মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার অন্তর। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ঈমান, তাকওয়া, বিবেক ও আল্লাহকে চেনার কেন্দ্র। এ কারণেই কোরআন ও হাদিসে বাহ্যিক আমলের পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতা অর্জনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ একটি পবিত্র অন্তর মানুষকে আল্লাহর দিকে টেনে নেয়, আর অপবিত্র অন্তর ধীরে ধীরে তাকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
মানুষের অন্তর কলুষিত হয় গুনাহ ও অবিশ্বাসের প্রভাবে। মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, গাফেল হয়ে পড়ে, তখন তার অন্তরও আস্তে আস্তে কলুষিত হয়ে যায়। একটা পর্যায়ে গিয়ে তাতে মোহর মেরে দেওয়া হয়, ফলে তার মধ্যে আর সত্য অনুধাবনের শক্তি থাকে না। এটাই হয়ে ওঠে তার চূড়ান্ত আত্মিক অবক্ষয়, যা তাকে স্বদর্পে জাহান্নামের পথে পরিচালিত করে। তারা জেনে-বুঝে সত্যকে উপেক্ষা করে।
অন্তরের অবক্ষয় শুরু হয় একটি গুনাহ দিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা যখন একটি গুনাহ করে তখন তার অন্তরের মধ্যে একটি কালো চিহ্ন পড়ে। অতঃপর যখন সে গুনাহর কাজ পরিহার করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাওবা করে, তার অন্তর তখন পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার পুরো অন্তর এভাবে কালো দাগে ঢেকে যায়। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৩৪)
অর্থাৎ প্রতিটি গুনাহ অন্তরের ওপর একটি ক্ষত তৈরি করে। তাওবাই সেই ক্ষতের চিকিৎসা। কিন্তু তাওবা না করলে তার মাত্রা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। একটা সময় সেই অন্তরের গুনাহের মরিচার আবরণ তৈরি হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘কখনো না, বরং তাদের কর্মই তাদের অন্তরে জং ধরিয়ে দিয়েছে।’ (সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১৪)
অন্তরের অবস্থা এ স্তরে চলে গেলে মানুষের বিবেক দুর্বল হতে থাকে। তখন তাদের কাছে গুনাহকে আর গুনাহ বলে মনে হয় না (নাউজুবিল্লাহ)। এটা অন্তরের কঠিন ব্যাধি। এ সময়ও যদি কারো তাওবা নসিব না হয়, নিজেকে শুধরে না নেয়, তবে তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যায়। তখন কোনো উপদেশ তাদের অন্তরকে স্পর্শ করে না, গুনাহে লিপ্ত হলেও অনুশোচনাবোধ আসে না (নাউজুবিল্লাহ)। পবিত্র কোরআনে অন্তরের এই অবস্থার ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। সুতরাং আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব। কারণ তারা মিথ্যা বলত।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১০)
গুনাহ করতে করতে যখন মানুষের অন্তর কঠিন হয়ে যায়, তখন আর মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের প্রতিও তাদের কোনো আগ্রহ কাজ করে না। এমনকি কোনো ইবাদতেও মন বসে না (নাউজুবিল্লাহ)। হেদায়াতের বাণী তাদের কাছে বিরক্তিকর লাগে। কেউ দ্বিনের দাওয়াত নিয়ে এলে তার প্রতি ক্ষোভ জন্ম নেয়। এমনকি শুধু ইসলাম পালনের কারণে মানুষ তাদের শত্রুতাসুলভ প্রোপাগান্ডার শিকার হয় (নাউজুবিল্লাহ)।
এ অবস্থা থেকে আস্তে আস্তে তারা ধ্বংসের শেষ সীমানায় চলে যায়। এবং তাদের অন্তরে মহর মেরে দেওয়া হয়। যার ফলে তাদের অন্তরে হেদায়াতের আলো গ্রহণের আর কোনো শক্তিই থাকে না। পবিত্র কোরআনে এমন অন্তরের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের চোখসমূহে রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআজাব।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৭)
নাউজুবিল্লাহ। এ মোহর প্রথম গুনাহের শাস্তি নয়; বরং দীর্ঘদিন সত্য অস্বীকার, অহংকার ও অবাধ্যতার পরিণতি। তখন মানুষ সত্য শুনেও তা গ্রহণ করতে পারে না।
তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত অন্তরকে পবিত্র রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা। যেসব কাজে অন্তর আধ্যাত্মিকভাবে সতেজ থাকে, নিজেকে সেসব কাজে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করা। নিয়মিত তাওবা-ইস্তিগফার করা, গুরুত্ব সহকারে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা, নিয়মিত কোরআন চর্চার চেষ্টা করা, আল্লাহর জিকির করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং সৎ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা।
এ ধরনের প্রতিটি পদক্ষেপ অন্তরকে জীবিত রাখতে সহায়তা করে। মানুষ তার মানবীয় দুর্বলতায় গুনাহে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক, তবে মুমিনের কর্তব্য গুনাহ থেকে বিরত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং তার পরও যদি গুনাহ হয়ে যায়, অবিলম্বে তাওবা করে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা। মহান আল্লাহ সবাইকে অন্তরের ব্যাধি ও আত্মিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।




