খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ভবনের তালা খুলে দিয়েছেন। তবে তিন দফা দাবি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। ফলে রবিবার (২৬ জুলাই) থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হলেও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম আপাতত শুরু হচ্ছে না।
শনিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক এবং শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি শিক্ষক-প্রশাসনের সংহতি প্রকাশের পর রাত ১০টার দিকে ভবনগুলোর তালা খুলে দেওয়া হয়। পরে রাত পৌনে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সুষ্ঠু তদন্ত ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে দাবি বাস্তবায়নের আগে ক্লাস-পরীক্ষায় না ফেরার ঘোষণা দেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২২ জুলাই রাতে বিজয়’২৪ হলে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোতে তালা দিয়ে সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। পরে শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এর অংশ হিসেবে শনিবার সব ডিসিপ্লিনের প্রধান নিজ নিজ বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ওই সভাগুলোতে যৌন অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচারের দাবির প্রতি শিক্ষকরা একাত্মতা প্রকাশ করেন। পরে বিকেল সাড়ে ৪টায় উপাচার্যের সভাপতিত্বে জরুরি সভায় উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, বিভিন্ন স্কুলের ডিন, ডিসিপ্লিন প্রধান, ছাত্রবিষয়ক পরিচালক, প্রভোস্ট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালকেরা শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানান।
সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা স্কুলের ডিন অধ্যাপক মো. আশরাফুল আলম এবং ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক মো. নবীউল ইসলাম খান ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। ওই আলোচনার পর শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে সব ভবনের তালা খুলে দেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের দ্রুত ক্লাসে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে দাবিগুলোর বিষয়ে ইতোমধ্যে নেওয়া পদক্ষেপ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রত্যয়ও ব্যক্ত করা হয়।
তবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের পরিচালিত ‘টু টু (Two Two)’ ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সব স্কুলের ডিন ও ডিসিপ্লিন প্রধানদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের দুই প্রতিনিধি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে তালা খুলে দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, তিন দফা দাবি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বর্জন অব্যাহত থাকবে। দাবি বাস্তবায়নের পর স্থগিত পরীক্ষার নতুন সূচি দ্রুত প্রকাশের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দাবি বাস্তবায়নের আগে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরতে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মানসিক চাপ না দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ এবং বিজয়’২৪ হলের ক্যানটিনকর্মীর বিরুদ্ধে ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস-পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বর্জনের কর্মসূচি শুরু করেন। পরে প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় গত বৃহস্পতিবার প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে—ভিডিও ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনা, যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছার ও অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং ‘স্পন্দন-২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল।
গত বুধবার রাতে বিজয়’২৪ হলের ছাত্রীদের শৌচাগার ও গোসলখানার ভেন্টিলেটর দিয়ে গোপনে ভিডিও ধারণের অভিযোগে ক্যানটিনকর্মী ইমাম হাসানকে আটক করে শিক্ষার্থীরা। পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। একই ঘটনায় তার স্ত্রীও গ্রেপ্তার হন।
এর আগে গত ১৮ জুন অ্যাগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা পাঠানো ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে গত বছরের আগস্টে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে দুই ছাত্রীর যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর উভয় শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।










