পবিত্র কোরআন শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক (রক্তের সম্পর্ক) নিয়েই আলোচনা করেনি; বরং ‘ভাই’ এবং এর বিভিন্ন রূপক শব্দকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছে। কোরআনে ‘ভাই’ এবং এর বিভিন্ন শব্দরূপ মোট ৯৬ বার এসেছে। তবে সব ক্ষেত্রেই এর অর্থ রক্তের ভাই নয়; বরং প্রসঙ্গভেদে এর বিভিন্ন অর্থ আছে। আরবি ভাষার মূল অর্থ এবং কোরআনের বিভিন্ন আয়াত পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ‘ভ্রাতৃত্ব’ শব্দটি নিম্নোক্ত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে—
১. রক্তের সম্পর্কের ভাই (ভ্রাতৃত্বের মূল অর্থ),
এটি শব্দটির প্রকৃত ও মূল অর্থ। এর উদাহরণ আল্লাহ তাআলার বাণী—‘আর যখন মুসা (আ.) তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে ক্রুদ্ধ ও দুঃখিত অবস্থায় ফিরে এলেন, তখন বলেন, আমার অনুপস্থিতিতে তোমরা কতই না মন্দ কাজ করলে! তোমরা কি তোমাদের প্রতিপালকের নির্দেশের অপেক্ষা না করেই তাড়াহুড়া করলে?’ অতঃপর তিনি ফলকগুলো নিক্ষেপ করলেন এবং তাঁর ভাই হারুনের মাথার চুল ধরে নিজের দিকে টেনে আনলেন। হারুন বলেন, ‘হে আমার মাতৃগর্ভের ভাই! এ জাতি আমাকে দুর্বল মনে করেছিল এবং প্রায় আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিল। অতএব, আপনি শত্রুদের আমার ওপর হাসার সুযোগ দেবেন না এবং আমাকে জালিমদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ১৫০)
এখানে ‘ভাই’ বলতে প্রকৃত রক্তের ভাইকে বোঝানো হয়েছে।
২. রক্তের সম্পর্ক ছাড়া অন্যান্য অর্থে ভ্রাতৃত্ব
অনেক স্থানে ‘ভাই’ শব্দটি মূল অর্থ থেকে বের হয়ে অংশীদারিত্ব, সাদৃশ্য বা মিল বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধরন নিচে তুলে ধরা হলো—
ক. ঈমান ও আকিদার ভ্রাতৃত্ব : এটি দুই ধরনের হতে পারে—ঈমানের ভ্রাতৃত্ব ও কুফর বা শিরকের ভ্রাতৃত্ব।
(১) ঈমানের ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা : আল-হুজুরাত, আয়াত : ১০)
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, ‘এখানে ভ্রাতৃত্ব বলতে বংশগত সম্পর্ক নয়; বরং দ্বিনের সম্পর্ক বোঝানো হয়েছে। এ কারণেই বলা হয়, দ্বিনের ভ্রাতৃত্ব রক্তের ভ্রাতৃত্বের চেয়েও দৃঢ়। কারণ রক্তের সম্পর্ক ধর্ম ভিন্ন হলে ছিন্ন হয়ে যায়; কিন্তু ঈমানের সম্পর্ক বংশ ভিন্ন হলেও ছিন্ন হয় না।’
(২) কুফর ও মুনাফিকির ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা কুফরি করেছে এবং তাদের ভাইদের সম্পর্কে বলেছে, যখন তারা পৃথিবীতে সফরে ছিল অথবা যুদ্ধে গিয়েছিল, যদি তারা আমাদের কাছে থাকত, তবে মরত না এবং নিহতও হতো না।’ আল্লাহ এ কথাকে তাদের অন্তরে অনুতাপের কারণ বানিয়ে দিয়েছেন। ‘আল্লাহই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৬)
এখানে ‘তাদের ভাই’ বলতে রক্তের ভাই বোঝানো হয়নি; বরং কুফর ও মুনাফিকিতে তাদের সহচরদের বোঝানো হয়েছে।
খ. মানবজাতির ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আদ জাতির কাছে আমরা তাদের ভাই হুদকে প্রেরণ করেছিলাম।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৫০)
কিছু মুফাসসির বলেন, এখানে ‘ভাই’ বলতে বোঝানো হয়েছে—‘তিনি তাদের মতোই একজন মানুষ ছিলেন; সবাই আদম (আ.)-এর সন্তান।’ আবার কেউ বলেছেন, আল্লাহ তাঁকে ‘ভাই’ বলে উল্লেখ করেছেন, যাতে বোঝা যায়, তিনি নিজের জাতির প্রতি ঠিক আপন ভাইয়ের মতোই আন্তরিক, দয়ালু ও কল্যাণকামী ছিলেন।
