• ই-পেপার

দাম্পত্য জীবনে মহানবী (সা.)-এর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা

নামের শুরুতে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ ব্যবহার কি বৈধ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
নামের শুরুতে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ ব্যবহার কি বৈধ?
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম মানুষকে আমলের চেয়ে আমলের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে শিক্ষা দিয়েছে। একজন মুসলমান যখন নামাজ আদায় করেন, রোজা রাখেন, জাকাত দেন বা হজ পালন করেন, তখন তার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজে অনেক সময় ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্যের পরিবর্তে তার বাহ্যিক পরিচিতি ও সামাজিক মর্যাদা বেশি গুরুত্ব পায়। বিশেষত হজ পালন করার পর নামের শুরুতে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি ব্যবহার করা এবং এ পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার প্রবণতা সমাজে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের উপাধি ব্যবহার কতটুকু সমীচিন? 

হজ ইসলামের অন্যতম মহান ইবাদত
ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। হজ তার অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮)

আর হজ শুধু একটি ইবাদত নয়; বরং মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের এক অনন্য শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দিন; তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সব ধরনের ক্ষীণকায় উটের পিঠে আরোহণ করে, দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৭)

‘হাজি’ ও ‘আলহাজ’ শব্দের অর্থ
‘হাজি’ অর্থ হজ পালনকারী ব্যক্তি। ‘আলহাজ’ শব্দটিও মূলত একই অর্থ বহন করে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত ধারণা হলো, একবার হজ করলে ‘হাজি’ এবং একাধিকবার হজ করলে ‘আলহাজ’ বলা হয়। অথচ আরবি ভাষা ও ইসলামী পরিভাষায় এ ধরনের কোনো পার্থক্যের ভিত্তি নেই।

ইসলামে নিয়তের গুরুত্ব
হজসহ সব ইবাদতের প্রাণ হলো নিয়ত। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত আমলই কেবল গ্রহণযোগ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সব কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯০৭)

তাই যদি কেউ ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় হজ করেন অথবা হজের পর এ পরিচয়ে মানুষের কাছে সম্মান প্রত্যাশা করেন, তাহলে তার ইবাদতের পবিত্রতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আত্মপ্রশংসা নয়, আত্মশুদ্ধি
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি কর না। কে বেশি মুত্তাকি, তা আল্লাহই ভালো জানেন।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩২)

এই আয়াত থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, নিজের নেক আমলকে পরিচয়ের অংশ বানিয়ে আত্মপ্রশংসার পরিবেশ সৃষ্টি করা একজন মুমিনের জন্য কাম্য নয়।

সাহাবায়ে কেরামের আমল
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রায় সকল সাহাবিই হজ করেছেন। চার খলিফা, আশারায়ে মুবাশশারা এবং অসংখ্য সাহাবি হজ পালন করেছেন। কিন্তু ইতিহাসে কোথাও পাওয়া যায় না যে তাঁদের নামের আগে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি যুক্ত করা হতো। তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিতেন ঈমান, তাকওয়া, জ্ঞান ও চরিত্রের মাধ্যমে; বিশেষ কোনো ইবাদতকে উপাধি বানিয়ে নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৯১)

আবার কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এমন লোকও থাকবে, যে মানুষের প্রশংসা লাভের জন্য ইবাদত করেছিল। (সহিহ মুসলিম)

তাই একজন মুসলমানের উচিত নিজের আমলকে প্রচারের মাধ্যম না বানিয়ে বিনয় ও গোপনীয়তার সঙ্গে তা সম্পাদন করা।

তাহলে ‘হাজি সাহেব’ বলে ডাকা কি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ?
কোনো ব্যক্তি যদি শ্রদ্ধা বা সম্মানের কারণে একজন হজ পালনকারীকে ‘হাজি সাহেব’ বলে সম্বোধন করেন, তাহলে তা সরাসরি হারাম বলা যাবে না। কারণ এতে মূলত পরিচয়ের উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে এটিকে সামাজিক মর্যাদা বা বাধ্যতামূলক উপাধি হিসেবে গ্রহণ করা, কিংবা এভাবে না ডাকলে অসন্তুষ্ট হওয়া অবশ্যই অনুচিত। অনেক সমসাময়িক আলেম ও ফকিহের মতে, নামের আগে ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি স্থায়ীভাবে ব্যবহার করা ইসলামের আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কারণ এটি আমলের চেয়ে পরিচিতিকে বড় করে তোলে এবং কখনো কখনো রিয়া (লোক দেখানো) ও আত্মতুষ্টির কারণ হতে পারে।

অতএব, হজ মুসলমানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এর প্রকৃত সৌন্দর্য উপাধিতে নয়, বরং হৃদয়ের তাকওয়া, বিনয় ও আল্লাহভীতিতে নিহিত। একজন মানুষ হজ থেকে ফিরে এসে যদি চরিত্রে, আচরণে এবং আল্লাহর আনুগত্যে পরিবর্তন আনতে পারেন, সেটিই তার প্রকৃত পরিচয়। ‘হাজি’ বা ‘আলহাজ’ উপাধি অর্জন নয়; বরং আল্লাহর দরবারে ‘মকবুল হাজি’ হিসেবে কবুল হওয়াই একজন হজযাত্রীর সবচেয়ে বড় সফলতা। তাই আমাদের উচিত উপাধির প্রতি নয়, ইখলাস ও আমলের গ্রহণযোগ্যতার প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন। 

ডিজিটাল ব্যস্ততা ও সিলাতুর রাহিম

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
ডিজিটাল ব্যস্ততা ও সিলাতুর রাহিম
সংগৃহীত ছবি

একটি সময় ছিল যখন আত্মীয়তার খবর জানতে প্রযুক্তির প্রয়োজন হতো না। ঈদের চাঁদ উঠলে খোঁজ নেওয়া হতো নানাবাড়ির, নতুন ফসল আসলে ভাগ চলে যেত চাচার বাড়িতে। কারো অসুস্থতার খবরে দূর গ্রামের পথও সংক্ষিপ্ত হয়ে যেত। মোবাইল ফোন ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না, মুহূর্তে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তবু যোগাযোগ থেমে থাকেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রেই সম্পর্ক ছিল আজকের চেয়ে দৃঢ়, আন্তরিক এবং বিশুদ্ধ।

আমরা এখন ‘সংযোগের যুগে’ বাস করছি। আজকের প্রযুক্তি অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় মানুষের যোগাযোগকে সহজ করেছে। হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে পৃথিবীকে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মহাদেশ পেরিয়ে কথা বলা যায়, দূরদেশে থাকা স্বজনের মুখ দেখা যায়, মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যায় এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কিন্তু এই অভূতপূর্ব যোগাযোগ-বিপ্লবের মাঝেই একটি প্রশ্ন ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—যোগাযোগ কি সত্যিই সম্পর্ককে শক্তিশালী করছে, নাকি আমরা যোগাযোগের প্রাচুর্যের মধ্যেই সম্পর্কের অনুভব হারিয়ে ফেলছি?

সম্ভবত আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি এটিই। আমরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক ক্ষেত্রে বেশি বিচ্ছিন্ন। আমাদের বন্ধু তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, অনুসারীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু আত্মীয়তার পরিধি ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা প্রতিদিন শত মানুষের পোস্ট দেখেন, অসংখ্য বার্তা আদান-প্রদান করেন, অথচ মাসের পর মাস কোনো খালা, ফুফু, মামা কিংবা চাচার খোঁজ নেন না।

ইসলাম এই সংকট বহু আগেই খেয়াল করেছে। তাই এই বিষয়টিকে নিছক সামাজিক শিষ্টাচারের পর্যায়ে রাখেনি। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে ইসলাম ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘সিলাতুর রাহিম’। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার উছিলায় তোমরা একে অপরের নিকট (নিজেদের হক) চেয়ে থাক এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকেও বিরত থাক। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১)

