• ই-পেপার

প্রচন্ড গরম থেকে বাঁচতে যে দোয়া পড়বেন

প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর যে পাঁচ আমল করবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর যে পাঁচ আমল করবেন
সংগৃহীত ছবি

নামাজ একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি বান্দাকে তার রবের সঙ্গে সংযুক্ত করে, হৃদয়কে প্রশান্ত করে এবং গুনাহ থেকে দূরে রাখে। কিন্তু অনেকেই সালাম ফিরিয়ে দ্রুত উঠে পড়েন, অথচ নামাজ-পরবর্তী কয়েকটি মুহূর্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক মূল্যবান সুযোগ। মহানবী (সা.) শুধু নামাজ আদায় করেই থেমে যেতেন না; বরং নামাজের পরও কিছু আমল নিয়মিত পালন করতেন। এসব আমল মুমিনের ঈমানকে দৃঢ় করে, গুনাহ ক্ষমার কারণ হয় এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ সহজ করে দেয়। আমলগুলো হলো—

১. ইস্তিগফার পাঠ করা : মহানবী (সা.) সালাম ফিরানোর পর তিনবার ইস্তিগফার করতেন।

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ

উচ্চারণ : ‘আসতাগফিরুল্লাহ’।

অর্থ : ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ 

হাদিস : মহানবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা দূর করে দেন, প্রতিটি সংকট থেকে মুক্তির পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (আবু দাউদ, হাদিস নং : ১৫১৮)


২. তাসবিহ ও তাহলিল পাঠ করা : মহানবী (সা.) বলেছেন,

مَنْ سَبَّحَ اللَّهَ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ، وَحَمِدَ اللَّهَ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ، وَكَبَّرَ اللَّهَ ثَلَاثًا وَثَلَاثِينَ... غُفِرَتْ خَطَايَاهُ وَإِنْ كَانَتْ مِثْلَ زَبَدِ الْبَحْرِ

‘যে ব্যক্তি প্রতি ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’, ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ এবং ৩৩ বার ‘আল্লাহু আকবার’ পাঠ করবে, তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণ হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৫৯৭)

এরপর পড়া উত্তম :

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

উচ্চারণ : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির।’

অর্থ : ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোনো শরিক নেই, সমস্ত রাজত্ব ও সকল প্রশংসা তার। আর তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’


৩. আয়াতুল কুরসি পাঠ করা : মহানবী (সা.) (সা.) বলেছেন,

مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيِّ دُبُرَ كُلِّ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنْ دُخُولِ الْجَنَّةِ إِلَّا الْمَوْتُ

‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।’ (নাসায়ি, হাদিস নং : ৯৯২৮)

আয়াতুল কুরসি হলো-

اَللّٰهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَۚ اَلۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ۬ۚ لَا تَاۡخُذُهٗ سِنَۃٌ وَّ لَا نَوۡمٌ ؕ لَهٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَ مَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَشۡفَعُ عِنۡدَهٗۤ اِلَّا بِاِذۡنِهٖ ؕ یَعۡلَمُ مَا بَیۡنَ اَیۡدِیۡهِمۡ وَ مَا خَلۡفَهُمۡ ۚ وَ لَا یُحِیۡطُوۡنَ بِشَیۡءٍ مِّنۡ عِلۡمِهٖۤ اِلَّا بِمَا شَآءَ ۚ وَسِعَ كُرۡسِیُّهُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ ۚ وَ لَا یَـُٔوۡدُهٗ حِفۡظُهُمَا ۚ وَ هُوَ الۡعَلِیُّ الۡعَظِیۡمُ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম। লা তাখুজুহু সিনাতুঁ ওয়ালা নাওম। লাহু মা ফিস সামাওয়াতি ওয়া মা ফিল আরদ। মান জাল্লাজি ইয়াশফাউ ইন্দাহু ইল্লা বিইজনিহ। ইয়ালামু মা বাইনা আইদিহিম ওয়া মা খালফাহুম। ওয়ালা ইউহিতুনা বিশাইয়িম মিন ইলমিহি ইল্লা বিমা শাআ। ওয়াসিআ কুরসিয়্যুহুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ। ওয়ালা ইয়াউদুহু হিফজুহুমা। ওয়া হুওয়াল আলিয়্যুল আজিম।’