গ. গোত্রীয় ভ্রাতৃত্ব : ওপরের একই আয়াতের আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে—‘তাদের ভাই’ অর্থাৎ তাদেরই গোত্রের একজন ব্যক্তি। অর্থাৎ হুদ (আ.) আদ জাতিরই একজন সদস্য ছিলেন।
ঘ. শয়তানের ভ্রাতৃত্ব : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি চরম অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ২৭)
এখানে শয়তানের ভাই বলতে প্রকৃত ভাই বোঝানো হয়নি। অর্থ হলো অপচয়কারীরা তাদের এ নিকৃষ্ট কাজে শয়তানের অনুসারী এবং তার অনুরূপ হয়ে যায়। আরবরা এমন ব্যক্তিকে ‘অমুকের ভাই’ বলে, যেকোনো কাজে সর্বদা লিপ্ত থাকে। যেমন—তিনি দানশীলতার ভাই। তিনি সফরের ভাই। অর্থাৎ তিনি ওই গুণের সঙ্গে সর্বদা যুক্ত।
ঙ. বিভিন্ন জাতির পারস্পরিক সম্পর্ক : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখনই কোনো জাতি জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তখনই তারা তাদের পূর্ববর্তী সঙ্গী জাতিকে অভিশাপ দেবে। অবশেষে যখন সবাই সেখানে একত্র হবে, তখন পরবর্তীরা পূর্ববর্তীদের সম্পর্কে বলবে, হে আমাদের রব! এরাই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে। অতএব, তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দিন।’ (সুরা : আল-আরাফ, আয়াত : ৩৮)
এখানে ‘তাদের বোন’ বলতে বোঝানো হয়েছে তাদের সমজাতীয়, অনুরূপ ও একই পথের অনুসারী জাতিকে।
চ. আল্লাহর নিদর্শনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি তাদের যে নিদর্শনই দেখিয়েছি, তা পূর্ববর্তী নিদর্শনের চেয়েও বড় ছিল। আর আমি তাদের শাস্তির মাধ্যমে পাকড়াও করেছি, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা : আজ-জুখরুফ, আয়াত : ৪৮)
এখানে ‘তার বোন’ বলতে বোঝানো হয়েছে, মুসা (আ.)-এর প্রতিটি মুজিজা আগেরটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল এবং প্রত্যেকটি আগেরটির চেয়ে আরো অধিক শক্তিশালী ও স্পষ্ট ছিল। কিছু মুফাসসির বলেন, প্রথম নিদর্শন একটি সত্য প্রমাণ করেছিল, দ্বিতীয়টি সেটিকে আরো স্পষ্ট করেছিল। এভাবে প্রতিটি নিদর্শন পূর্ববর্তীটির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ছিল। এখানে ‘ভ্রাতৃত্ব’ বলতে বোঝানো হয়েছে—সাদৃশ্য, মিল ও পারস্পরিক সম্পর্ক। যেমন বলা হয়—এটি ওটির সাথি বা এটি ওটির অনুরূপ।
এই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—ওপরের আয়াতগুলোর আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়, ঐক্যবদ্ধ ভাইয়েরা শক্তিশালী হয় আর বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এটাই প্রকৃত ভ্রাতৃত্বের অন্যতম ফল। যখন ঈমান, নৈতিকতা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক ভালোবাসার ভিত্তিতে ভ্রাতৃত্ব গড়ে ওঠে, তখন ব্যক্তি, সমাজ ও জাতি শক্তিশালী হয়। আর যখন এই ভ্রাতৃত্ব ভেঙে যায়, তখন দুর্বলতা, বিভক্তি ও পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈমানের ভ্রাতৃত্বকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার এবং পারস্পরিক ভালোবাসা, সহযোগিতা ও ঐক্যের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী মুসলিম সমাজ গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।