আয়াতটি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ককে এখানে আল্লাহভীতির আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল পারিবারিক সৌজন্যের বিষয় নয়; বরং মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনেরও একটি অংশ। বস্তুত আত্মীয়তার সম্পর্ক মানবজীবনের সবচেয়ে প্রাচীন সামাজিক কাঠামো। রাষ্ট্রের জন্মের আগে পরিবার ছিল, আধুনিক কল্যাণব্যবস্থার আগে আত্মীয়তা ছিল। বিপদে-আপদে, অসুস্থতায়, দুঃসময়ে মানুষ প্রথমে যাদের দিকে তাকিয়েছে, তারা ছিল তার স্বজনরা। তাই আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হওয়া মানে কেবল কয়েকটি সম্পর্কের অবনতি নয়; বরং সমাজের ভেতরের মানবিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া।

আজকের পৃথিবীতে মানুষকে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তার একটি হলো একাকীত্ব। প্রযুক্তি মানুষের চারপাশে শব্দ তৈরি করেছে, কিন্তু সবসময় সঙ্গ তৈরি করতে পারেনি। অনলাইন উপস্থিতি বেড়েছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব সম্পর্ক কমেছে। বৃদ্ধ বাবা-মা, একাকী আত্মীয়, অবহেলিত স্বজন—এই বাস্তবতা কেবল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কারণে নয়, এটি সম্পর্কের অগ্রাধিকার এবং তার অনুভব কমে যাওয়ার ফল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং তার আয়ুতে বরকত আসুক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)

এখানে ‘বরকত’ শব্দটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক সভ্যতা মানুষকে সাফল্যের বহু সূত্র দিয়েছে, কিন্তু জীবনে বরকত এনে দেওয়ার কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারেনি। বরকত আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর সেই বরকতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে নবী করিম (সা.) আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে সিলাতুর রাহিমের অর্থ শুধু ঈদে কুশল বিনিময় নয়। এর অর্থ হলো খোঁজ নেওয়া, পাশে দাঁড়ানো, অভিমান ভাঙা, প্রয়োজনে সবার আগে এগিয়ে আসা। এমনকি সম্পর্কের অপর প্রান্ত থেকে সাড়া না এলেও নিজের দায়িত্ব পালন করে যাওয়া। কারণ ইসলাম সম্পর্ককে প্রতিদানের ভিত্তিতে নয়, দায়িত্বের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে।

আজ আমাদের প্রযুক্তি আছে, আপন আপন শিডিউল আছে, স্মার্টফোন আছে; কিন্তু জীবনের সম্পর্কগুলোর জন্য নির্ধারিত সময় নেই। হয়তো সমস্যাটি প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যাটি অগ্রাধিকারে। যে মানুষটি প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে কাটাতে পারে, সে যদি সপ্তাহে এক দিন কোনো আত্মীয়ের খোঁজ নেওয়ার জন্য সময় বের করতে না পারে, তবে সেটি ব্যস্ততার সমস্যা নয়; সেটি মূল্যবোধের সমস্যা।

ডিজিটাল যুগে তাই সিলাতুর রাহিমের শিক্ষা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ইসলাম মানুষকে শুধু সংযুক্ত থাকতে শেখায় না; সংযুক্ত থাকার অর্থও শেখায়। মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা, আত্মীয়তার বন্ধন জীবিত রাখা এবং স্বজনের পাশে দাঁড়ানো—এসবই এমন আমল, যার প্রভাব পৃথিবীতেও পড়ে, আখিরাতেও। যোগাযোগের এই বিপ্লবী যুগে আমাদের নতুন করে মনে রাখা দরকার—একটি ফোনকল প্রযুক্তির কাজ, কিন্তু খোঁজ নেওয়া হৃদয়ের কাজ। আর হৃদয়ের এই সম্পর্কগুলোকেই ইসলাম ‘সিলাতুর রাহিম’ নামে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে।
 

পবিত্র কোরআন নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত পাঁচ জাদুঘর

আবরার আবদুল্লাহ
পবিত্র কোরআন নিয়ে বিশ্ববিখ্যাত পাঁচ জাদুঘর
বাইত আল কোরআন, বাহরাইন।

কোরআন মুসলিমদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ এবং সর্বশেষ নাজিল হওয়া আসমানি কিতাব। কোরআন ও তার মর্যাদা রক্ষা করা মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। মহানবী (সা.)-এর সময় থেকে যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে কোরআন সংরক্ষিত হয়ে আসছে। আধুনিক যুগে কোরআন সংরক্ষণের একটি মাধ্যম জাদুঘর। পবিত্র কোরআন সংরক্ষণের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বিশেষায়িত জাদুঘর, যার মধ্যে পাঁচটি বিখ্যাত জাদুঘরের বিবরণ তুলে ধরা হলো।

