• ই-পেপার

জলবায়ু সংকট : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

  • সুমিত বণিক

ফুটবল অনেক দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করে

ইকরামউজ্জমান

ফুটবল অনেক দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করে

৩৯ দিন ধরে চলা ফুটবলের গল্প বলা শেষ হয়েছে। ৪৮টি দেশের ১০৪টি খেলায় ৩০৮টি গোলের ঘটনাবহুল অসাধারণ ফুটবল উৎসব সাঙ্গ হয়েছে। ফুটবল শুধু মাঠে চিত্তাকর্ষক হয়নি, মানুষের হৃৎপিণ্ড নিয়ে ইচ্ছামতো খেলেছে গোলকপিণ্ডটি। ফিফা ফুটবলকেন্দ্রিক ব্যবসায় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ফিফার বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জনে বেজায় খুশি ফিফার সব সদস্য দেশ। এরই মধ্যে উয়েফার পক্ষ থেকে অনুদান বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে। দাবি উঠেছে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং অন্য মহাদেশগুলো থেকেও। ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে প্রচুর বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠলেও এই সুইস ব্যক্তিত্ব কিন্তু নির্ভার। তাঁকে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার জন্য প্রায় ২০০ দেশ পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ফিফার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর পুনরায় নির্বাচিত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।

এরই মধ্যে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপে ৬৪ দলের অংশ নেওয়ার বিষয়টি আমরা অবশ্যই বিশ্বকাপ শেষে পর্যালোচনা করব। বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখার সুযোগ সব দলকেই দেওয়া উচিত। স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহাদেশের যেসব দেশ এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে খেলার সুযোগ পায়নি, তারা এখন উত্তেজনায় ভুগছে। এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে খেলেছে ৮৪টি দেশ। চূড়ান্ত রাউন্ডে ৬৪টি দেশের অংশগ্রহণ মানে আরো বেশ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন মহাদেশ থেকে খেলার সুযোগ বাড়বে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থা তো বেল পাকলে কাকের কী। বিশাল মানবসম্পদের কী মারাত্মক অপচয়। আমাদের তো আবার সবাই মিলে লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেখানে পৌঁছার ইচ্ছাশক্তি নেই। আমরা কবে জেগে উঠব। আত্মপ্রচারের পরিবর্তে দেশ ও ক্লাব ফুটবল নিয়ে ভাবব?

৩২ থেকে ৪৮ দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের পর রব উঠেছিল, বিশ্বকাপে চূড়ান্ত রাউন্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঝুলে পড়বে। বাস্তবতায় ২৩তম বিশ্বকাপে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ফুটবল দুনিয়া তো আর সেই ২০ বছর আগের অবস্থায় নেই। দেশে দেশে ফুটবলে যে সংস্কার সাধন হয়েছে, এটি শুধু ইতিবাচক নয়, অনন্যও বটে। ফুটবল নিয়ে এখন গবেষণাগারে নিয়মিত গবেষণা চলে।

ফুটবল অনেক দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করেবিশ্ব-মাতানো উৎসব শেষ। ফুটবলের মালা ছিঁড়ে খসে পড়েছে আনন্দ, বেদনা, দুঃখ, আফসোস, পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অখেলোয়াড়সুলভ মনোভাব, সুবিধা দেওয়া এবং অসুবিধা সৃষ্টি, সর্বোপরি বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রভাব ইত্যাদি। ফুটবলের জাদুর সেই টান টান উত্তেজনা এখন আর নেই। এখন চলছে স্মৃতি রোমন্থনের পালা। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানো। চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আসেমানুষ জাতিকে আবদ্ধ করে ফেলে একটা মোহের মধ্যে। ফুটবলের মধ্যে আছে আশ্চর্য একটি সম্মোহনী শক্তি, যা মানুষকে আচ্ছন্ন করে সহজেই।

