পৃথিবীতে সর্বপ্রথম পঞ্জিকা প্রবর্তন করে সুমেরীয় সভ্যতা। সে সময় সপ্তাহ বা দিনের নির্ভুল গণনার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সময়ের পরিক্রমায় সুমেরীয়দের সেই পঞ্জিকা ব্যবস্থা বিকশিত হয়ে আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৮০ ধরনের পঞ্জিকা ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যুক্ত হয়েছে অর্থবছরভিত্তিক পঞ্জিকাও।
বাংলাদেশে সাধারণভাবে বাংলা সন ও খ্রিষ্টীয় সন অনুসরণ করা হলেও দেশের আর্থিক বছর গণনা শুরু হয় জুলাই মাস থেকে। প্রতি বছরের জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের জুন পর্যন্ত সময়কালকে একটি অর্থবছর হিসেবে ধরা হয়। এই সময়সীমাকে ভিত্তি করেই জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও উপস্থাপন করা হয়। ব্রিটিশ শাসনামল, পাকিস্তান পর্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পুরো সময়জুড়ে জুলাই-জুন ভিত্তিক অর্থবছর অনুসারেই বাজেট প্রস্তুত ও ঘোষণা করার প্রচলন অব্যাহত রয়েছে।
সাধারণত কোনো দেশের কৃষি উৎপাদন, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে অর্থবছরের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, জুলাই মাস বর্ষা মৌসুমের অন্তর্ভুক্ত। এসময় কৃষকদের জমিতে ফসল থাকে এবং কয়েক মাস পর তা ঘরে তোলা হয়। আবার দেশের কিছু অঞ্চলে এর মধ্যেই ফসল কাটা সম্পন্ন হয়ে যায়। ফলে বছরের এই সময়টি কৃষিখাতের চাহিদা ও সম্ভাবনা মূল্যায়ন করে বাজেট-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ হওয়ায় কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েই এ ধরনের অর্থবছর নির্ধারণের প্রথা চালু হয়েছে।
এছাড়া রাজনৈতিক দিক বিবেচনা করলে, জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারিতে নতুন কোনো দল ক্ষমতায় এলে তারা বাজেট প্রণয়নের জন্য বেশকিছু সময় হাতে পায়। এ সময় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার নানা প্রতিফলন বাজেটে তুলে আনার যথেষ্ট সুযোগ পায় সরকারি দল।
দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য অনেক পশ্চিমা দেশের অর্থবছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখাও অর্থবছর নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এতে আন্তর্জাতিক ঋণ ও আর্থিক লেনদেনের হিসাব-নিকাশ পরিচালনা করা তুলনামূলক সহজ হয়। বিশেষত, বিশ্বব্যাংকের অর্থবছর জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়ায় তাদের সময়সূচির সঙ্গে মিল রেখে জুলাই-জুন অর্থবছর অনুসরণ করলে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুবিধা পায়।
একসময় পাকিস্তান এপ্রিল মাসকে অর্থবছরের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করত। তবে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ও আর্থিক সহায়তার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে পরে তারা আবার জুলাই মাসকে অর্থবছরের প্রথম মাস হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেই অনুযায়ী হিসাব পরিচালনা শুরু করে।
অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করেন, বাংলাদেশে জু্নে বর্ষাকাল শুরু হওয়ায় দেশের অনেক অঞ্চল পানিতে ডুবে যায়। মাঝেমধ্যে দেখা দেয় ভয়াবহ বন্যা। এমন সময়ে একটি অর্থবছরের শেষের দিকের অর্থ ও আগত আরেকটি অর্থবছরের অর্থ বরাদ্দ ও ব্যবহার করতে অসামঞ্জস্যতার সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে অনেকেই বাংলাদেশের অর্থবছর যাতে ভারতের আদলে এপ্রিল থেকে শুরু করা হয় এমন মতামত দিয়েছিলেন।
তবে বিশ্লেষকের মতে, বর্ষা মৌসুমে অবকাঠামো ও নির্মাণসংক্রান্ত কার্যক্রম কিছুটা ঋতুনির্ভর হলেও অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রম সরাসরি ঋতুর ওপর নির্ভর করে না। তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়ন বা ব্যয় ব্যবস্থাপনায় যে সমস্যাগুলো দেখা যায়, তার মূল কারণ ঋতু পরিবর্তনের চেয়ে অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা অনেক বেশি।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত কাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার না এনে শুধু অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তন করলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। তাই কার্যকর ফলাফল পেতে হলে প্রথমে ব্যবস্থাপনাগত ও কাঠামোগত উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।