১. বাইত আল কোরআন : বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত বিশেষায়িত এই জাদুঘর ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সংগ্রহে ১০ হাজারের বেশি কোরআনের অনুলিপি রয়েছে, যার মধ্যে আছে খলিফা উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে তৈরি কোরআনের অনুলিপি।

ধারণা করা হয়, এটাই কোরআনের সবচেয়ে প্রাচীন কপি। আরো আছে, হিজরি প্রথম শতকের (৭০০ খ্রি.) একাধিক অনুলিপি, জার্মানি থেকে মুদ্রিত প্রথম কোরআন (১৬৯৪ খ্রি.), সুইজারল্যান্ড থেকে প্রকাশিত কোরআনের প্রথম লাতিন অনুবাদ (৯৫৫ খ্রি.), কোরআনের ক্ষুদ্রতম অনুলিপি ইত্যাদি। জাদুঘর হলেও এখানে আছে ৫০ হাজার বইয়ে সমৃদ্ধ একটি বড় পাঠাগার, সুপরিসর মসজিদ ও সভাকক্ষ।

২. হলি কোরআন এক্সিবিশন : সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত এই জাদুঘরটি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আধুনিক কোরআন প্রদর্শনীকেন্দ্র, যা মসজিদে নববী কমপ্লেক্সের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় অবস্থিত। এই জাদুঘরে হিজরি প্রথম শতক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত একাধিক কোরআনের অনুলিপি প্রদর্শন করা হয়েছে। বিশেষত ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কোরআন মুদ্রণের ইতিহাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এখানে হাফেজ উসমান কর্তৃক প্রস্তুতকৃত কোরআনের অনুলিপি আছে, যা হরিণের চামড়ায় লেখা হয়েছে।

এ ছাড়া আছে প্রায় ২০০ বছর আগে গোলাম মহিউদ্দিন প্রস্তুতকৃত কোরআনের বৃহৎ অনুলিপি। এটা এত ভারী যে চারটি উটের পিঠে করে তা আফগানিস্তান থেকে মদিনায় আনা হয়েছিল। পাণ্ডুলিপিটি দেড় মিটার লম্বা এবং এক মিটার চওড়া। এর ওজন ১৫৪ কেজি। এর প্রতিটি পৃষ্ঠার নিচে ফারসি ভাষায় কোরআনের অনুবাদ আছে।

৩. হলি কোরআন মিউজিয়াম : সংযুক্ত আরব আমিরাতের সারজায় অবস্থিত এই জাদুঘরকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম আইকনিক কোরআন জাদুঘর মনে করা হয়। এখানে কোরআনের সাড়ে চৌদ্দ শ বছরের ইতিহাস জীবন্ত করে তোলা হয়েছে; যেমন—এখানে প্রথম কোরআন নাজিলের স্থান হিসেবে হেরা গুহার মডেল তৈরি করা হয়েছে। প্রথম যুগে পশুর হাড়, গাছের বাকল ও চামড়ায় কিভাবে আয়াত লেখা হতো তা দৃশ্যমান করা হয়েছে।

পাশাপাশি কোরআন সংরক্ষণের ইতিহাস লিখিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া এখানে কোরআনের ৬০টি প্রাচীন অনুলিপি আছে, যা হিজরি শতক অনুসারে ১৫ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এখানে আছে খেজুরপাতায় লেখা কোরআনের বিরল অনুলিপি।

৪. ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব হলি কোরআন : ইরানের রাজধানী তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জাদুঘরটি কোরআন বিষয়ক সর্ববৃহৎ জাদুঘর এবং এর অবস্থান ভূস্তর থেকে ১৪ মিটার গভীরে। জাদুঘরটির আয়তন ১০ হাজার বর্গমিটার। এখানে শুধু কোরআনের প্রাচীন অনুলিপি ও ইতিহাসই তুলে ধরা হয়নি, কোরআনিক শিল্পকলার বিমূর্ত চিত্রও প্রদর্শন করা হয়েছে।