অর্থ : ‘আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক ও রক্ষক। তাকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তার। কে আছে এমন, যে তার অনুমতি ছাড়া তার কাছে সুপারিশ করতে পারে? তিনি জানেন তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে। আর তার জ্ঞানের কোনো অংশই তারা আয়ত্ত করতে পারে না, তবে তিনি যতটুকু চান ততটুকু ছাড়া। তার কুরসি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীকে পরিব্যাপ্ত করে আছে। এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ তাকে ক্লান্ত করে না। আর তিনি সর্বোচ্চ, মহান।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৫৫)

৪. দোয়া ও মোনাজাত করা : নামাজের পরের সময় দোয়া কবুল হওয়ার অন্যতম উত্তম সময়। এক ব্যক্তি মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, কোন দোয়া বেশি কবুল হয়? তিনি বললেন—

جَوْفُ اللَّيْلِ الْآخِرِ وَدُبُرَ الصَّلَوَاتِ الْمَكْتُوبَاتِ

‘রাতের শেষ অংশে এবং ফরজ নামাজের পর করা দোয়া।’ (তারগিব ওয়াত তারহিব, হাদিস নং : ১৬৪৮)

তাই নামাজের পর নিজের, পরিবারের, উম্মাহর এবং আখিরাতের কল্যাণের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা উচিত।

৫. কিছুক্ষণ মুসাল্লায় অবস্থান করা : অনেকেই নামাজ শেষে তাড়াহুড়া করে চলে যান। অথচ কিছুক্ষণ বসে জিকির-আজকার করা বিরাট সওয়াবের কাজ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ফেরেশতারা তার জন্য এই বলে দোয়া করতে থাকে যে,

اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ، اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মাগফির লাহু, আল্লাহুম্মারহামহু।’

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, হে আল্লাহ! তার প্রতি দয়া করুন।’

যতক্ষণ ব্যক্তি নামাজের স্থানে অজু অবস্থায় অবস্থান করে ফেরেশতারা তার জন্য এভাবে দোয়া করতে থাকেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৪৪৫, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬৪৯)

ফরজ নামাজ মুমিনের ওপর দায়িত্ব ও আবশ্যক, কিন্তু নামাজ-পরবর্তী আমলগুলো সেই দায়িত্বকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। মাত্র কয়েক মিনিটের ইস্তিগফার, তাসবিহ, আয়াতুল কুরসি, দোয়া এবং মুসাল্লায় কিছুক্ষণ অবস্থান—এসব আমল একজন মুমিনের ইমানকে শক্তিশালী করে, গুনাহ মাফের কারণ হয় এবং জান্নাতের পথকে সহজ করে দেয়।

তাই আজ থেকেই সংকল্প করি—সালাম ফিরিয়েই যেন ইবাদতের সমাপ্তি না ঘটে; বরং নামাজের পরের এই বরকতময় মুহূর্তগুলোকে আল্লাহর স্মরণে, ক্ষমা প্রার্থনায় এবং দোয়ায় সমৃদ্ধ করি। মনে রাখুন, অনেক সময় নামাজের পরের কয়েক মিনিটই হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুক। আমিন। 

