প্রকৃতির নির্মম আঘাতে যখন বন্যার পানি গ্রাম-শহর তলিয়ে দেয়, তখন হাজারো মানুষ এক মুহূর্তে হয়ে পড়ে নিঃস্ব। কারো ঘর নেই, কারো খাবার নেই, কেউ হারিয়েছেন জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। শিশুদের কান্না, বৃদ্ধদের অসহায়ত্ব এবং মায়েদের উদ্বেগ—এসব দৃশ্য যে কোনো বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। এমন সংকটময় মুহূর্তে একজন মুসলমানের পরিচয় শুধু নামাজ, রোজা বা অন্যান্য ইবাদতের মাধ্যমে নয়; বরং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)
বর্তমানে দেশের বহু জায়গায় বন্যার্ত পরিবাররা অনেক সংকটময় পরিস্থিতি অতিক্রম করছে। এক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতার অসংখ্য উপায় রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ উপায় নিচে তুলে ধরা হলো।
১. খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবার পৌঁছে দিন
বন্যার সময় সবচেয়ে বড় সংকট হয় নিরাপদ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির। তাই চাল, ডাল, চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট, খেজুর, স্যালাইন, বোতলজাত পানি কিংবা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট পৌঁছে দেওয়া সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।’ (সুরা : ইনসান, আয়াত : ৮)
২. চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করুন
বন্যার পরে ডায়রিয়া, জ্বর, চর্মরোগ, সাপের কামড়সহ নানা রোগ ছড়িয়ে পড়ে। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের একটি দুনিয়াবি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)
৩. পোশাক, কম্বল ও নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করুন
বন্যায় অনেক মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যায়। অনেকের পরনের কাপড় পর্যন্ত থাকে না। তাই নতুন বা ব্যবহারযোগ্য পরিষ্কার পোশাক, কম্বল, ত্রিপল, মশারি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয় না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৪২)
৪. শিশুদের জন্য দুধ, পুষ্টিকর খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিন
বন্যায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় শিশু ও নবজাতকরা। তাদের জন্য দুধ, শিশুখাদ্য, ডায়াপার, পোশাক, ওষুধ এবং পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩১৮)
৫. বিশ্বস্ত ত্রাণ সংস্থার মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা করুন
সবাই হয়তো সরাসরি দুর্গত এলাকায় যেতে পারবেন না। কিন্তু বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা নির্ভরযোগ্য ত্রাণ সংস্থার মাধ্যমে অর্থ, খাদ্য বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়; প্রতিটি শীষে একশত দানা থাকে। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬১)
৬. আন্তরিকভাবে দোয়া করুন এবং মানসিক সাহস জোগান
বিপদে শুধু বস্তুগত সহায়তাই নয়, মানসিক সমর্থনও অত্যন্ত প্রয়োজন। তাদের খোঁজ নেওয়া, সান্ত্বনা দেওয়া, ধৈর্যের কথা বলা এবং আল্লাহর কাছে তাদের জন্য দোয়া করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা : আলাম নাশরাহ, আয়াত : ৫–৬)
তাই বন্যার্তদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা এবং তাদের মধ্যে আশা ও ধৈর্য জাগিয়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি একজন মুসলমানের ঈমান, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার পরিচয়। আজ যারা পানিবন্দী, ক্ষুধার্ত ও আশ্রয়হীন, আগামীকাল আমরাও তাদের জায়গায় থাকতে পারি। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা, পোশাক, শিশুদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী, আর্থিক সহায়তা এবং আন্তরিক দোয়ার মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। মনে রাখতে হবে, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে-ই, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। (তাবারানি, হাদিস: ৫৭৮৭)
আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াই। হয়তো আমাদের একটি খাদ্যপ্যাকেট, একটি কম্বল, এক বোতল বিশুদ্ধ পানি বা একটি আন্তরিক দোয়া—কারো জীবনে নতুন আশা ফিরিয়ে আনতে পারে। আর মানুষের সেই হাসিই হতে পারে আমাদের আখিরাতের সফলতার পাথেয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য অসহায় মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।