খেলাধুলা মানুষের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। এটি শরীরকে সুস্থ রাখে, মনকে প্রফুল্ল করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে সহায়তা করে। ইসলামও বৈধ ও কল্যাণকর খেলাধুলা এবং শারীরিক সক্ষমতা অর্জনকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু যখন খেলাধুলা সুস্থ বিনোদনের সীমা অতিক্রম করে অন্ধ সমর্থন, বিদ্বেষ, গালি-গালাজ, মারামারি, আত্মহত্যা কিংবা হত্যাকাণ্ডের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা আর বিনোদন থাকে না; বরং তা একটি সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে ফুটবল বিশ্বকাপ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক খেলাকে কেন্দ্র করে প্রায়ই সংঘর্ষ, আহত হওয়া, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। কোথাও বন্ধুর হাতে বন্ধু নিহত হচ্ছে, কোথাও তুচ্ছ ট্রোলিং বা বিদ্রূপ সহ্য করতে না পেরে কেউ আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ পথ বেছে নিচ্ছে। একজন মুসলমানের জীবন, সময় ও আবেগ এতটা মূল্যহীন হতে পারে না যে, একটি খেলার জয়-পরাজয় তার জীবন ধ্বংস করে দেবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা সীমালঙ্ঘন কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯০)
তাই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ বৈধ; কিন্তু সেই আগ্রহ যদি উন্মাদনায় রূপ নেয়, তাহলে তা ইসলামের শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি।
ইসলামে মানুষের জীবন অত্যন্ত মূল্যবান
মানুষের প্রাণ আল্লাহর দেওয়া অমূল্য আমানত। কোনো তুচ্ছ কারণে মানুষের প্রাণ নষ্ট করা ইসলামে সবচেয়ে বড় অপরাধগুলোর একটি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকেই হত্যা করল। আর যে একজন মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)
ফুটবল কিংবা অন্য কোনো খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, প্রতিহিংসা কিংবা হত্যাকাণ্ড তাই ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ।
আত্মহত্যা মহাপাপ
খেলায় হার-জিতের কারণে আত্মহত্যা করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। একজন মুমিন বিপদে ধৈর্য ধারণ করবে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে; নিজের জীবন ধ্বংস করবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা কোরো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’(সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো বস্তু দিয়ে আত্মহত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সেই বস্তু দিয়েই শাস্তি দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৭৭৮)
তাই কোনো দলের হার কিংবা মানুষের কটূক্তির কারণে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে ভয়াবহ অপরাধ এবং অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা।
আর মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—সে অনর্থক ও ক্ষতিকর বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তারা অনর্থক কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন হলো, সে অনর্থক বিষয় পরিত্যাগ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৭)
অতএব, এমন উন্মাদনা যা মানুষের সময়, সম্পদ, সম্পর্ক ও জীবনকে ধ্বংস করে দেয়, তা একজন মুসলমানের জন্য শোভন নয়।
সুস্থ শরীর গঠনও ইসলামের শিক্ষা
ইসলাম দুর্বলতা নয়; বরং শক্তি ও কর্মক্ষমতার শিক্ষা দেয়। শরীর সুস্থ রাখা ইবাদত পালনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও অধিক উত্তম, যদিও উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৬৪)
তাই ব্যায়াম, দৌড়, সাঁতার, তীরন্দাজি, ঘোড়সওয়ারি কিংবা অন্যান্য বৈধ খেলাধুলা শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য প্রশংসনীয়। কিন্তু এগুলো কখনোই বিবাদ, বিদ্বেষ বা প্রাণহানির কারণ হতে পারে না।
সামাজিক দায়িত্ব ও সচেতনতার প্রয়োজন
খেলাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়ানো, ট্রোলিং, অপমান, উসকানি কিংবা সংঘর্ষ সৃষ্টি করা সামাজিক অপরাধ। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষের আবেগকে উসকে দেন বা সীমাহীন উন্মাদনা সৃষ্টি করেন, তাদেরও নৈতিক দায় রয়েছে। একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ ছড়িয়ে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০)
সুতরাং খেলাধুলা মানুষের সুস্থ জীবন, শারীরিক সক্ষমতা ও বৈধ বিনোদনের একটি সুন্দর মাধ্যম। কিন্তু সেই খেলাকে কেন্দ্র করে যদি সৃষ্টি হয় অন্ধ সমর্থন, বিদ্বেষ, মারামারি, আত্মহত্যা কিংবা প্রাণহানি, তবে তা ইসলামের সংযম, ভারসাম্য ও মানবিকতার শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সংযম, প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন এবং খেলাধুলাকে কল্যাণ, সৌহার্দ্য ও সুস্থ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।




