যেভাবে সফটওয়্যারশিল্প এ দেশে বেড়ে ওঠা উচিত ছিল, সেটা হয়নি। অর্থনীতিতে এর অবদান এখনো নগণ্য। অথচ তরুণসমাজ উন্মুখ হয়ে আছে এই শিল্পে আত্মনিবেদনের জন্য। উন্নয়নশীল বিশ্বে বিশেষ স্থান দখল করতে হলে এই শিল্পে পিছিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কী কী পদক্ষেপ নিলে এই খাতে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেসব বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন টেকনো হ্যাভেনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ এন করিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাবিব তারেক প্রথমে দেশের সফটওয়্যার খাতের পরিবর্তন, বর্তমান অবস্থা ও আপনাদের কার্যক্রম নিয়ে কিছু বলুন। গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি সফটওয়্যার খাতে সক্রিয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল কম্পিউটার সলিউশন, দ্য কম্পিউটার লিমিটেড, সাউথ টেক, ফ্লোরা, লিড করপোরেশন, আইবিসিএস, বেক্সিমকো। এদের অনেকে এখনো টিকে আছে। আমি টেকনো হ্যাভেনের কথা বলতে পারি। ১৯৮৬ সাল থেকে শুরু করে সাড়ে তিন দশক ধরে তথ্য-প্রযুক্তি খাতে ব্যবসা ও কার্যক্রম চালিয়ে আসছি। আমাদের চোখের সামনেই অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যেমন—শুরুর দিকে আমরা কম্পিউটার বিক্রি করতাম, সফটওয়্যার বিক্রি করতাম, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিতাম এবং কম্পিউটার মেরামতের সেবাও দিতাম। এরপর ১৯৮৯ থেকে আমরা শুধু মাল্টি ইউজার পিসি সিস্টেম বাজারজাত করি। পরে ১৯৯৪ থেকে শুধু সফটওয়্যার ও আইটি সেবার ওপর জোর দিই। এরপর আমরা অনলাইনভিত্তিক ডেলিভারি সার্ভিস (হোম শপিং এক্সপ্রেস) চালু করলেও বাজার তৈরি না হওয়ায় পরে এই সেবা বন্ধ করে দিই। ২০১২ থেকে সফটওয়্যার ও তথ্য-প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিংয়ের (পিএমসি) দিকে নজর দিই। রাজউকেও আমরা পিএমসির কাজ করেছি, এখন অনেক প্রতিষ্ঠানেই করছি। পাশাপাশি আমাদের নিজেদের তৈরি সফটওয়্যার স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করছি। দেশি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা সক্ষম? বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে টেক্কা দিয়ে কিভাবে কাজ পেলেন? ডাটাবেইসনির্ভর যেকোনো সফটওয়্যার তৈরিতে দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোই পুরোপুরি সক্ষম। দেশি প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়ে সফটওয়্যার করালে খরচ কম হয়, মেইনটেন্যান্স সেবাও যথাযথভাবে পাওয়া যায়। ১৯৯৪ সালে রেলওয়ে যখন টিকেটিং সিস্টেম চালুর উদ্যোগ নিল, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো এসে বোঝাল, প্রতিটি টিকিটে খরচ পড়বে ৬০ থেকে ১০০ টাকা। অর্থাৎ যে টিকিটের দাম ২৫ টাকা, সেটা খরচসহ যদি ৮৫ থেকে ১২৫ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়, তাহলে রেলওয়ে সেই কম্পানির মাধ্যমে সিস্টেম দাঁড় করাতে যাবে কেন! পরে আমরাই সেটা করেছি টিকিটপ্রতি মাত্র পাঁচ টাকা খরচে। আমাদের যে মূল ডিজাইন ছিল, এখনো সিস্টেমটা সেই ডিজাইনেই চলছে। দেশের সফটওয়্যার বাজার এখন কেমন? ১০ বছর আগে যে বাজার ছিল, সেই তুলনায় এখন বাজার অনেকটাই বেড়েছে। সফটওয়্যার খাতের দুটি দিক আছে—স্থানীয় বাজার ও রপ্তানি বাজার। দুটিই সমান তালে বাড়ছে। ৭০টিরও বেশি দেশে সফটওয়্যার রপ্তানি হচ্ছে। স্থানীয় বাজার আগে যেখানে কয়েক লাখ টাকা বাজেটের ছোট সফটওয়্যার প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এক থেকে ১০০ কোটি টাকার সফটওয়্যারের কাজের প্রকল্পও হচ্ছে। তবে এখনো বড় বাজেটের প্রকল্পগুলোর কাজ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়ার প্রবণতা আছে। এর পরিবর্তন দরকার। দেশি ও বিদেশি সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমান সুযোগ দেওয়া উচিত। সফটওয়্যারশিল্প দেশের উন্নতিতে কিংবা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে কেমন ভূমিকা রাখবে? ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে সফটওয়্যারশিল্পকে শুধু ভূমিকা রাখলেই চলবে না; চালকের আসনে থাকতে হবে। এ জন্য স্থানীয় সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সুযোগ করে দিতে হবে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। আগামী দিনের অর্থনীতিতে সফটওয়্যার খাত কি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে? বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বর্তমানে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এর মধ্যে তথ্য-প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার খাত ১ শতাংশেরও নিচে, অর্থাৎ এক বিলিয়ন ডলারেরও কম। অথচ এই খাতের আকার হওয়া দরকার ছিল ৪০ বিলিয়ন ডলার। যদি পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকাই, সেখানে তথ্য-প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার খাত তাদের অর্থনীতির প্রায় ১০ শতাংশ। তবে আশার কথা হচ্ছে, দেশে এই খাতে নতুন নতুন তরুণ উদ্যোক্তা আসছে, যারা