দেশ ফুটবলের অসিলায় অনেক কিছুই ভুলে মেতে উঠেছে। কোনো ভূমিকা নেই বিশ্বকাপের কম্পিটিশনের সঙ্গে। শুধু খেলার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বা অন্যের সাফল্যের ভাগীদার হওয়ার পাশাপাশি নিজ ব্যর্থতাকে ভুলে থাকার জন্য এত মাতামাতি! দেশে ২৩তম বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ১২-১৩ জন তরুণের প্রাণ গেছে। প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী দুই শর বেশি মানুষ দল সমর্থনকে কেন্দ্র করে মারামারিতে আহত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বাসাবাড়িতে হামলা করা হয়েছে। অথচ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে অসময়ে ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে যারা দেশে ফিরে গেছে, তাদের দেশে এর প্রতিবাদে হিংসাত্মক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছেআর সেই ক্ষোভে মূল্যবান প্রাণ ঝরেছেএমন খবর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার বদৌলতে চোখে পড়েনি। এটি কি ফুটবলের সমস্যা, না মানসিক অসুস্থতা? অসচেতনতা ও অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশে সাধারণ ফুটবল অনুরাগীদের মনন আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলকে ঘিরে। মেসি আর নেইমার নিয়ে ছিল সব আবেগ আর উচ্ছ্বাস। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল অসময়ে বিদায় নেওয়ায় ভক্ত ও সমর্থকদের মন ভেঙেছে। তবে এটি তো ঠিক, ব্রাজিল কেন এগিয়ে আসতে পারল নাএটি যারা ফুটবল বোঝে, তারা বুঝতে পেরেছে। ফুটবল তো মাঠে খেলেই জিততে হবে। ভাগ্যিস, আর্জেন্টিনা ফাইনাল পর্যন্ত গেছে। এতে দেশে ফুটবলের উন্মাদনা ও আনন্দ রংহীন হয়নি। ফাইনালে আর্জেন্টিনা স্পেনের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। এমনটি কেন হয়েছিল? আর্জেন্টিনার খেলা দেখে মনে হয়নি যে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলছে জেতার জন্য। ভাবা যায়, আর্জেন্টিনা ৯০ মিনিটে একটি শটও করতে পারেনি স্পেনের গোলপোস্টে। বিশ্বকাপে এটি কোন ধরনের ফাইনাল ম্যাচ? বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনাল খেলা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম হয়েছে। এখন কত কিছুই না শোনা যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, লাতিনের ঘর থেকে ট্রফি ইউরোপে আবার চলে গেছে। অপেক্ষা করতে হবে ২০৩০ সালে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপনের বছরের জন্য।

শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ফাইনালে কোনো দল প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে স্পষ্ট প্রাধান্য বিস্তার করে এর আগে আর কখনো শিরোপা জেতেনি, সদ্যঃসমাপ্ত ২৩তম বিশ্বকাপের ফাইনালে যেভাবে জিতেছে স্পেন। পরাজিত দল বিজয়ী দলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। বিশ্বকাপে এটি কোন ধরনের ফাইনাল খেলা! স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন পুরো খেলায় ছিলেন ফুরফুরে অবস্থায়। তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়নি। পুরো টুর্নামেন্টে আট খেলায় সিমনকে ফাঁকি দিয়ে মাত্র একটি বল জালে ঢুকেছে। সিমন এবার পুরস্কার পেয়েছেন গোল্ডেন গ্লাভ

