উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল ফাহিমার। অনলাইনে নিজের হাতে তৈরি কেক, পোশাক বিক্রি করে একদিন বড় ব্যবসায়ী হবেন, সংসারে সচ্ছলতা ফেরাবেন, ছোট্ট পরিসরে শুরুও করেছিলেন। এমন স্বপ্ন বুকে নিয়ে গ্রামের মেয়ে ফাহিমা আক্তার মাত্র দেড় মাস আগে স্বামীর সঙ্গে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার ভাটারা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। কিন্তু সে স্বপ্ন থেমে গেল একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। স্বামী, ছোট ভাগ্নিসহ গ্রামের বাড়িতে ফিরল সেই ফাহিমার মরদেহ।
গত ২১ জুলাই ভোর ৪টার দিকে রাজধানীর নতুন বাজারের ১০০ ফিট সড়কের একটি ৬ তলা ভবনের নিচতলায় গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দগ্ধ হন ফাহিমা আক্তার (২১), তার স্বামী আনোয়ার হোসেন শাহীন (২৪) ও ভাগ্নি হাফসা (৮)। পরে তাদের উদ্ধার করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আনোয়ার হোসেন শাহীন, শুক্রবার সকালে ভাগ্নি হাফসা এবং শনিবার সন্ধ্যায় ফাহিমা আক্তার মারা যায়।
মৃত ফাহিমা আক্তার কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার গোমতী আবাসিক এলাকার গোলাম হোসেনের ছোট মেয়ে। সে উপজেলার জাফরগঞ্জ মীর আব্দুল গফুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন। পাশাপাশি অনলাইন ফেসবুকে একটি পেজ খুলে হাতের তৈরি কেক ও পোশাক বিক্রি করতেন।
আরো পড়ুন
বসতবাড়ি হারানোর শঙ্কা হাজারো পরিবারের
গত বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর আনোয়ার হোসেন শাহীনের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় ফাহিমার। আনোয়ার হোসেন দেবীদ্বার উপজেলার গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের বাঙ্গুরী গ্রামের মীর্জা আলী ব্যাপারীর ছেলে। তিনি ঢাকায় একটি পোশাকের শোরুমে সেলম্যান হিসেবে চাকরি করতেন। তাদের সঙ্গে ঢাকায় আসে ফাহিমার বড় বোনের আট বছরের মেয়ে হাফসা। হাফসা আক্তার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের মো. বাবুল মিয়ার মেয়ে।
এদিকে একই পরিবারের তিনজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে দেবিদ্বারের গ্রামের বাড়ি বাঙ্গুরি এলাাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া, স্বজনদের আহাজারি আর কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে বাতাস। পরে শুক্রবার সন্ধ্যায় মৃত আনোয়ার হোসেন শাহীন ও শিশু হাফসার মরদেহ একটি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়ি বাঙ্গুরী এলাকায় নিয়ে আসা হয়। পরে রাত ৮টার দিকে জানাজা শেষে শাহীনকে বাঙ্গুরী গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে ও শিশু হাফসাকে নিজ বাড়ি সুলতানপুর গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়।
অন্যদিকে শনিবার সন্ধ্যায় মারাও যাওয়া ফাহিমা আক্তারের মরদেহ রাতেই গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। পরে আজ রবিবার (২৬ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে দেবিদ্বার নিউ মার্কেট এলাকার চানমিয়া মার্কেট মাঠে জানাজা শেষে বাঙ্গুরী এলাকার একই কবরস্থানে স্বামী শাহীনের পাশে দাফন করা করা হয়।
মৃত ফাহিমার ভাবি মোসা. শামীমা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, এমন মৃত্যু আমরা মেনে নিতে পারছি না। এটি মৃত্যু নয়, এটি হত্যাকাণ্ড। বাড়ির মালিক অবহেলা না করলে আমার ননদ, তার স্বামী ও ভাগনি বেঁচে যেত।
মৃত ফাহিমার বাবা গোলাম হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ১১ মাস আগে পারিবারিকভাবে মেয়ের বিয়ে হয়। পড়ালেখার পাশাপাশি অনলাইনে টুকটাক বেচাবিক্রি করত। প্রায়ই বলত অনেক বড় উদ্যোক্তা হবে। কিন্তু অল্প বয়সে আমার মেয়ের জীবন চলে গেল।
অভিযোগ করে তিনি বলেন, বাসা ভাড়ায় ওঠার পরই বাড়ির মালিককে গ্যাস লিকেজের কথা বলেছিল তারা। কিন্তু মালিক বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। যার কারণে তিনজনের প্রাণ চলে গেল। এখানে বাড়ির মালিকের অবহেলা রয়েছে। তিনি সময়মতো ব্যবস্থা নিলে এমন দুর্ঘটনা ঘটতো না। আমি তার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি।
মৃত আনোয়ার হোসেন শাহীনের বাবা মীর্জা আলী ব্যাপারী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলে বিয়ের কিছুদিন আগে ঢাকায় একটি কাপড়ের শো-রুমে চাকরি নিয়েছে। দেড় থেকে দুই মাস আগে ঢাকার ভাটারায় ওই বাড়িতে ভাড়ায় ওঠে তারা। আমার ছেলে আর নাই, তার মুখটা শেষবার দেখেছি, আমার ছেলে আমার আগেই দুনিয়া থেকে চলে গেছে বলেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
বাঙ্গুরী এলাকার স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আবু হানিফ সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, আনোয়ার হোসেন শাহীন খুবই শান্ত প্রকৃতির ছিলেন। বিয়ের পর ঢাকায় একটি পোশাকের শো রুমে চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। ফাহিমার সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে বেশিদিন হয়নি। তিনজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যু এলাকার কেউ মেনে নিতে পারছে না। শাহীন ও তার স্ত্রীকে গ্রামের একটি কবরস্থানে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। আর শিশু হাফসাকে তার গ্রামের বাড়ি সুলতানপুরে দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় যদি বাড়ির মালিকের কোনো অবহেলা থাকে তা তদন্ত করে বিচার দাবি করছি।