এই জাদুঘরে চতুর্থ হিজরি শতক থেকে কাজার আমলের শেষ ভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কালের কোরআনের একাধিক অনুলিপি আছে। পাশাপাশি কোরআনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য শিল্পকলা, যেমন—সোনালি প্রলেপ, বাঁধাই, ক্যালিগ্রাফি ইত্যাদির বিকাশপ্রক্রিয়াও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

৫. মালাক্কা আল কোরআন মিউজিয়াম : এটি মালয়েশিয়ার মালাক্কা শহরে অবস্থিত কোরআন বিষয়ক বিশেষায়িত জাদুঘর, যা রেস্তু ফাউন্ডেশন ও মালাক্কা রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় নির্মিত হয়েছে। ১০ জানুয়ারি ২০০৮ জাদুঘরটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এটি মালাক্কার কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে অবস্থিত। এই জাদুঘরে ১২টি প্রধান হল আছে, যাতে কোরআনের বিভিন্ন সংগ্রহ প্রদর্শন করা হয়।

জাদুঘরের সংগ্রহশালায় আছে কোরআনের একাধিক প্রাচীন অনুলিপি ও কোরআন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্পকর্ম ও নিদর্শন।  এ ছাড়া জাদুঘরে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে ওহি নাজিলের প্রেক্ষাপট এবং ইন্দোচীন ও মালয়বিশ্বে ইসলাম প্রচারের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে।

তথ্যঋণ : আরব নিউজ, মাদায়েন প্রজেক্ট, ভিজিট সারজা, ভিজিট ইরান ও উইকিপিডিয়া

অমুসলিমদের প্রতি সৌজন্য ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত

সাইয়্যিদ মুনিব মুর্শিদ
অমুসলিমদের প্রতি সৌজন্য ও মানবিকতার দৃষ্টান্ত
সংগৃহীত ছবি

মানুষের ইতিহাস মূলত সহাবস্থানের ইতিহাস। ভৌগোলিক সীমানা, ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের ভিন্নতা সত্ত্বেও মানুষ যুগে যুগে পাশাপাশি বসবাস করেছে, একে অপরের সঙ্গে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেছে। ইসলাম আবির্ভূত হয়েছিল এমন এক সমাজে, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষ একই ভূখণ্ডে জীবনযাপন করত। তাই ইসলাম শুধু মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিধান দিয়েই থেমে থাকেনি; বরং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সম্পর্ক ও আচরণের ক্ষেত্রেও একটি সুস্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক নীতিমালা উপস্থাপন করেছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমকালীন বিশ্বে ইসলাম সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণার মধ্যে একটি হলো—অমুসলিমদের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিকে শুধু সংঘাত ও দূরত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা। অথচ কোরআন ও সুন্নাহর গভীরে পাঠ ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরে। সেখানে দেখা যায়, যে অমুসলিম মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈরিতা পোষণ করে না, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখে এবং সামাজিক সম্প্রীতির অংশ হয়ে ওঠে, তার সঙ্গে ন্যায়বিচার, সদাচার, সৌজন্য ও মানবিক সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন, সাহাবায়ে কিরামের আমল এবং ইসলামী সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস এই সত্যেরই সাক্ষ্য বহন করে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি ঘৃণা নয় বরং ন্যায়, অবিচার নয় বরং মানবিকতা, বিদ্বেষ নয় বরং উত্তম চরিত্র।

এ কারণেই কোরআন মাজিদ অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে আবেগ বা প্রতিশোধকে নয়, বরং ন্যায়বিচারকে মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা দ্বিনের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : মুমতাহিনা, আয়াত : ৮)

এই আয়াত ইসলামী সামাজিক নীতির একটি মৌলিক ভিত্তি। এখানে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈরিতা বা যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ ও ন্যায়বিচার করা শুধু বৈধই নয়, বরং আল্লাহর নিকট প্রিয় কাজ।

ইমাম ইবন কাসির (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে না, তাদের সঙ্গে সদাচার, সৌজন্য ও ন্যায়বিচার প্রদর্শনের অনুমতি এই আয়াতে প্রদান করা হয়েছে।’ কোরআনের এই নীতির বাস্তব রূপ আমরা দেখতে পাই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনচরিতে। মদিনায় তিনি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের সঙ্গে একটি বহুধর্মীয় সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। ইহুদি গোত্রগুলোর সঙ্গে সামাজিক চুক্তি করেছিলেন, তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন।

শুধু রাষ্ট্র পরিচালনায় নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আছে, এক ইহুদি বালক অসুস্থ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। আবার একবার তাঁর সামনে দিয়ে একটি ইহুদির জানাজা অতিক্রম করলে তিনি সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যান। সাহাবায়ে কিরাম বিস্মিত হয়ে বললেন, এটি তো একজন ইহুদির জানাজা। উত্তরে তিনি বললেন, ‘সে কি একজন মানুষ নয়?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩১২)

মাত্র কয়েকটি শব্দে উচ্চারিত এই বক্তব্য ইসলামের মানবিক দর্শনের গভীরতাকে প্রকাশ করে। মানুষের ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তার মানবিক মর্যাদা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অমুসলিম আত্মীয়-স্বজনের প্রতিও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম ভারসাম্যপূর্ণ। আসমা বিনতে আবু বকর (রা.)-এর মুশরিক মা তাঁর কাছে এলে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবেন কি না। উত্তরে মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমার মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৬২০)

এই হাদিস প্রমাণ করে, ধর্মীয় পার্থক্য আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার কারণ নয়। বরং আত্মীয়তার অধিকার রক্ষা করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও আমরা একই আদর্শের প্রতিফলন দেখি। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এক বৃদ্ধ অমুসলিমকে ভিক্ষাবৃত্তিতে দেখে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তার ভরণপোষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যৌবনে তার কাছ থেকে কর নেওয়া হবে আর বার্ধক্যে তাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা হবে—এটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।

হানাফি ফিকহের প্রখ্যাত ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) তাঁর ‘আল-খারাজ’ গ্রন্থে এ ঘটনার উল্লেখ করে অমুসলিম নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকারের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন। তবে ইসলামের এই সৌজন্য ও মানবিকতা কখনো বিশ্বাসগত আপসের নাম নয়। মুসলমান অমুসলিমের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ও সদয় হবে, কিন্তু নিজের ঈমান, আকিদা ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখবে। ইসলাম যেমন অন্যের অধিকার সংরক্ষণের শিক্ষা দেয়, তেমনি নিজের বিশ্বাসের দৃঢ়তাও বজায় রাখতে বলে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) লিখেছেন, ‘অমুসলিমের প্রতি ন্যায়বিচার করা ইসলামের অপরিহার্য শিক্ষা। অন্যায় করা কিংবা তার অধিকার হরণ করা কোনো অবস্থায় বৈধ নয়।’

আজকের বিশ্বে যখন ধর্মীয় বিভাজন, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা নানা সংকট তৈরি করছে, তখন ইসলামের এই ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা নতুন করে স্মরণ করা জরুরি। ইসলাম মানুষকে তার ধর্মের কারণে ঘৃণা করতে শেখায় না; বরং অন্যায়ের বিরোধিতা করতে এবং মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতে শেখায়।

একজন অমুসলিম যদি মুসলমানদের প্রতি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ আচরণ করে, প্রতিবেশী হিসেবে সহযোগিতা করে, সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখে এবং কোনো বৈরিতায় লিপ্ত না থাকে, তাহলে তার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করা, অসুস্থ হলে খোঁজ নেওয়া, বিপদে সাহায্য করা, ব্যবসায়িক লেনদেনে সততা রক্ষা করা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা ইসলামী শিক্ষারই অংশ। বস্তুত ইসলামের শক্তি তার ন্যায়পরায়ণতায়, সৌন্দর্য তার চরিত্রে এবং বিশ্বজনীনতা তার মানবিকতায়। একজন মুসলমানের আচরণে যখন কোরআনের ন্যায়বিচার, নববী আদর্শের সৌজন্য এবং ইসলামের মানবিক মূল্যবোধ একত্রে প্রতিফলিত হয়, তখন সে কেবল নিজের ধর্মকেই প্রতিনিধিত্ব করে না; বরং মানবতার জন্য ইসলামের প্রকৃত বার্তাও তুলে ধরে।