মানুষের বানানো কোনো আইন দিয়ে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করা পুরোপুরি সম্ভব নয়। মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য আত্মসমর্পণ করতে হয় আল্লাহর বানানো আইনের কাছে। কোরআনের কাছে। নবীর কাছে। এমন সরল স্বীকারোক্তির পর যে কেউ নিজেকে প্রশ্ন করতে পারেন, আমি নিজেকে আল্লাহর আইনের কাছে, কোরআনের কাছে আত্মসমর্পণ করেছি, নাকি লোভ-মোহ-স্বার্থের কাছে বিক্রি করে দিয়েছি; আমি কি কোরআনের আইন অনুযায়ী শান্তির ফেরিওয়ালা হয়েছি, নাকি হানাহানি, মারামারি আর রাহাজানির কালো ডোবায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি।
ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানবতার কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও শান্তি নিশ্চিতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার ও আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমা লঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন’ (সুরা নাহল, আয়াত ৯০)
এই নীতির আলোকে একজন মুসলমানকে ধর্ষণ, হত্যা, গুম, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, সুদ, ঘুষ, চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট, মুনাফাখোরি, মজুদদারিসহ সব ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা ফরজ। কারণ এসব অপরাধ শুধু আইন ভঙ্গ করে না; বরং সমাজের শান্তি, নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধও ধ্বংস করে দেয়।
সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে ইনসাফভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যাতে সাধারণ মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান নিরাপদ থাকে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে বুদ্ধিমানগণ! হত্যার বদলে হত্যার (কিসাস) মধ্যেই তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে’ (সুরা বাকারা-১৭৯)
একইভাবে ইসলাম মানুষের জীবনের মর্যাদাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহর কাছে একজন নিরপরাধ মানুষ হত্যার চেয়েও হালকা।’
তবে ইসলাম কখনো আবেগনির্ভর বিচার বা মবকে সমর্থন করে না। কোনো অপরাধের উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া ইসলামে ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জনরোষের নামে অনেক সময় প্রকৃত বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে। আল্লাহ বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন ন্যায়বিচার বর্জন করতে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করো, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী’ (সুরা মায়েদা-৮)।
সমাজের কল্যাণ, অপরাধ দমন ও ন্যায়বিচারের পাশাপাশি নারীর প্রকৃত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষেও দৃঢ়ভাবে অবস্থান করেছে ইসলাম। ইসলাম নারীকে শিক্ষা, সম্পদ, ভরণপোষণ, সম্মান ও নিরাপত্তার অধিকার দিয়েছে।
মা হিসেবে সর্বোচ্চ মর্যাদা এবং স্ত্রী হিসেবে সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করেছে। অথচ আধুনিকতার নামে অনেক সময় নারীকে ভোগবাদী সংস্কৃতির উপকরণে পরিণত করা হচ্ছে, যা প্রকৃত সম্মান নয়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’
তিনি আরো বলেছেন, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।’
একইভাবে সুদ, ঘুষ ও অর্থনৈতিক লুটপাটের বিরুদ্ধেও ইসলাম দাঁড়িয়েছে শক্তভাবে। সমাজ ধ্বংসের অন্যতম কারণ এটাই। এসব অন্যায় মানুষের মধ্যে বৈষম্য, শোষণ ও অবিচার বৃদ্ধি করে। বাজার সিন্ডিকেট, পণ্য মজুত এবং কৃত্রিম সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে এবং মানবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন’ (সুরা বাকারা-২৭৫)।
মহানবী (সা.) ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়ের ওপর লানত করেছেন।
ন্যায় ও মানব কল্যাণের প্রশ্নে জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও শ্রেণিভেদে বৈষম্য করার সুযোগ নেই। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান- সব মানুষই ন্যায়বিচার ও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখে। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে বিভাজন, দমনপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান’ (সুরা হুজুরাত-১৩)
তেমনি ইসলাম অশ্লীলতা, নৈতিক অবক্ষয় ও অবাধ সম্পর্কের বিপক্ষে; পরিবার, সামাজিক শৃঙ্খলা ও নৈতিক মূল্যবোধের পক্ষে। কারণ সুস্থ পরিবারই একটি সুস্থ সমাজ ও সভ্যতার ভিত্তি। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক







