রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নানা কেলেঙ্কারির জন্য জনগণ যতটা না মনে রাখে, তার চেয়েও বেশি মনে রাখে ওই সব কেলেঙ্কারির মুখে তারা কী ধরনের আচরণ করে তার ওপর। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক এখন কেবল কোনো একজন ব্যক্তির ব্যর্থতার বিষয় হিসেবেই রয়ে যায়নি। বরং দলটি যে দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নৈতিক নেতৃত্বসম্পন্ন একটি দল হিসেবে নিজেদের দাবি করে, সেই দাবির ক্ষেত্রেও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে জামায়াত নিজেদেরকে আলাদা করে তুলে ধরতে চেয়েছে তাদের অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে। তাদের দাবি ছিল, তারা শুধু ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিই নয়, বরং ভিন্ন এক নৈতিক দিকনির্দেশনাও উপস্থাপন করে। দলটি নিজেদের শৃঙ্খলাবদ্ধ, ধর্মপরায়ণ এবং নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছে। এমনকি তারা প্রায়ই এমন ধারণা প্রচার করেছে যে, তাদের লোকদের কাছে অন্যান্য সাধারণ রাজনীতিবিদদের তুলনায় আরো বেশি উচ্চতর নৈতিক মানদণ্ড প্রত্যাশা করা যায়। কিন্তু সেই দাবিই এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে, যার সহজ কোনো ব্যাখ্যা দলটির কাছেও নেই।
গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে বিতর্কটি শুধু এ ক্ষেত্রে উঠে আসা অভিযোগগুলোর কারণেই ক্ষতিকর নয়; বরং এটি আরো বড় এক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে যে জামায়াতের প্রকাশ্যে প্রচার করা নৈতিকতার বক্তব্য এবং বাস্তবে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ব্যবধান আসলে কতটা। ভাইরাল হওয়া তার অন্তরঙ্গ ভিডিওতে দেখা যাওয়া নারীকে তিনি নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন এবং অভিযোগ করেন, ভিডিওটি গোপনে ধারণ করা হয়েছিল। এসব ব্যক্তিগত ও আইনি প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত নিজস্ব প্রক্রিয়ায় মিলতে পারে। কিন্তু এখানে রাজনৈতিক প্রশ্নটি ভিন্ন; সেটি হলো যে দল নিজেকে নৈতিকতার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী এক উদাহরণ বলে দাবি করে, তাদেরই একজন নেতা যখন কেলেঙ্কারির কেন্দ্রে চলে আসেন, তখন সেই দলের প্রতিক্রিয়া আসলে কী রকম ছিল?
প্রথম দিকে দলটি কোনো দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়নি। তারা অভ্যন্তরীণ তদন্ত ও তথ্য-অনুসন্ধানের কথা বলেই বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। যথাযথ তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে অবশ্য কোনো সমস্যা নেই। কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে প্রতিটি রাজনৈতিক সংগঠনেরই সময় নিয়ে অভিযোগ তদন্ত করে দেখা উচিত। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আচরণ নিয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে জামায়াত খুব কমই একই ধরনের ধৈর্য দেখিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তারা জনপরিসরে নৈতিকতার পক্ষের শক্তি হিসেবে অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করেছে এবং নিজেদের ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিক রাজনীতির রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সেই ইতিহাসের কারণেই তাদের নিজেদের আচরণও এখন আরও নিবিড়ভাবে পর্যালোচিত হওয়া স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
অবশেষে কয়েক দিন ধরে চলা গণমাধ্যমের নজরদারি এবং দেশজুড়ে ব্যাপক জনআলোচনার পর জামায়াত ঘোষণা করে যে তাদের তদন্তে গাজী নজরুল ইসলাম ‘নৈতিক অসদাচরণে’ দোষী প্রমাণিত হয়েছেন এবং তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সাংগঠনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তটি ছিল যথাযথ। কিন্তু এর পরপরই একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে : যদি এই বিতর্কটি জাতীয় পর্যায়ে এত ব্যাপক আলোচনার বিষয় না হতো, তাহলেও কি সিদ্ধান্তটি একই থাকত? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কতটা ধারাবাহিক, ন্যায়সংগত এবং সময়োপযোগী ছিল, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে দল নিজেদেকে উচ্চতর নৈতিক মানদণ্ডসম্পন্ন হিসেবে দাবি করে, তাদের জবাবদিহির ক্ষেত্রেও উচ্চতর প্রত্যাশা থাকাই বাঞ্ছনীয়। শুধু ভুল সংশোধন হয়েছে দেখলেই জনগণ আস্থা পায়, তা না; বরং কোনো ধরনের দ্বিধা বা বাইরের চাপ ছাড়াই ভুল সংশোধনের জন্য আন্তরিক ইচ্ছার উপস্থিতি ও এর জন্য পূর্বপ্রস্তুতি থাকার ওপর নির্ভর করে।
জামায়াতের জন্য এটি কোনো বিচ্ছিন্ন চ্যালেঞ্জ নয়। বছরের পর বছর ধরে দলটিকে এমন বহু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, যখন কিনা তাদের কোনো কোনো নেতার আচরণ বা প্রকাশ্য বক্তব্য দলটির দীর্ঘদিনে যত্নসহকারে গড়ে তোলা নৈতিকতার ভাবমূর্তির সঙ্গে স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দলটি দাবি করেছে, কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতাকে প্রতিষ্ঠানের মূল্যবোধের প্রতিফলন হিসেবে দেখা উচিত নয়। কথাটি সত্যও হতে পারে। কিন্তু একই ধরনের বিতর্ক যখন বারবার ফিরে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সংগঠনটি কি সত্যিই তাদের ঘোষিত নৈতিক মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে এবং কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই প্রয়োগ করে?
কোনো একক ব্যক্তির আচরণ দিয়ে পুরো একটি সংগঠনকে বিচার করা উচিত নয়—এই যুক্তি দেওয়ার পূর্ণ অধিকার জামায়াতের আছে এবং এই নীতি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু জামায়াত কখনোই নিজেদের আর দশটি সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং তারা সচেতনভাবেই মানুষকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছে যে, তারা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর চেয়ে অধিক নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন।
সুতরাং তাদের পক্ষে এটা যুক্তিসংগতভাবে আশা করা সম্ভব নয়, সাধারণ রাজনৈতিক মানদণ্ডেই তাদের বিচার করা উচিত।
নিঃসন্দেহে, নৈতিক নেতৃত্বের দায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়ের চেয়ে অনেক বেশি ওজনদার। এর জন্য ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন। রাজনৈতিকভাবে নীরব থাকা সুবিধাজনক হলেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে বিলম্ব প্রতিক্রিয়া দেখানো তাদের জন্য সুবিধাজনক বলে মনে হলেও দ্রুত জবাবদিহি নিশ্চিত করার অপরিহার্য।
সর্বোপরি, এটি প্রমাণ করা প্রয়োজন যে ব্যক্তিগত আনুগত্য বা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের চেয়ে নীতি-নৈতিকতাই অধিক শক্তিশালী। সুতরাং গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনাটি এখন আর নিছক ব্যক্তিগত পর্যায়ের বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জামায়াতের রাজনৈতিক দাবিরই একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলটি নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ এক বিকল্প হিসেবে নিজেদেরকে দাবি করে। ন্যায্যভাবে হোক বা অন্যায্যভাবে, এই ঘটনার পর সেই দাবি আগের তুলনায় অনেকটাই কম বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই ‘সিলেক্টিভ’ জবাবদিহির সমস্যায় ভুগছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিয়মিতভাবে নিজেদের প্রতিপক্ষের অসদাচরণের নিন্দা করে, অথচ একই ধরনের আচরণ নিজেদের দলের ভেতরে ঘটলে তা হয় ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে, নয়তো তার গুরুত্ব কমিয়ে দেখায়। সমালোচকদের মতে, এই ঘটনা জামায়াত যেভাবে সামাল দিয়েছে, তাতে দলটি এত দিন ধরে যে ধরনের রাজনৈতিক আচরণের সমালোচনা করে এসেছে, তাদের মধ্যেই সেটি আরো শক্তিশালী হিসেবে প্রকাশিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কোনো দল যদি নিজেকে ব্যতিক্রমী নৈতিক আদর্শের অধিকারী বলে দাবি করে, তাহলে জনগণেরও সেই দলের কাছ থেকে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী ধারাবাহিকতা প্রত্যাশা করার অধিকার রয়েছে।
এই ঘটনার শিক্ষা কোনো একক কেলেঙ্কারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আসলে, সংকটের মুখে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিধা না করে স্পষ্টতার সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানালে জনআস্থা গড়ে ওঠে। কোনো দলের রাজনৈতিক পরিচয় যদি নৈতিক অবস্থানের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তাদের দ্বিধা অনিবার্যভাবেই এই প্রশ্নের জন্ম দেয়, তাদের নীতিগুলো কি পরম ও অপরিবর্তনীয়, নাকি পরিস্থিতি অনুযায়ী শর্তসাপেক্ষ?
গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কারের মাধ্যমে জামায়াত হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে তাদের রাজনৈতিক ক্ষতি কিছুটা সামাল দিতে পেরেছে। তবে অনেক পর্যবেক্ষকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, দলটি নিজেদের ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার বাস্তবতাকে সমন্বয় করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছে। আর, এই বহিষ্কার সত্ত্বেও সেই ধারণাকে তারা দূরও করতে পারেনি। দীর্ঘদিন ধরে নৈতিকতা ভিত্তিক রাজনীতির প্রতীক হিসেবে নিজেদের দাবি করে আসা একটি সংগঠনের উপর এই অবস্থাটিই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নিজেদের ঘোষিত গুণাবলির ভিত্তিতে মানুষ বিচার করবে না; বরং নিজেদের ক্ষেত্রে তারা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তার ভিত্তিতেই বিচার করবে। জামায়াতও ঠিক এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছে। নজরুলকে ঘিরে তৈরি হওয়া ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয় যে, শুধু মুখের কথার ওপর নৈতিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা যায় না। মূল্যবোধ যখন পরীক্ষার মুখে পড়ে, তখন নীতিনিষ্ঠ, সময়োপযোগী ও ধারাবাহিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই নৈতিক অবস্থান অর্জন ও ধরে রাখা যায়।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন