি আয়েশাকে ফলো করেছি, তার প্রতিটি স্ট্রাগল দেখেছি। চ্যানেল আই আমাকে এই বায়োডকটি তৈরি করার জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা ও সুযোগ দিয়েছে। আয়েশা প্রমাণ করেছে, জীবনকে জয় করতে হাত লাগে না, অটল ইচ্ছাশক্তিই যথেষ্ট।’