নেক আমলকারীদের অমুল্য প্রতিদান

ইসলামী জীবন ডেস্ক
নেক আমলকারীদের অমুল্য প্রতিদান
সংগৃহীত ছবি

মানুষ এই পৃথিবীতে নানা উদ্দেশ্যে ছুটে বেড়ায়। কেউ সম্পদের পেছনে, কেউ সম্মানের পেছনে, আবার কেউ ক্ষমতার পেছনে জীবন ব্যয় করে। কিন্তু এসব অর্জন একদিন ফুরিয়ে যাবে। কবরের অন্ধকারে, হাশরের ময়দানে এবং জান্নাত-জাহান্নামের চূড়ান্ত বিচারের মুহূর্তে মানুষের প্রকৃত সম্পদ হবে তার নেক আমল। তাই আল্লাহ তাআলা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে নেক আমলকারীদের জন্য এমনসব মহাপুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের কল্পনাতেও আসেনি। 

আরো পড়ুন
জান্নাতে বিশেষ আপ্যায়নে আমিষজাতীয় খাদ্য

জান্নাতে বিশেষ আপ্যায়নে আমিষজাতীয় খাদ্য

 

একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা হলো এই বিশ্বাস যে, তার প্রতিটি সৎকাজ, প্রতিটি ইবাদত, প্রতিটি ত্যাগ ও প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর প্রতিদান আল্লাহ তাআলার কাছে সংরক্ষিত আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে যে ব্যক্তিই নেক আমল করবে এমতাবস্থায় সে হবে একজন মুমিন, তাহলে অবশ্যই তাকে আমি দুনিয়ার বুকে পবিত্র জীবনযাপন করাবো এবং আখিরাতের জীবনেও আমি তাদের কৃতকর্মের উত্তম বিনিময় দান করব।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)।

আল্লাহ নেক আমলকারীদের সম্পর্কে আরো বলেন, ‘আর যারাই আল্লাহতায়ালার ওপর ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তাদের কোনো ভয় নেই, কেননা আমি কখনো তাদের বিনিময় বিনষ্ট করি না, যারা নেক আমল করে। তাদের জন্য রয়েছে এমন এক স্থায়ী জান্নাত, তার পাদদেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে, তাদের সেখানে সোনার কাঁকন দ্বারা অলংকৃত করা হবে, তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমের পোশাক। এমনকি তারা সমাসীন হবে সুসজ্জিত আসনে। কত সুন্দর তাদের এ বিনিময়, কত চমৎকার তাদের আশ্রয়ের স্থানটি।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৩০-৩১)

প্রত্যেক মুসলমান নিয়মিত আমলের মাধ্যমে আল্লাহ রব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন। নিয়মিত আমল এবং আল্লাহকে ভয় মানুষকে পরকালে নাজাত পেতে সাহায্য করবে এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ থাকবে। ভালো কাজের মধ্য দিয়ে যারা নিজেকে সমর্পণ করবে এবং ইসলামের বিধিবিধান অনুযায়ী ইহকালীন জীবন অতিবাহিত করবে, আল্লাহ তাদের সুখ শান্তিময় বেহেশত দান করবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আজ প্রত্যেক মানুষকে সে পরিমাণ প্রতিফলই দেওয়া হবে যে পরিমাণ সে দুনিয়ায় অর্জন করে এসেছে, আজ কারও প্রতি কোনো রকম অবিচার করা হবে না, অবশ্যই আল্লাহতায়ালা দ্রুত হিসাব গ্রহণে তৎপর।’ (সুরা : মুমিন, আয়াত : ১৭)

কেয়ামতের ময়দানে কারও প্রতি আল্লাহ জুলুম করবেন না। সেদিন গুনাহ ও সওয়াবের মাধ্যমে সব জুলুমের বদলা নেওয়া হবে। সেদিন প্রত্যেককে তার কাজের হিসাব দিতে হবে। তা গোপন হোক কিংবা প্রকাশ্য। নেক কাজের জন্য পুরস্কার ও অন্যায় বা পাপ কাজের জন্য ভোগ করতে হবে শাস্তি। তবে ক্ষমা বা মুক্তি থাকবে আল্লাহর ইচ্ছাধীন। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে কোনো ব্যক্তিই নেক আমল করে সে নিজের উপকার বা কল্যাণের জন্য করে আর যে ব্যক্তি কোনো মন্দ কাজ করে তার ওপরই তা বর্তাবে। আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি কখনোই জুলুম করেন না।’ (সুরা : হা-মিম সাজদা, আয়াত : ৪৬)

আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ইমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে তাদের মেহমানদারির জন্য জান্নাতুল ফেরদৌস সাজানো রয়েছে।’ (সুরা আল কাহাফ, আয়াত ১০৭)

আরো পড়ুন
নেক আমলের পুরস্কার

নেক আমলের পুরস্কার

 

আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলেন, ‘আল্লাহর কাছে কোন আমল সর্বাধিক প্রিয়? তিনি উত্তর দিলেন, যে আমল সর্বদা করা হয়, চাই তা কম হোক।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৪৬৫)

হাদিসে আরও এসেছে, বান্দা যখন কোনো নেক আমল করতে থাকে এরপর সে অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন তার আমলনামা লেখার ফেরেশতাকে বলা হয় এই বান্দা সুস্থ অবস্থায় যে আমল করত (এখন অসুস্থ হওয়ায়) তার আমলনামায় তা লিখতে থাক। যতক্ষণ না তাকে আমি মুক্ত করে দিই অথবা তাকে আমার কাছে ডেকে আনি। (মিশকাত শরিফ, হাদিস : ১৫৫৯)। 

অতএব, নেক আমল কখনো বৃথা যায় না। মানুষের চোখে তা ক্ষুদ্র মনে হলেও আল্লাহ তাআলার দরবারে তার মূল্য হতে পারে পাহাড়সম। একটি আন্তরিক সিজদা, একটি গোপন সদকা, একটি উত্তম চরিত্র কিংবা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা সামান্য ত্যাগও আখিরাতে অসীম প্রতিদানের কারণ হতে পারে। তাই একজন বুদ্ধিমান মুমিন দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লাভের চেয়ে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতাকে প্রাধান্য দেয়। আসুন, আমরা সবাই নেক আমলের পথে অবিচল থাকি, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি এবং সেই মহান দিনের প্রস্তুতি গ্রহণ করি, যেদিন আল্লাহ তাআলা নেককার বান্দাদের এমন পুরস্কার দান করবেন, যা হবে অনন্ত সুখ, চিরস্থায়ী শান্তি এবং তাঁর সন্তুষ্টি লাভের সর্বোচ্চ সম্মান। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন। 

কোরআনের বাণী

কেয়ামতের আগে ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতের আগে ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

 حَتّٰۤی اِذَا فُتِحَتۡ یَاۡجُوۡجُ وَ مَاۡجُوۡجُ وَ هُمۡ مِّنۡ كُلِّ حَدَبٍ یَّنۡسِلُوۡنَ

সরল অনুবাদ : 
‘অবশেষে যখন ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্তি দেয়া হবে, আর তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি হতে ছুটে আসবে।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৯৬) 

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : 
হুজায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমরা কয়েকজন সাহাবি একত্রিত হয়ে পরস্পর কিছু আলোচনা করছিলাম। ইতিমধ্যে মহানবী (সা.) আগমন করলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি বিষয়ে আলোচনা করছো? আমরা বললাম, আমরা কেয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করছি। তখন তিনি বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত দশটি আলামত প্ৰকাশ না পাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কেয়ামত সংঘটিত হবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৯০১) তিনি দশটি আলামতের মধ্যে ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশের কথাও উল্লেখ করেছেন।

