ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেখানে ঈমানের কারণে অসংখ্য মানুষ অকল্পনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু অত্যাচারীরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আল্লাহর বিচারের হাত থেকে তারা কখনোই রক্ষা পায় না। পবিত্র কোরআনের সুরা বুরুজের ১০ নম্বর আয়াতটি এমনই এক চিরন্তন ঘোষণা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ فَتَنُوا الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَتُوبُوا فَلَهُمْ عَذَابُ جَهَنَّمَ وَلَهُمْ عَذَابُ الْحَرِيقِ
অর্থ : ‘নিশ্চয় যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের নির্যাতন করেছে, অতঃপর তাওবা করেনি, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি এবং তাদের জন্য রয়েছে আগুনে দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা।’ (সুরা : বুরুজ, আয়াত : ১০)
আয়াত নাজিলের ঐতিহাসিক পটভূমি
এই আয়াতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়—‘আসহাবুল উখদুদ’ বা খাদের অধিবাসীদের ঘটনা। এক জালিম শাসকের রাজ্যে এক জাদুকরের মাধ্যমে রাজত্ব পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে এক কিশোর একজন আল্লাহভীরু সাধকের সংস্পর্শে এসে সত্যের সন্ধান পায় এবং এক আল্লাহর প্রতি ঈমান গ্রহণ করে। আল্লাহ তাকে এমন কিছু অলৌকিক ক্ষমতা দান করেন, যার মাধ্যমে বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে।
এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অত্যাচারী বাদশা ঈমানদারদের ইসলাম ত্যাগে বাধ্য করতে চায়। যারা ঈমান থেকে ফিরে আসতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের জন্য বিশাল বিশাল খাদ খনন করে তাতে আগুন জ্বালানো হয়। এরপর নারী, পুরুষ এমনকি শিশুদেরও জীবন্ত সেই আগুনে নিক্ষেপ করা হয়। তবুও তারা ঈমান থেকে বিচ্যুত হননি। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আল্লাহ তাআলা সুরা বুরুজে অত্যাচারীদের কঠিন পরিণতির ঘোষণা দিয়েছেন। (ইবনে কাসির)
শিক্ষা ও বিধান
এই আয়াত আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে—
১. ঈমানের জন্য পরীক্ষা আসবেই। আল্লাহর পথে চললে বাধা ও নির্যাতন আসতে পারে, কিন্তু সত্যের পথে অবিচল থাকাই মুমিনের বৈশিষ্ট্য।
২. জুলুমের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। যারা ঈমানদারদের ওপর নির্যাতন চালায় এবং তাওবা করে না, তাদের জন্য জাহান্নামের কঠিন শাস্তি নির্ধারিত।
৩. তাওবার দরজা খোলা। আয়াতে ‘অতঃপর তারা তাওবা করেনি’—এই কথাটি প্রমাণ করে, বড় অপরাধ করলেও আন্তরিক তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন।
৪. আল্লাহ ন্যায়বিচারকারী। দুনিয়ায় জালিমরা পার পেয়ে গেলেও আখিরাতে কেউ আল্লাহর বিচার থেকে রেহাই পাবে না।
৫. নির্যাতিতদের জন্য আশার বার্তা। আল্লাহ সবকিছু দেখেন, জানেন এবং যথাসময়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন।
একজন মুমিনের করণীয়
এই আয়াত তিলাওয়াত করার সময় শুধু শব্দ উচ্চারণ নয়, এর গভীর অর্থ হৃদয়ে ধারণ করা জরুরি। আমাদের উচিত—
১. ঈমানের ওপর অটল থাকা।
২. কোনো মানুষের ওপর জুলুম না করা।
৩. অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানো।
৪. নিজের ভুলের জন্য দ্রুত আল্লাহর কাছে তাওবা করা।
সুরা বুরুজের ১০ নম্বর আয়াতটি মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন সতর্কবার্তা। এটি জালিমদের জন্য কঠোর হুঁশিয়ারি এবং নির্যাতিত মুমিনদের জন্য আশা ও সান্ত্বনার ঘোষণা। ‘আসহাবুল উখদুদ’-এর ঘটনায় আমরা দেখি, ঈমানের মূল্য কখনো কখনো জীবন দিয়েও পরিশোধ করতে হয়; কিন্তু আল্লাহর কাছে সেই ত্যাগ কখনোই বিফলে যায় না। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত এই আয়াতের প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা—জুলুম থেকে বেঁচে থাকা, তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে সত্য ও ঈমানের পথে অবিচল থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।




