অন্য কোনো প্রধান ভাবনা নেই। ভাবনা জীবনভর একটাই- পরিবেশ। পরিবেশ বাঁচাতে হবে। পরিবেশ বাঁচাতে এর সঙ্গে যা কিছু যুক্ত, তা রক্ষা করতে হবে। পরিবেশের মূল অনুসঙ্গ প্রকৃতি রক্ষা করতে হবে। প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত জল, পশুপাখি, বৃক্ষ। এসব রক্ষা পেলে প্রকৃতি রক্ষা পাবে, পরিবেশ বাঁচবে।
৪০ বছর ধরে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মাদারীপুরের রাজন। এই দীর্ঘ সময় ধরে বিনামুল্যে গাছের চারা বিতরণ করছেন তিনি। শুধু চারা বিতরণ নয়; নদী-খাল, পশুপাখি রক্ষায়ও একই সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার ২ নম্বর শকুনী এলাকার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন খানের ছেলে রাজন মাহমুদ। কিশোর বয়স থেকেই গাছের প্রতি তার আগ্রহ। গত শতাব্দির ৮০’র দশকেই বাবার সঙ্গে নার্সারি গড়ে তোলেন রাজন। সেখানে উৎপাদিত চারা বিনা টাকায় বিতরণ করা হতো আশপাশের মানুষের মধ্যে। গাছ চেয়ে কেউ খালি হাতে যায়নি তার কাছ থেকে। বিনামূল্যে চারা বিতরণ করতেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও।
রাজন জানান, ২০০১ সালে একটি পত্রিকায় পরিবেশের ওপর প্রতিবেদন পড়েন তিনি। সেখান থেকে উৎসাহিত হন, গড়ে তোলেন পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ফ্রেন্ডস অব নেচার’।
স্থানীয়রা জানায়, কোথাও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে দেখলেই সেখানে ছুটে যান রাজন। মাদারীপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী শকুনী লেকের ওপর কাজ করেছেন তিনি। লেকের পরিবেশ নষ্ট করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। পাশপাশি লেক উন্নয়নের নামে পুরনো গাছ কাটার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানান।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় এমপি মাদারীপুর শহরের ১ নম্বর পুলিশ ফাঁড়িসংলগ্ন পুরনো ঐতিহ্যবাহী পুকুরটি ভরাট করতে চাইলে ফ্রেন্ডস অভ নেচার-এর ব্যানারে তার প্রতিবাদ জানান রাজন। পরে মাদারীপুর পৌরসভার তখনকার মেয়র ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় পুকুরটি রক্ষা পায়।
সূত্র জানায়, পাখি রক্ষায় গাছে গাছে মাটির হাঁড়ি বসিয়ে তা পাখিকে বাসা হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করেন রাজন। বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন বিলে নিজ টাকায় মাছের রেনু বা পোনা কিনে তা অবমুক্ত করেন। বিভিন্ন সময় নদীখাল ভরাট করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় জেলায় পরিবেশবাদী হিসেবে পরিচিতি পান তিনি।
সম্প্রতি সরেজমিনে রাজনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির ছাদে রয়েছে নানা ফুল ও ঔষধি গাছের সংগ্রহ, রয়েছে বিভিন্ন জাতের ক্যাকটাস। বাড়ির পাশে পারিবারিক জমিতে গড়ে তুলেছেন নার্সারি।
রাজন জানান, তাকে এ কাজে সহযোগিতা করেন প্রতিবেশী সাখাওয়াত হোসেন মামুন ও স্থানীয় নূরু খা। বর্তমানে তিনজন মিলে চারা উৎপাদন ও পরে তা বিনামূল্যে বিতরণ করছেন। শহরের অনেকেই বাড়িতে গাছ লাগাতে চাইলেও মাটির অভাবে লাগাতে পারে না। সেক্ষেত্রে তিনি নিজে মাটি ও টব কিনে তাতে গাছ লাগানোর উপযোগী করেন তারা। পরে তা বিনামূল্যে বিতরণ করেন।
রাজন আরো জানান, প্রত্যেক মানুষকে পরিবেশ, স্বাস্থ্য, পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করছেন। তার আশা, একদিন সবাই পরিবেশ রক্ষায় আন্দোলনে দেশের তরুণ ও যুব সমাজসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষ এগিয়ে আসবে।
মাদারীপুর সদর উপজেলার হাজির হাওলা গ্রামের মিথিলা মোহসিন বলেন, ‘আমার কিছু টবের প্রয়োজন হয়। রাজন মাহমুদ তা ফেসবুকের মধ্যেমে জানতে পারেন। পরে তিনি আমাকে ২০টি টব দেন। শুধু টপ না, তার ভেতর গাছ লাগানোর জন্য মাটিও ছিল। সেইসঙ্গে তার ছাদ বাগান থেকে বেশ কিছু গাছও বিনা টাকায় নিয়ে যাই। বর্তমানে কেউ টাকা ছাড়া এভাবে দেয় না। গাছের প্রতি তার এমন ভালোবাসা দেখে আমি মুগ্ধ।
মাদারীপুর ২ নম্বর শকুনি এলাকার রাবেয়া সুলতানা বলেন, ‘আমি তার (রাজন) কাছে বিভিন্ন ফুল গাছের ডাল চাইলে তিনি বিনামূল্যে অনেকগুলো গাছ টবসহ দিয়ে দেন।’
মাদারীপুর সদর উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আল-আমিন বলেন, অনেক আগে থেকেই রাজন মাহমুদের সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনি বিভিন্ন সময় বিনা টাকায় চারা বিতরণ করে থাকেন। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। একটি গাছও যদি বেঁচে থাকে, তাহলে তা পরিবেশ রক্ষার জন্য কাজ করে। তাকে দেখে অন্যরা গাছ লাগাতে উৎসাহিত হবেন।