খুব মেধাবী। আমার বিশ্বাস, নতুন ও পুরনোরা মিলে এই খাতের প্রসার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে সরকারের দিক থেকে নীতিগত সহায়তা জারি রাখতে হবে। এই খাতের উপযোগী জনবল তৈরির জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় যে প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো দূর করতে হবে। নতুন নতুন প্রযুক্তির (ব্লকচেইন, ইন্টারনেট অব থিংস—আইওটি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স—এআই, বিগ ডাটা অ্যানালিটিকস, থ্রিডি প্রিন্টিং ইত্যাদি) দিকে জোর দিতে হবে; তাহলেই আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব। তখনই গার্মেন্ট সেক্টরের পাশাপাশি আইটি বা সফটওয়্যার সেক্টর অর্থনীতির উন্নয়নে আরো ভূমিকা রাখতে পারবে। দেশের সফটওয়্যারশিল্পে বর্তমানে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো মোকাবেলার উপায় কী? দক্ষ জনবলের ঘাটতি, ইন্টারনেট সংযোগের ধীরগতি, বিদ্যুৎবিভ্রাট—এসব সমস্যা অনেকটা কমেছে। আরো উন্নতি দরকার। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে স্থানীয় সফটওয়্যারের মান নিয়ে গ্রাহকদের অনাস্থা। আমাদের দেশের সফটওয়্যার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও আরব আমিরাতে আস্থার সঙ্গে চলে; তাহলে সেটা নিজ দেশে কেন চলবে না? অথচ বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে সফটওয়্যার কেনার পর কোনো কিছু পরিবর্তন করতে হলে বা কারিগরি সহায়তা লাগলে জটিলতা দেখা যায়। দেশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কিনলে তা হয় না। দেশে বিদেশি সফটওয়্যারের মাধ্যমে শতকোটি টাকা দিয়ে বড় বড় অনেক প্রকল্প করা হয়েছে, পরে মুখ খুবড়ে পড়েছে। যেমন? যেমন—বিশ্বব্যাংকের এফএসআরপি, আয়কর প্রকল্প, এডিবির অর্থায়নে পাঁচ মিলিয়ন ডলারের পাওয়ার গ্রিড প্রজেক্ট, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বহু কাজ বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার কারণে সেগুলো একসময় বন্ধ হয়ে গেছে। দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় বিদেশিরা নেয় ১০০ গুণ বেশি অর্থ। সময়মতো কাজ ডেলিভারি দেয় না। যে কাজ এক সপ্তাহে সম্ভব, সেখানে ছয় মাসও লাগিয়ে দেয়। দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কী কী করা যেতে পারে? আমাদের তথ্য-প্রযুক্তি নীতিমালা বিশ্বের সেরা নীতিমালাগুলোর একটি। তবে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি। জনবল তৈরিতে সরকার উদ্যোগ নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে কিছুটা ঘাটতি পূরণ করেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, পাঁচ বছর আগে যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, সেটা এখনকার সময়ে ততটা কাজে আসছে না। সময় ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিনিয়ত বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো হালনাগাদ করা দরকার। এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত যারা তাদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের নিবিড় যোগাযোগ রাখা উচিত। কোন কাজে কী ধরনের দক্ষতার জনবল দরকার, সে ব্যাপারে ওয়াকিফহাল থাকতে হবে। নতুন যেসব প্রযুক্তি আসছে, সেগুলোর উপযোগী জনবল তৈরি করতে হবে। আরেকটি সমস্যা হচ্ছে, নতুন উদ্যোক্তারা যদি নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে যায়, তাহলে অর্থায়ন পাওয়াটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। এসব ক্ষেত্রে দুই ভাগে আর্থিক জোগান দেওয়া যেতে পারে—এক. যদি উদ্যোক্তাদের হাতে কাজ বা প্রকল্প থাকে তাহলে ব্যাংকিংব্যবস্থা থেকে ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল’-এর ব্যবস্থা করা। দুই. নতুন আইডিয়াকে সমর্থন দেওয়া। এসব ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সহায়তা করতে চায় না। তাই সরকারি-বেসরকারি দেশি-বিদেশি উদ্যোগে দরকার ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডিং’। এ ধরনের ফান্ডের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের কয়েক বছর সময় দেওয়া হয় প্রকল্প দাঁড় করাতে। এটা অনেকটাই ঝুঁকি নিয়ে পরীক্ষা চালানোর মতো, যা প্রচলিত ব্যাংকগুলো করবে না। আপনারা সরকারের পক্ষ থেকে কেমন ভূমিকা আশা করেন? গত ১২ বছরে দুই শরও বেশি উদ্যোক্তাকে প্রিসিড গ্রান্ট (১০ লাখ টাকা অনুদান), ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড দেওয়া, জনবল তৈরিসহ বিভিন্ন খাতে সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে মান নিয়ে দেশি-বিদেশি গ্রাহকদের মধ্যে যে আস্থার সংকট আছে, সেটা এখনো কাটেনি। অনেকে দ্রুত ডেলিভারি ও কমিশনের কারণে বাইরের প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দেয়। অথচ ডাটাবেইসভিত্তিক সব ধরনের সফটওয়্যারের কাজ শতভাগ দেশেই সম্ভব। বিশেষায়িত কিছু সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেবা নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পার্টনারশিপেও নিয়ে আসা যায়।