• ই-পেপার

সুইডেনে কোরআনের এক লাখ কপি বিতরণ করবে কুয়েত

সম্পদকে সুখের মাধ্যম বানানোর উপায়

মুফতি ওমর বিন নাছির
সম্পদকে সুখের মাধ্যম বানানোর উপায়
সংগৃহীত ছবি

সম্পদ মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। জীবনযাত্রার প্রয়োজন পূরণ, পরিবার-পরিজনের ভরণপোষণ, সমাজসেবা এবং আল্লাহর পথে ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই সম্পদের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু ইসলাম সম্পদকে কখনোই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানাতে শেখায়নি; বরং এটিকে একটি পরীক্ষা ও আমানত হিসেবে দেখেছে। যে সম্পদ আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহৃত হয়, তা মানুষের জন্য দুনিয়ায় প্রশান্তি এবং আখিরাতে মুক্তির কারণ হয়। পক্ষান্তরে, অবৈধ উপার্জন, কৃপণতা, অপচয় ও অহংকারে ব্যবহৃত সম্পদ মানুষের অশান্তি ও ধ্বংস ডেকে আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু আহার করো।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৮৮)

অতএব, সম্পদ তখনই প্রকৃত সুখের মাধ্যম হয়ে ওঠে, যখন তা ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী অর্জন ও ব্যয় করা হয়। তাই একজন মুমিনের করণীয় হলো-

১. হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জন করা
সম্পদের বরকত ও মানসিক প্রশান্তির প্রথম শর্ত হলো হালাল উপার্জন। হারাম উপায়ে অর্জিত অর্থ বাহ্যিকভাবে বেশি হলেও তা মানুষের হৃদয় থেকে শান্তি কেড়ে নেয় এবং দোয়া কবুলের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের মধ্যে অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করো না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি কেবল পবিত্র (হালাল) বস্তুই গ্রহণ করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)
হালাল উপার্জনের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদে আল্লাহ তাআলা বরকত দান করেন, যা মানুষের জীবনে প্রকৃত সুখ ও প্রশান্তি এনে দেয়।

২. জাকাত ও সদকার মাধ্যমে সম্পদকে পবিত্র করা
ইসলামে সম্পদের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু সঞ্চয়ে নয়; বরং আল্লাহর পথে ব্যয়ে। যাকাত সম্পদকে পবিত্র করে এবং সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে। আর সদকা মানুষের বিপদ দূর করে ও আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন; এর মাধ্যমে আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করলে সম্পদ কখনো কমে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)
যে ব্যক্তি নিয়মিত জাকাত ও সদকা আদায় করে, তার সম্পদে বরকত আসে এবং অন্তরে তৃপ্তি জন্মায়।

৩. আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষের হক আদায় করা
ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির শিক্ষা দেয় না; বরং আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন ও অভাবগ্রস্তদের অধিকার আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আত্মীয়কে তার প্রাপ্য দাও, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৬)

যে ব্যক্তি নিজের সম্পদের মাধ্যমে মানুষের উপকার করে, আল্লাহ তার জীবনে রহমত ও প্রশান্তি দান করেন।

৪. অপচয় ও অহংকার থেকে বিরত থাকা
অতিরিক্ত ভোগ-বিলাস, অপচয় এবং সম্পদের অহংকার মানুষের সুখকে ধ্বংস করে দেয়। ইসলাম মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ২৭)

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘আল্লাহ অহংকারী ও আত্মগর্বীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)
অপচয় ও অহংকার পরিত্যাগ করে সংযমী জীবনযাপন করলে সম্পদ সত্যিকার অর্থে সুখের কারণ হয়।

৫. সম্পদের ওপর নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা করা
সম্পদ মানুষের নিরাপত্তার একটি উপায় হতে পারে; কিন্তু প্রকৃত নিরাপত্তা ও সফলতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। তাই মুমিনের হৃদয় সম্পদের সঙ্গে নয়, আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথভাবে ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের এমনভাবে রিজিক দিতেন, যেমন তিনি পাখিদের রিজিক দেন। তারা সকালে ক্ষুধার্ত বের হয় এবং সন্ধ্যায় পেটভরে ফিরে আসে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৩৪৪)
তাওয়াক্কুল মানুষের অন্তরে অদম্য সাহস, প্রশান্তি ও সন্তুষ্টি সৃষ্টি করে।