তারা হলো নবী নুহ (আ.)-এর বংশধর এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক মানবগোষ্ঠী। তারা বর্তমানে একটি প্রাচীরের আড়ালে বন্দী রয়েছে। প্রতিদিন তা ভাঙার চেষ্টা করছে। তারা প্রতিদিন দেয়াল খনন করে কিন্তু ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে না। তাই আল্লাহ প্রতিদিন দেয়ালটি আগের চেয়েও শক্তিশালী করে দেন। তবে কিয়ামতের ঠিক আগে একদিন তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ বলবে এবং দেয়াল ভেঙে তারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। মুক্ত হওয়ার পর এই বিশাল দলটি পৃথিবীর সব জলাশয় ও নদী শুকিয়ে ফেলবে এবং সর্বত্র চরম বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে। তখন হযরত ঈসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা এদের হাত থেকে বাঁচতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন। তারপর আল্লাহর হুকুমে ইয়াজুজ-মাজুজের ঘাড়ে এক ধরনের পোকা বা রোগ দেখা দেবে এবং এর ফলেই তারা সকলে একসঙ্গে মৃত্যুবরণ করবে। এরপর আল্লাহ বিশেষ পাখি বা বৃষ্টির মাধ্যমে তাদের মৃতদেহ পরিষ্কার করবেন। (

এ আয়াতে ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে فتحت শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর বাহ্যিক অর্থ হলো, সেই নির্ধারিত সময়ের পূর্বে তারা কোন বাধার সম্মুখীন হয়ে থাকবে।

 حدب শব্দের অর্থ প্রত্যেক উচ্চ ভূমি-বড় পাহাড় কিংবা ছোট ছোট টিলা। (ইবন কাসির) সুরা কাহফে ইয়াজুজ-মাজুজের আলোচনা থেকে তাদের বর্তমান অবস্থান কোন কোন পর্বতমালার পশ্চাতে তা জানা যায়। তাই আত্মপ্রকাশের সময় তারা পর্বত ও টিলাসমূহ থেকে বের হয়ে জমিনের মধ্যে ফাসাদ সৃষ্টি করবে। (ইবন কাসির, তাফসিরে জাকারিয়া)

ইয়াজুজ-মাজুজের বিস্তারিত বিবরণ সুরা-কাহফের শেষে (৯৩-৯৮ আয়াতে) উল্লেখ করা হয়েছে। কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ঈসা (আ.)-এর বর্তমানে তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। এরা এত বেশি দ্রুত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে যে, মনে হবে প্রতিটি উঁচু জায়গা হতেই তারা ছুটে আসছে। তাদের অনিষ্টতা ও অত্যাচারে মুসলিমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠবে। এমনকি ঈসা (আ.) মুসলিমদের নিয়ে তুর পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নেবেন। তারপর ঈসা (আ.)-এর অভিশাপে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। তাদের শবদেহের দুর্গন্ধে সর্বদিক ভরে উঠবে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা এক জাতীয় পাখি প্রেরণ করবেন; যারা তাদের লাশগুলো তুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। তারপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষন করবেন, যাতে সারা পৃথিবী পরিষ্কার হয়ে যাবে। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান)

হাদিসের বাণী

শুধু যে তিন ব্যক্তি অন্যের কাছে চাইতে পারবে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
শুধু যে তিন ব্যক্তি অন্যের কাছে চাইতে পারবে
সংগৃহীত ছবি

আবু বিশর কাবিসাহ ইবনুল মুখারিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমার ওপর কিছু আর্থিক দণ্ড (হুদুদ জাতীয়) এসে বর্তায়, তাই আর্থিক কিছু সাহায্য নেয়ার জন্য আমি মহানবী (সা.)-এর কাছে আসলাম। মহানবী (সা.) বললেন, সাদাকাহের মাল আসার আগ পর্যন্ত তুমি অপেক্ষা কর। সাদাকাহের মাল এলে আমি তোমাকে দেওয়ার জন্য আদেশ করব। তারপর তিনি বললেন, হে কাবিসাহ, তিন ধরনের ব্যক্তি ব্যতীত আর কারো জন্য অন্যের কাছে কোনো কিছু চাওয়া বৈধ নয় : 

