ভাই যুবলীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতা। নিজেও যুবলীগের কর্মী। কলেজের অধ্যক্ষ প্রতিমন্ত্রীর ভাইও ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ। এত ক্ষমতার পর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদে চাকরি করা কি মানায়? ফলে কলেজে গিয়ে হাজিরা খাতায় নাম সই করেই বের হয়ে যেতেন। সারা দিন রাজনৈতিক কর্মতৎপরতায় ব্যস্ত থাকতেন।
এভাবেই চলছিলেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় অবস্থিত তারাকান্দা সরকারি ডিগ্রি কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সোহরাব আলী। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু এর পরও তার দাপট কমেনি। মাঝেমধ্যে গোপনে কলেজে গিয়ে হাজিরা খাতায় অনেক দিনের স্বাক্ষর করতেন একসঙ্গে। নিয়মিত পেয়েছেন বেতন-ভাতাও।
তবে গত জানুয়ারিতে কলেজে নতুন অধ্যক্ষ যোগদানের পর থেকে বিপাকে পড়েন সোহরাব। নতুন অধ্যক্ষ প্রতিদিন কলেজ ছুটির পর হাজিরা খাতায় সোহরাবের নামের পাশে অনুপস্থিত লিখে রাখেন। ফলে একদিনে গিয়ে অনেক দিনের হাজিরা স্বাক্ষর আর করতে পারেননি সোহরাব। এতে হাজিরা খাতায় অনেক দিনের অনুপস্থিতি হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় কলেজের বেতন। পরে ‘অসুস্থতার’ সনদ দিয়ে আবারও যোগ দেন কর্মস্থলে। কিন্তু এর পরও নিয়মিত কলেজে যান না বলে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
একই অভিযোগ কলেজটির সাবেক অধ্যক্ষ সাজ্জাদ আহমেদের বিরুদ্ধে।
তারাকান্দা উপজেলার কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, কলেজের চতুর্থ শ্রেণির চাকরি করলেও সোহরাব তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দাপুটে নেতা ছিলেন। ক্ষমতার দাপটে মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা ছিল তার নিয়মিত কাজ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখনও আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেককে হুমকি দিয়েছেন তিনি।
তারাকান্দা উপজেলা সদরের ব্যবসাসী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাজারে মোবাইল ফোনের ব্যবসা ছিল আমার। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় ওই বছরের ১৯ জুলাই আমার দোকান লুট করার হুমকি দেন তিনি। এরপর ভয়ে দোকান থেকে মালামাল সরিয়ে নিই।’ তিনি বলেন, কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হয়েও আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে একাধিক রাজনৈতিক মামলার বাদী ছিলেন সোহরাব।
কলেজে না গিয়েও হাজিরা খাতায় শতভাগ উপস্থিতির অভিযোগ যাচাই করতে বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) তারাকান্দা সরকারি কলেজে গিয়ে একাধিক কর্মচারী সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান, ৫ আগস্টের পর মামলার আসামি হন সোহরাব। এরপর থেকে তিনি পলাতক থাকতেন। তবে মাঝে-মাঝে গোপনে কলেজে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির অসাধু কর্মচারীদের সহযোগিতায় হাজিরা খাতায় অনেক দিনের স্বাক্ষর করতেন। বিষয়টি জানতে পেরেও শিক্ষকরা প্রতিবাদ করেননি। ৫ আগস্টের পর থেকে কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষও আত্মগোপনে ছিলেন। এ কারণে কর্মচারীদের হাজিরা খাতা নিয়মিত নজরদারি হতো না। আজ (বৃহস্পতিবার) কলেজের ২০২৫ সালের কর্মচারী হাজিরা খাতায় দেখা যায়, সোহরাব আলী প্রতিদিনের স্বাক্ষর।
কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ মো. আফাজ উদ্দিন বলেন, আমি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি যোগ দিই। যোগদানের আগেই জানতে পারি, এ কলেজের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ দীর্ঘদিন ধরে নিয়মবর্হিভূতভাবে অনুপস্থিত। জানুয়ারি থেকে আমি আর্থিক বিষয়ে দায়িত্ব পাই। তখন থেকে প্রতিদিন হাজিরা খাতা দেখি। এতে সোহরাব আলীর অনুপস্থিতির বিষয়টি ধরা পড়ে। পরে তাকে খবর দিয়ে এনে কারণ জানতে চাইলে অসুস্থতার সনদ দেখান। এরপর থেকে তাকে নিয়মিত আসতে বলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত কলেজে অবস্থান করেও সোহরাব আলীকে সেখানে পাওয়া যায়নি।
তারাকান্দা সরকারি কলেজের শিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে আরো জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির আগের নাম ছিল তারাকান্দা বঙ্গবন্ধু ডিগ্রি কলেজ। ২০২৩ সালে কলেজটি সরকারি হয়। তার আগে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে অধ্যক্ষ হন সাজ্জাদ আহমেদ। তিনি ওই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের আপন ভাই। এ কারণে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেননি।
শিক্ষক-কর্মচারীরা আরো জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি একদিনের জন্যও কলেজে যাননি। অথচ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বেতন ও ভাতা পেয়েছেন। অধ্যক্ষের অনুপস্থিতির বিষয়ে অন্তত তিনটি তদন্ত হলেও এখনো তাকে সাময়িক বরখাস্ত বা তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।