মানুষ এই পৃথিবীতে নানা উদ্দেশ্যে ছুটে বেড়ায়। কেউ সম্পদের পেছনে, কেউ সম্মানের পেছনে, আবার কেউ ক্ষমতার পেছনে জীবন ব্যয় করে। কিন্তু এসব অর্জন একদিন ফুরিয়ে যাবে। কবরের অন্ধকারে, হাশরের ময়দানে এবং জান্নাত-জাহান্নামের চূড়ান্ত বিচারের মুহূর্তে মানুষের প্রকৃত সম্পদ হবে তার নেক আমল। তাই আল্লাহ তাআলা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে নেক আমলকারীদের জন্য এমনসব মহাপুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের কল্পনাতেও আসেনি।
একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হলো এই বিশ্বাস যে, তার প্রতিটি সৎকাজ, প্রতিটি ইবাদত, প্রতিটি ত্যাগ ও প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর প্রতিদান আল্লাহ তাআলার কাছে সংরক্ষিত আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যে ব্যক্তিই নেক আমল করবে এমতাবস্থায় সে হবে একজন মুমিন, তাহলে অবশ্যই তাকে আমি দুনিয়ার বুকে পবিত্র জীবনযাপন করাবো এবং আখিরাতের জীবনেও আমি তাদের কৃতকর্মের উত্তম বিনিময় দান করব।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)।
আল্লাহ নেক আমলকারীদের সম্পর্কে আরো বলেন, ‘আর যারাই আল্লাহতায়ালার ওপর ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তাদের কোনো ভয় নেই, কেননা আমি কখনো তাদের বিনিময় বিনষ্ট করি না, যারা নেক আমল করে। তাদের জন্য রয়েছে এমন এক স্থায়ী জান্নাত, তার পাদদেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে, তাদের সেখানে সোনার কাঁকন দ্বারা অলংকৃত করা হবে, তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমের পোশাক। এমনকি তারা সমাসীন হবে সুসজ্জিত আসনে। কত সুন্দর তাদের এ বিনিময়, কত চমৎকার তাদের আশ্রয়ের স্থানটি।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৩০-৩১)
প্রত্যেক মুসলমান নিয়মিত আমলের মাধ্যমে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন। নিয়মিত আমল এবং আল্লাহকে ভয় মানুষকে পরকালে নাজাত পেতে সাহায্য করবে এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ থাকবে। ভালো কাজের মধ্য দিয়ে যারা নিজেকে সমর্পণ করবে এবং ইসলামের বিধিবিধান অনুযায়ী ইহকালীন জীবন অতিবাহিত করবে, আল্লাহ তাদের সুখ শান্তিময় বেহেশত দান করবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আজ প্রত্যেক মানুষকে সে পরিমাণ প্রতিফলই দেওয়া হবে যে পরিমাণ সে দুনিয়ায় অর্জন করে এসেছে, আজ কারও প্রতি কোনো রকম অবিচার করা হবে না, অবশ্যই আল্লাহতায়ালা দ্রুত হিসাব গ্রহণে তৎপর।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ১৭)
কেয়ামতের ময়দানে কারও প্রতি আল্লাহ জুলুম করবেন না। সেদিন গুনাহ ও সওয়াবের মাধ্যমে সব জুলুমের বদলা নেওয়া হবে। সেদিন প্রত্যেককে তার কাজের হিসাব দিতে হবে। তা গোপন হোক কিংবা প্রকাশ্য। নেক কাজের জন্য পুরস্কার ও অন্যায় বা পাপ কাজের জন্য ভোগ করতে হবে শাস্তি। তবে ক্ষমা বা মুক্তি থাকবে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে কোনো ব্যক্তিই নেক আমল করে সে নিজের উপকার বা কল্যাণের জন্য করে আর যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ করে তার ওপরই তা বর্তাবে। আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি কখনোই জুলুম করেন না।’ (সুরা : হা-মিম সাজদা, আয়াত : ৪৬)
আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ইমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তাদের মেহমানদারির জন্য জান্নাতুল ফেরদৌস সাজানো রয়েছে।’ (সুরা আল কাহাফ, আয়াত ১০৭)
আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন, ‘আল্লাহর কাছে কোন আমল সর্বাধিক প্রিয়? তিনি উত্তর দিলেন, যে আমল সর্বদা করা হয়, চাই তা কম হোক।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪৬৫)
হাদিসে আরও এসেছে, বান্দা যখন কোনো নেক আমল করতে থাকে এরপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন তার আমলনামা লেখার ফেরেশতাকে বলা হয় এই বান্দা সুস্থ অবস্থায় যে আমল করত (এখন অসুস্থ হওয়ায়) তার আমলনামায় তা লিখতে থাক। যতক্ষণ না তাকে আমি মুক্ত করে দিই অথবা তাকে আমার কাছে ডেকে আনি। (মিশকাত শরিফ, হাদিস : ১৫৫৯)।
অতএব, নেক আমল কখনো বৃথা যায় না। মানুষের চোখে তা ক্ষুদ্র মনে হলেও আল্লাহ তাআলার দরবারে তার মূল্য হতে পারে পাহাড়সম। একটি আন্তরিক সিজদা, একটি গোপন সদকা, একটি উত্তম চরিত্র কিংবা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা সামান্য ত্যাগও আখিরাতে অসীম প্রতিদানের কারণ হতে পারে। তাই একজন বুদ্ধিমান মুমিন দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লাভের চেয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতাকে প্রাধান্য দেয়। আসুন, আমরা সবাই নেক আমলের পথে অবিচল থাকি, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি এবং সেই মহান দিনের প্রস্তুতি গ্রহণ করি, যেদিন আল্লাহ তাআলা নেককার বান্দাদের এমন পুরস্কার দান করবেন, যা হবে অনন্ত সুখ, চিরস্থায়ী শান্তি এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের সর্বোচ্চ সম্মান। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন।