আরো পড়ুন
সদকায় মিলে সম্মান ও নিরাপত্তার জীবন

সদকায় মিলে সম্মান ও নিরাপত্তার জীবন

 


১. যে ব্যক্তি আর্থিক সংকটে পড়বে। তার জন্য অন্যের কাছে চাওয়া বৈধ। তবে যখনই তার প্রয়োজন ও সংকট শেষ হয়ে যাবে, তখন আর সে কখনো আর অন্যের কাছে কোনো আর্থিক সাহায্য চাইতে পারবে না। 
২. যে ব্যক্তি কোনো বিপদে পড়বে, তাহলে তার জন্য সচ্ছল অবস্থায় ফিরে আসার আগ পর্যন্ত অন্যের কাছে কোনো কিছু চাওয়ার অবকাশ আছে। 
৩. যে ব্যক্তি এমন অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়বে এবং তার সম্প্রদায়ের তিনজন জ্ঞানী ব্যক্তি এ কথার সাক্ষ্য দেবে যে, অমুক লোক অভাবী, তখন তার জন্য অন্যের কাছে কোনো কিছু চাওয়ার সুযোগ আছে। হে কাবিসাহ, এ ছাড়া অন্য কারো জন্য কারো কাছে কোনো কিছু চেয়ে খাওয়া সুদ হবে। সে যা খাবে, তা তার জন্য সুদ হবে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ২৪০৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১৫৯১৬)


শিক্ষা ও বিধান

১. অকারণে মানুষের কাছে হাত পাতা নিষিদ্ধ। তাই ইসলাম মানুষকে আত্মসম্মান ও আত্মনির্ভরশীলতার শিক্ষা দেয়। প্রকৃত প্রয়োজন ছাড়া মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া বৈধ নয়।

২. প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সাহায্য চাওয়া বৈধ। যে ব্যক্তি বাস্তবিকই বিপদগ্রস্ত, ঋণগ্রস্ত বা অভাবী, তার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী সাহায্য চাওয়ার অনুমতি রয়েছে।

৩. ঋণ ও সামাজিক দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা নেওয়া জায়েজ। তাই কোনো ব্যক্তি যদি মানুষের মধ্যে মীমাংসা, রক্তপণ বা অন্য কোনো সামাজিক দায়িত্ব পালনের কারণে আর্থিক সংকটে পড়ে, তবে সে সাহায্য চাইতে পারে।

৪. বিপদগ্রস্ত মানুষের প্রতি সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। অগ্নিকাণ্ড, বন্যা, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা সমাজের কর্তব্য।

৫. প্রকৃত অভাবীকে সহায়তা করা উচিত। যারা সত্যিকার অর্থে অভাবগ্রস্ত, তাদের প্রয়োজন পূরণে জাকাত, সদকা ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করা ইসলামের নির্দেশ।

৬. মিথ্যা অভাব দেখিয়ে সাহায্য নেওয়া মহাপাপ। অভাবী না হয়েও মানুষের কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তা ভোগ করা হারাম ও গুনাহের কাজ।

৭. সম্পদের ক্ষেত্রে সততা অবলম্বন করা আবশ্যক। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত নিজের আর্থিক অবস্থার ব্যাপারে সত্য বলা এবং প্রতারণার আশ্রয় না নেওয়া।

৮. সমাজের বিশ্বস্ত ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাক্ষ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই কোনো ব্যক্তি প্রকৃত অভাবী কি না, তা নির্ধারণে সমাজের বিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য।

এই হাদিস আমাদের বিশেষভাবে শিক্ষা দেয় যে, ইসলাম আত্মমর্যাদা রক্ষা, পরিশ্রম ও আত্মনির্ভরশীলতাকে উৎসাহিত করে; তবে প্রকৃত অসহায়, ঋণগ্রস্ত ও বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য সাহায্য চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভাব দেখিয়ে মানুষের সম্পদ গ্রহণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।