সম্পদ মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। জীবনযাত্রার প্রয়োজন পূরণ, পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ, সমাজসেবা এবং আল্লাহর পথে ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু ইসলাম সম্পদকে কখনোই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানাতে শেখায়নি; বরং এটিকে একটি পরীক্ষা ও আমানত হিসেবে দেখেছে। যে সম্পদ আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহৃত হয়, তা মানুষের জন্য দুনিয়ায় প্রশান্তি এবং আখিরাতে মুক্তির কারণ হয়। পক্ষান্তরে, অবৈধ উপার্জন, কৃপণতা, অপচয় ও অহংকারে ব্যবহৃত সম্পদ মানুষের অশান্তি ও ধ্বংস ডেকে আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার করো।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৮৮)
অতএব, সম্পদ তখনই প্রকৃত সুখের মাধ্যম হয়ে ওঠে, যখন তা ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী অর্জন ও ব্যয় করা হয়। তাই একজন মুমিনের করণীয় হলো-
১. হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জন করা
সম্পদের বরকত ও মানসিক প্রশান্তির প্রথম শর্ত হলো হালাল উপার্জন। হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ বাহ্যিকভাবে বেশি হলেও তা মানুষের হৃদয় থেকে শান্তি কেড়ে নেয় এবং দোয়া কবুলের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের মধ্যে অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করো না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র (হালাল) বস্তুই গ্রহণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)
হালাল উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদে আল্লাহ তাআলা বরকত দান করেন, যা মানুষের জীবনে প্রকৃত সুখ ও প্রশান্তি এনে দেয়।
২. জাকাত ও সদকার মাধ্যমে সম্পদকে পবিত্র করা
ইসলামে সম্পদের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু সঞ্চয়ে নয়; বরং আল্লাহর পথে ব্যয়ে। যাকাত সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে। আর সদকা মানুষের বিপদ দূর করে ও আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন; এর মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করলে সম্পদ কখনো কমে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
যে ব্যক্তি নিয়মিত জাকাত ও সদকা আদায় করে, তার সম্পদে বরকত আসে এবং অন্তরে তৃপ্তি জন্মায়।
৩. আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের হক আদায় করা
ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির শিক্ষা দেয় না; বরং আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন ও অভাবগ্রস্তদের অধিকার আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আত্মীয়কে তার প্রাপ্য দাও, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৬)
যে ব্যক্তি নিজের সম্পদের মাধ্যমে মানুষের উপকার করে, আল্লাহ তার জীবনে রহমত ও প্রশান্তি দান করেন।
৪. অপচয় ও অহংকার থেকে বিরত থাকা
অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস, অপচয় এবং সম্পদের অহংকার মানুষের সুখকে ধ্বংস করে দেয়। ইসলাম মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৭)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আল্লাহ অহংকারী ও আত্মগর্বীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)
অপচয় ও অহংকার পরিত্যাগ করে সংযমী জীবনযাপন করলে সম্পদ সত্যিকার অর্থে সুখের কারণ হয়।
৫. সম্পদের ওপর নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করা
সম্পদ মানুষের নিরাপত্তার একটি উপায় হতে পারে; কিন্তু প্রকৃত নিরাপত্তা ও সফলতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই মুমিনের হৃদয় সম্পদের সঙ্গে নয়, আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন। তারা সকালে ক্ষুধার্ত বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেটভরে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)
তাওয়াক্কুল মানুষের অন্তরে অদম্য সাহস, প্রশান্তি ও সন্তুষ্টি সৃষ্টি করে।
৬. দুনিয়ার পাশাপাশি আখিরাতকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো
ইসলাম দুনিয়াকে পরিত্যাগ করতে বলে না; বরং দুনিয়াকে আখিরাতের সফলতার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে নির্দেশ দেয়। যে ব্যক্তি সম্পদকে আখিরাতের পাথেয় বানায়, তার জীবনই প্রকৃত অর্থে সফল হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অন্বেষণ কর এবং দুনিয়ার অংশও ভুলে যেয়ো না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)
তাই যখন মানুষের জীবনের লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সফলতা হয়, তখন সম্পদ তার জন্য কল্যাণের সোপান হয়ে ওঠে। কেননা সম্পদ নিজে সুখ কিংবা দুঃখের কারণ নয়; বরং মানুষ কীভাবে তা উপার্জন করে, ব্যয় করে এবং তার প্রতি কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে—সেটিই নির্ধারণ করে সম্পদ তার জন্য রহমত হবে, নাকি বিপদের কারণ হবে। তাই একজন মুমিনের উচিত সম্পদের দাস না হয়ে সম্পদকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি উপায়ে পরিণত করা। তাহলেই দুনিয়ায় শান্তি এবং আখিরাতে চিরস্থায়ী সফলতা লাভ করা সম্ভব হবে। ইনশাআল্লাহ।