৬. দুনিয়ার পাশাপাশি আখিরাতকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো
ইসলাম দুনিয়াকে পরিত্যাগ করতে বলে না; বরং দুনিয়াকে আখিরাতের সফলতার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে নির্দেশ দেয়। যে ব্যক্তি সম্পদকে আখিরাতের পাথেয় বানায়, তার জীবনই প্রকৃত অর্থে সফল হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ তোমাকে যা দিয়েছেন, তা দ্বারা আখিরাতের আবাস অন্বেষণ কর এবং দুনিয়ার অংশও ভুলে যেয়ো না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)

তাই যখন মানুষের জীবনের লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের সফলতা হয়, তখন সম্পদ তার জন্য কল্যাণের সোপান হয়ে ওঠে। কেননা সম্পদ নিজে সুখ কিংবা দুঃখের কারণ নয়; বরং মানুষ কীভাবে তা উপার্জন করে, ব্যয় করে এবং তার প্রতি কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে—সেটিই নির্ধারণ করে সম্পদ তার জন্য রহমত হবে, নাকি বিপদের কারণ হবে। তাই একজন মুমিনের উচিত সম্পদের দাস না হয়ে সম্পদকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি উপায়ে পরিণত করা। তাহলেই দুনিয়ায় শান্তি এবং আখিরাতে চিরস্থায়ী সফলতা লাভ করা সম্ভব হবে। ইনশাআল্লাহ। 

জুমার দিন যে পাঁচ কাজ বর্জনীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিন যে পাঁচ কাজ বর্জনীয়
সংগৃহীত ছবি

মহান আল্লাহ দিন ও রাত সৃষ্টি করেছেন। সব দিনের মধ্যে জুমার দিন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। কোরআন ও হাদিসে এই দিনের বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। তা হলো—এক. আল্লাহ তাআলা এই দিন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন, দুই. আল্লাহ তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে জমিনে অবতরণ করিয়েছেন, তিন. এই দিনে আদম (আ.)-কে মৃত্যু দিয়েছেন, চার. এই দিনে এমন সময় আছে যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছুই প্রার্থনা করবে তিনি তা দেবেন। যতক্ষণ না সে হারাম কিছু প্রার্থনা করবে না, পাঁচ. এই দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৯৫)

জুমার দিনটি যেমন মর্যাদা ও ফজিলতে পরিপূর্ণ, তেমনি এই দিনে কিছু নিষিদ্ধ কাজও রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু কাজ আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, যেগুলো ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ। জুমার দিনের নিষিদ্ধ কাজ হলো—

১. আজান হওয়ার পর ব্যবসা-বাণিজ্যে লিপ্ত থাকা : জুমার আজান হওয়ার পর কেনাবেচা করা এবং দুনিয়াবি সব কাজ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! যখন জুমার দিনে সালাতের জন্য আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ব্যবসা ছেড়ে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বুঝো।’ (সুরা : জুমুআ, আয়াত : ৯)

এখানে বেচাকেনা ও ব্যবসা বলতে বোঝানো হয়েছে যাবতীয় ব্যস্ততাকে, তা যেকোনো প্রকারেরই হোক না কেন। জুমার আজানের পর তা ত্যাগ করতে হবে। খুতবা চলাকালীন ঘাড় মাড়িয়ে যাওয়া : খুতবা চলা অবস্থায় মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনের কাতারে যাওয়া নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন এমন সময় দেখলেন জনৈক ব্যক্তি মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনের দিকে যাচ্ছে। তিনি তাকে বললেন, ‘তুমি বসো, তুমি লোকদের কষ্ট দিচ্ছ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১১১৮)

২. খুতবার সময় দুই হাঁটু উঁচু করে বসা : অনেকে দুই হাঁটু খাড়া করে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে বা কাপড় পেঁচিয়ে বসেন। একে আরবিতে ইহতেবা বলা হয়। খুতবা চলাকালীন এভাবে বসা নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিন ইমামের খুতবা চলাকালে কাউকে হাঁটু খাড়া করে কাপড় জড়িয়ে বসতে নিষেধ করেছেন।’(আবু দাউদ, হাদিস : ১১১০)

