ইসলাম মানুষের হক বা অধিকার আদায়ের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। আল্লাহর হকের পাশাপাশি বান্দার হকও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ এমন একটি বিষয়, যা পরিশোধ না করলে মৃত্যুর পরও তার দায় থেকে যায়। তাই মোবাইলের ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সের শরয়ি বিধান জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। এর বাইরে যা কিছু আছে, তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪৮)
বর্তমানে প্রয়োজনের তাগিদে অনেক মোবাইল অপারেটর গ্রাহকদের জন্য 'ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স' বা জরুরি ব্যালেন্সের সুবিধা দিয়ে থাকে। মূলত মোবাইল কোম্পানির পক্ষ থেকে গ্রাহককে দেওয়া ‘ঋণ’। অর্থাৎ কোম্পানি গ্রাহককে অগ্রিম একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বা ব্যালেন্স ব্যবহার করতে দেয়, যা পরবর্তীতে রিচার্জের মাধ্যমে আদায় করে নেয়। অতএব, শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি ঋণ, আর ঋণ গ্রহণ করলে তা পরিশোধ করা ওয়াজিব। ইসলামে ঋণ পরিশোধের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই মৃত্যুর পর মানুষের সম্পদ থেকে সর্বপ্রথম তার ঋণ পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফকিহগণ বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে সর্বপ্রথম তার ঋণ পরিশোধ করা হবে।’ (আস-সিরাজি ফিল মিরাস, পৃ. ৮)
এমনকি যদি মৃত ব্যক্তি এ বিষয়ে কোনো অসিয়ত না করে থাকেন, তবুও উত্তরাধিকারীরা স্বেচ্ছায় তার ঋণ পরিশোধ করলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, ইনশাআল্লাহ। (রদ্দুল মুহতার : ২/৫৩৩, আল-মাবসুত : ৩/১২৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনের আত্মা তার ঋণের কারণে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যতক্ষণ না তার ঋণ পরিশোধ করা হয়।’ (সুনানে ইবন মাজাহ, হাদিস : ২৪১৩)
অন্য এক হাদিসে তিনি আরও বলেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর পথে শহিদ হন, তারপর জীবিত হন, আবার শহিদ হন—এভাবে তিনবারও শহিদ হন, তবুও যদি তার ওপর ঋণ থেকে যায়, তবে সেই ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন না।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৮৬০)
সুতরাং যদি কেউ আন্তরিকভাবে ঋণ পরিশোধ করার ইচ্ছা রাখেন, কিন্তু সুযোগ হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে আল্লাহর রহমতের আশা করা যায়। কারণ আল্লাহ বান্দার নিয়ত সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করেন, অথবা পরিশোধ করার কোনো ইচ্ছাই না রাখেন, তাহলে তা একটি গুরুতর গুনাহ। পরকালে এ বিষয়ে তাকে জবাবদিহি করতে হতে পারে। এ কারণে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীদের উচিত, তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে প্রথমেই মোবাইলের ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সসহ সব ধরনের ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া। সম্পদ না থাকলেও সামর্থ্যবান আত্মীয়রা স্বেচ্ছায় তা পরিশোধ করলে ইনশাআল্লাহ মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবেন।
আমাদের করণীয় হলো-
১. মোবাইলের ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সকে সাধারণ সুবিধা নয়, বরং ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা।
২. সুযোগ পেলেই দ্রুত ঋণ পরিশোধ করা।
৩. মৃত্যুর আগে নিজের সব ঋণের হিসাব পরিষ্কার রাখা।
৪. উত্তরাধিকারীদেরও মৃত ব্যক্তির ঋণ পরিশোধে সচেষ্ট হওয়া।
৫. মানুষের হক আদায়ে সর্বদা সতর্ক থাকা।
মোবাইলের ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স একটি প্রযুক্তিগত সুবিধা হলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি একটি ঋণ। আর ঋণ পরিশোধ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই কোনো মুসলমানের উচিত নয় ইচ্ছাকৃতভাবে এই ঋণ বকেয়া রাখা। যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অসহায় অবস্থায় ঋণ পরিশোধের আগেই মৃত্যু ঘটে, তবে আল্লাহর অসীম রহমতের আশা করা যায়। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করলে তা পরকালে জবাবদিহির কারণ হতে পারে। অতএব, একজন সচেতন মুমিনের কর্তব্য হলো—মোবাইলের ইমার্জেন্সি ব্যালেন্সসহ সব ধরনের ঋণ দ্রুত পরিশোধ করা, মানুষের হক আদায়ে যত্নবান হওয়া এবং এমন জীবন যাপন করা যাতে আল্লাহর দরবারে ঋণমুক্ত অবস্থায় উপস্থিত হওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মানুষের হক আদায়ে আন্তরিকতা দান করুন এবং ঋণমুক্ত অবস্থায় তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন




