দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও জুন মাসে তার গতি কিছুটা মন্থর হয়ে পড়েছে। ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটি, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গতি হারিয়েছে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য। ফলে মে মাসের তুলনায় জুন মাসে পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) বা ক্রয় ব্যবস্থাপক সূচক কিছুটা কমেছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্রকাশিত বাংলাদেশ পিএমআইয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্যসমাপ্ত জুন মাসে দেশের সামগ্রিক পিএমআই সূচক নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ৯ পয়েন্টে, যা মে মাসের তুলনায় কম। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মতে, পিএমআই সূচক ৫০-এর ওপরে থাকার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট খাতে প্রবৃদ্ধি বা সম্প্রসারণ হচ্ছে। তবে মে মাসের চেয়ে সূচক কমে যাওয়া ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘ ঈদের ছুটি, ভারি বৃষ্টিপাত ও প্রতিকূল আবহাওয়া, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন ক্রয়াদেশ বা অর্ডার কমে যাওয়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমেছে। এর বড় ধাক্কা লেগেছে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে, যা আবারও সংকোচনের মুখে পড়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কৃষি ও সেবা খাত টানা সম্প্রসারণের ধারা বজায় রাখলেও উৎপাদন খাতে নতুন অর্ডার ও উৎপাদন কার্যক্রমের গতি কমে গেছে। এটি সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে নির্মাণ খাতেও নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ধীরগতি লক্ষ করা গেছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঈদের ছুটির কারণে জুন মাসে অনেক কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন সীমিত ছিল। পাশাপাশি টানা বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ও নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়েছে। এতে একদিকে উৎপাদন যেমন ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে সময় ও খরচ উভয়ই বেড়েছে।
উদ্বেগের বড় কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন লাগামহীন পরিচালন ব্যয়ের কথা। জ্বালানি, পরিবহন এবং কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসার খরচ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান মুনাফা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। এর ওপর উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমায় বাজারে ভোক্তা চাহিদাও কমেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে নতুন ক্রয়াদেশের (অর্ডার) ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পিএমআই সূচকের বর্তমান অবস্থান অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বজায় থাকার বার্তা দিলেও উৎপাদন ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে সতর্কতার সংকেত দিচ্ছে। বিশেষ করে শিল্প ও নির্মাণ খাতের এই দুর্বলতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা দেশের কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অবশ্য এমন পরিস্থিতির মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী দেশের ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করছেন, আগামী দিনগুলোতে যদি জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) স্বাভাবিক থাকে এবং সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসাবান্ধব নীতি সহায়তা পাওয়া যায়, তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আবারও পুরোদমে গতি পাবে। ভবিষ্যৎ ব্যবসা সূচকেও এই ইতিবাচক প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা গেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অর্থনীতির গতি ফেরাতে সবচেয়ে জরুরি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এর চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হবে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমে উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
নীতিনির্ধারক, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক মহলের কাছে দেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয় এই পিএমআই সূচক। জুনের তথ্য স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দেশের অর্থনীতি এখনো সম্প্রসারণের ধারায় থাকলেও, এই গতি ধরে রাখতে শিল্প ও নির্মাণ খাতে অবিলম্বে নতুন উদ্দীপনা ও নীতিগত নীতি সহায়তা প্রয়োজন।