৩. খুতবার সময় অনর্থক কথা বলা ও কাজ করা : খুতবার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা জরুরি। খুতবার সময় অনর্থক কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেকেই খুতবার সময় মোবাইল টেপা, মেসেজ চেক করা বা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা ইত্যাদি অনর্থক কাজ করেন। এ কাজগুলো জুমার সওয়াব বাতিল করে দিতে পারে। যেমনটি রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিন যখন তোমার সাথিকে চুপ থাকো বলবে, অথচ ইমাম খুতবা দিচ্ছেন, তাহলে তুমি অনর্থক কাজ করলে।’ (বুখারি, হাদিস : ৯৩৪)

৪. খুতবা চলাকালীন ঘুমানো : খুতবার সময় ঘুম চলে এলে অজু ভঙ্গের আশঙ্কা থাকে এবং খুতবার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,  ‘যদি মসজিদে কোনো ব্যক্তি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়, তবে সে যেন স্বীয় স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র সরে বসে। (আবু দাউদ, হাদিস : ১১১৯)

৫. শুধু জুমার দিন রোজা রাখা : শুধু জুমার দিন নির্দিষ্ট করে সিয়াম পালন করা জায়েজ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন শুধু জুমার দিন সিয়াম পালন না করে। তবে তার আগে এক দিন অথবা পরের দিন (মিলিয়ে রাখবে)।’ (বুখারি, হাদিস : ১৯৮৫

জুমার দিনের কল্যাণ লাভে যে ৮ আমল করবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিনের কল্যাণ লাভে যে ৮ আমল করবেন
সংগৃহীত ছবি

ইসলামে জুমার দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে জুমার দিন দ্রুত মসজিদে গমনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ আমলের কথা বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! জুমার দিন নামাজের আজান হলে তোমরা আল্লাহর স্মরণে ধাবিত হও এবং বেচাবিক্রি বন্ধ কর, তা তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা বুঝ। এরপর নামাজ শেষ হলে ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।’ (সুরা : জুমা, আয়াত : ৯-১০)

জুমার দিনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো—

১. জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা : আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার দিনের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—এক. আল্লাহ তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন। দুই. আল্লাহ তাআলা এই দিনে আদম (আ.)-কে জমিনে অবতরণ করিয়েছেন। তিন. এই দিনে আদম (আ.)-কে মৃত্যু দিয়েছেন। চার. এই দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছুই প্রার্থনা করবে তিনি তা দেবেন। যতক্ষণ সে হারাম কিছু প্রার্থনা করবে না। পাঁচ. এই দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮৯৫)

২. জুমার নামাজ আদায় : সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অতঃপর মসজিদে এল, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করবেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)

অন্য হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা, এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান মধ্যবর্তী সময়ের পাপ মোচন করে; যদি সেই ব্যক্তি সব ধরনের কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৩৩)

৩. জুমার দিন গোসল করা : জুমার দিন গোসল করা ও আগে আগে মসজিদে যাওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। আউস বিন আউস সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালো করে গোসল করল, দ্রুততর সময়ে মসজিদে গেল ও (ইমামের) কাছাকাছি বসে মনোযোগসহ (খুতবা) শুনল, তার জন্য প্রতি কদমের বদলে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব থাকবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৫)

৪. মসজিদে প্রথমে প্রবেশ করা : জুমার দিন মসজিদে আগে প্রবেশ করা ও মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনার বিশেষ গুরুত্ব আছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, অতঃপর প্রথমে মসজিদে গেল সে যেন একটি উট কোরবানি করল। যে এরপর মসজিদে গেল, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল। আর যে এরপর ঢুকল, সে যেন ছাগল কোরবানি করল, এরপর যে ঢুকল সে যেন মুরগি কোরবানি করল, আর যে এরপর ঢুকল সে ডিম সদকা করল। অতঃপর ইমাম খুতবার জন্য এলে ফেরেশতারা আলোচনা শোনা শুরু করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৪১)

৫. দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত : জুমার দিন একটি সময় আছে, যখন মানুষ আল্লাহর কাছে কোনো দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘জুমার দিন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছুর দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তা দেন। তোমরা সময়টি আসরের পর অনুসন্ধান কর।’ (আবু দাউদ, হাদিস নম্বর : ১০৪৮)

জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জুমার দিনের ১২ ঘণ্টার মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে যদি কোনো মুসলিম এ সময় আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে, তাহলে মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে দান করেন। এই মুহূর্তটি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কর। (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮)

৬. সুরা কাহাফ পাঠ : জুমার অন্যতম আমল সুরা কাহাফ পাঠ করা। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে তা দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে তার জন্য আলোকিত হয়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি এই সুরার শেষ ১০ আয়াত পাঠ করবে অতঃপর দাজ্জাল বের হলে তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।’ (সহিহ তারগিব, হাদিস : ১৪৭৩, আল মুসতাদরাক : ২/৩৯৯)

৭. গুনাহ মাফ হয় : সালমান ফারসি থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করল, সাধ্যমতো পবিত্র হলো, তেল ব্যবহার করল, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করল, অতঃপর মসজিদে এলো, সেখানে দুজন মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ল, অতঃপর ইমাম কথা শুরু করলে চুপ থাকল; তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮৮৩)

৮. দরুদ পাঠ : জুমার দিন নবীজি (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা কর্তব্য। আউস বিন আবি আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এই দিনে শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং এই দিনে সবাইকে বেহুঁশ করা হবে। অতএব, তোমরা এই দিনে আমার ওপর বেশি পরিমাণ দরুদ পড়। কারণ জুমার দিনে তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ সাহাবারা বললেন, আমাদের দরুদ আপনার কাছে কিভাবে পেশ করা হবে, অথচ আপনার দেহ এক সময় নিঃশেষ হয়ে যাবে? তিনি বলেন, ‘আল্লাহ জমিনের জন্য আমার দেহের ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৭)

রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

মুফতি আতাউর রহমান
রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হলে দেশ ও জাতি উভয়ের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ে। কোনো রাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনা, নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য, কূটনৈতিক কৌশল বা জননিরাপত্তার জন্য সংরক্ষিত তথ্য প্রকাশ পেলে তা রাষ্ট্র ও জনগণের ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই ইসলামী শরিয়ত রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষার জোর তাগিদ দিয়েছে।
 
গোপনীয়তা আমানত
ইসলামী শরিয়ত ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা পর্যন্ত সব গোপনীয় বিষয়কে আমানত বলে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বৈঠকগুলো আমানতস্বরূপ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৬৯)

আর আমানত রক্ষা করা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়া মুমিনের দায়িত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

তাফসিরবিদদের মতে, এখানে ‘আমানত’ শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। এর মধ্যে মানুষের সম্পদ যেমন অন্তর্ভুক্ত, তেমনি দায়িত্ব, পদমর্যাদা ও গোপন তথ্যও অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রের গোপন তথ্য ফাঁস করেন, তবে তিনি এই আমানতের খিয়ানত করেন।
 
রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা প্রকাশযোগ্য নয়
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনো মুমিনের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রের গোপনীয়তা প্রকাশ করা বৈধ নয়। এমনকি কোনো সাধারণ মানুষও যদি কোনো গোপন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারে, তবে তারা তা যথাযথ কর্তৃপক্ষ ছাড়া কারো কাছে প্রকাশ করার অধিকার রাখে না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন শান্তি অথবা শঙ্কার কোনো সংবাদ তাদের কাছে আসে, তখন তারা তা প্রচার করে থাকে। যদি তারা তা রাসুল কিংবা তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী তাদের গোচরে আনত, তবে তাদের মধ্যে যারা তথ্য অনুসন্ধান করে তারা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৩)

উল্লিখিত আয়াতের আলোকে ফকিহরা বলেন, যুদ্ধ, নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রসংক্রান্ত তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা শরিয়তসম্মত নয়।

রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ফাঁসে নবীজির বিচার
মক্কা বিজয়ের আগে সাহাবি হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.) এক নারীর মাধ্যমে কুরাইশদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন, যাতে মুসলিম বাহিনীর অভিযানের ইঙ্গিত ছিল। আল্লাহ তাআলা ওহির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বিষয়টি জানিয়ে দেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ধরতে আলী (রা.), মিকদাদ (রা.) ও জুবায়ের (রা.)-কে প্রেরণ করেন। তারা চিঠির বাহক নারীকে আটক করেন। তদন্তে যখন হাতিব ইবনে আবি বালতাআ (রা.)-এর নাম প্রকাশ পায় তখন ওমর (রা.) তাঁর প্রাণদণ্ড দেওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু নবীজি (সা.) হাতিব (রা.)-এর কাছে কারণ জানতে চান। তিনি উত্তরে বলেন, আমি এর মাধ্যমে মক্কায় থেকে যাওয়া আর পরিবারকে রক্ষা করতে চেয়েছি। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ক্ষমা করে দেন এবং বলেন, তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আাাল্লাহ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘তোমরা যা ইচ্ছা করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩০০৭)

হাদিসের শিক্ষা
উল্লিখিত ঘটনার আলোকে প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন,

১. রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা করা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব। কেননা তা রক্ষার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন।

২. রাষ্ট্রীয় বা সামরিক গোপনীয়তা ফাঁস করা গুরুতর অপরাধ। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি নাকচ করেননি, অযৌক্তিক বলেননি, বরং তিনি বদরি সাহাবি হিসেবে ক্ষমা লাভ করেছেন।

৩. শাস্তি নির্ধারণে অপরাধীর উদ্দেশ্য, পরিস্থিতি এবং রাষ্ট্রের ক্ষতির মাত্রাও বিবেচনা করা আবশ্যক।

গোপনীয়তা ফাঁস করা হারাম
গোপনীয় বিষয় চাই তা অন্যের ব্যক্তিগত হোক বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হোক তা প্রকাশ করা হারাম। ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, ‘গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেওয়া খিয়ানত। যখন তাতে অন্যের ক্ষতি থাকবে তা করা হারাম আর তাতে ক্ষতি না থাকলে তা নিন্দনীয় বিষয়।’ (ইহইয়াউ উলুমিদ্দিন : ৯/২৩৬)

শরিয়তে গোপনীয়তা ফাঁসের শাস্তি
ইসলামী শরিয়তে রাষ্ট্রীয় গোপনীয় ফাঁসকারীর জন্য কোনো হদ (বিধিবদ্ধ শাস্তি) ঘোষণা করেনি। তবে কাজটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে ঘোষণা করেছে এবং তাজিরের অন্তর্ভুক্ত করেছে। তাজির হলো এমন অপরাধ, যার শাস্তি শরিয়ত রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করেছে। রাষ্ট্র অপরাধের ধরন, উদ্দেশ্য ও ক্ষতির পরিমাণ বিবেচনা করে তার শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণ করবে। যার মধ্যে থাকতে পারে সতর্কীকরণ, ভর্ত্সনা, পদচ্যুতি, জরিমানা, কারাদণ্ড, নির্বাসন ইত্যাদি। ‘নাতায়িজুল বুহুস’ গ্রন্থে লেখা হয়েছে, ‘ইসলামী শরিয়ত রাষ্ট্রের গোপনীয়তায় অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে এবং তা ফাঁস করাকে গুরুতর অপরাধের অন্তর্ভুক্ত করেছে। কেননা এর ফলে ইসলামী রাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। ইসলামী শরিয়ত গোপনীয়তা ফাঁসকারীর জন্য উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে।’ (নাতায়িজুল বুহুস ওয়া খাওয়াতিমুল কুতুব : ৪/৩৯৪)

গোপনীয়তা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব
ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা রক্ষা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি ধর্মীয় আমানত। তা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জনগণের জীবন ও সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সংবেদনশীল তথ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের বাইরে প্রকাশ করা ইসলামী নীতির পরিপন্থী। কোরআন আমানত রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে, যাচাই ছাড়া নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য প্রচার করতে নিষেধ করেছে। তাই একজন মুসলিমের উচিত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং এ আমানত ভঙ্গ থেকে বিরত থাকা। পবিত্র কোরআনে যেভাবে বলা হয়েছে, ‘মুমিনরা তোমরা জেনে-বুঝে আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ কোরো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানত সম্পর্কেও বিশ্বাস ভঙ্গ কোরো না।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৭)

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।

সুইডেনে কোরআনের এক লাখ কপি বিতরণ করবে কুয়েত | কালের কণ্ঠ