এবারের সেমিফাইনালে যে চারটি দেশ উঠে এসেছে, এই চারটি ফিফার র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে। এই চারটির মধ্যে তিনটি ইউরোপ এবং একটি লাতিন আমেরিকান। বিশ্বকাপের সঙ্গে তো কোনো কিছুর তুলনা চলে না। দুনিয়াজুড়ে আর্জেন্টিনার ভক্ত ও সমর্থক স্পেনের তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি, এটিই বাস্তবতা। সবাই আশা করেছিল, ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি শক্ত লড়াই উপভোগ করবে। হ্যাঁ, ফুটবলের দর্শনে উভয় দলের মধ্যে মাঠের লড়াইয়ে অবশ্যই পার্থক্য আছে। এর পরও তো বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে দুটি সেরা দেশের ফুটবল রোমাঞ্চ ছড়ানোর লড়াই। এই দুই দেশের ফুটবলের গল্প ভিন্ন ধরনের হলেও সব সময় ভক্ত ও সমর্থকদের আকৃষ্ট করেছে। মাঠে আর্জেন্টিনা দলের দুর্বলতা, নিষ্ক্রিয়তা এবং পুরোপুরি বিবর্ণ চেহারা দেখে ভক্ত ও সমর্থকরা ভীষণভাবে হতাশ হয়েছে। ফুটবলে অনুভূতির বিষয়টি সব সময় গুরুত্ব পায়। শুধু মাঠের খেলাই সব নয়, আবেগের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আর্জেন্টিনা চেয়েছিল ট্রফি রিটেইন করতে। খেলোয়াড়রা মেসির বিদায়লগ্নে তাঁর হাতে আরেকবার বিশ্বকাপ তুলে দিতে চেয়েছিলেন। মাঠে কিন্তু সেই দৃঢ়তা, চেতনা, আত্মবিশ্বাস কিছুই ছিল না। মাঠে পরাজিত দলটি পাত্তাই পায়নি। প্রতিপক্ষ মেসিকে আটকে ফেলায় তিনি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছিলেন।

ফুটবলের ট্যাকটিশিয়ানরা এখন অনেক বেশি মাথা ঘামান মাঠে এবং মাঠের বাইরের খেলায়। ফুটবল তো অনেক আগেই সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। পায়ের খেলায় মাথার গুরুত্ব ভীষণভাবে বেড়ে গেছে। সহজ-সরল ফুটবলকে দুর্ভেদ্য করে তুলেছেন চিন্তাশীল মানুষরা। আসলে একজনের পক্ষে তো বিশ্বকাপ জয় করা সম্ভব নয়। দলীয় শক্তি ছাড়া উপায় নেই। ফুটবলীয় দর্শনে একতা এবং সবাই মিলে লড়াই সবচেয়ে বেশি কার্যকর, মাঠে এটি দেখিয়ে দিয়েছে স্পেন। তারা সবাই মিলে ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। গ্রুপ ম্যাচে দুর্বল কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র করেছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রথম খেলায় সৌদি আরবের বিপক্ষে হেরেছে। এরপর নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে আর্জেন্টিনা এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফিতে চুমু এঁকে দিতে সক্ষম হয়েছে ৩৬ বছর অপেক্ষার পর। স্পেন কিভাবে এবার ফাইনালে এসেছে আর আর্জেন্টিনা কিভাবে এসেছে, এই বিষয়টি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলে উত্তর মিলবে।

ফুটবল ইতিহাসে লেখা থাকবে ২৩তম বিশ্বকাপ ফুটবলে স্পেন ফাইনালে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে ট্রফি জিতেছে। একমাত্র গোলটি করেছেন স্পেনের ফেরান তোরেস। তবে বিশ্বের যে কয়েক শ কোটি মানুষ সময়ের ব্যবধানে এই খেলা দেখেছে, তারা অস্বীকার করতে পারবে না যে খেলার ধারায় আর্জেন্টিনা যদি আরো অনেক বেশি গোলে পরাজিত হতো, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। আর্জেন্টিনা পারেনি কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার সম্মান দিতে।

দেশে আমরা সাধারণ মানুষ সবাই মিলেমিশে অনেক আবেগ, ভালোবাসা নিয়ে প্রতিদিন খেলা দেখেছি। সদ্যঃসমাপ্ত বিশ্বকাপ চলাকালীন দিনগুলোতে মিডিয়ায় দেখেছি ফুটবল পণ্ডিত আর বিশেষজ্ঞদের ছড়াছড়ি। দেশে এত ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে খেলাটি করুণভাবে ধুঁকছে। বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে যে উন্মাদনা লক্ষ করেছি, ফুটবলের জন্য যে ভালোবাসা দেখেছিএই আগ্রহ যদি দেশের ফুটবল উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব হতো, তাহলে দেশের ফুটবল উপকৃত হতো। সময় যত গড়াচ্ছে, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডের নতুন নতুন দেশের খেলার সম্ভাবনা বাড়ছে। অতএব, ঘুম থেকে জেগে উঠতে হবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে হাওয়া বুঝে দেশের ফুটবল পণ্ডিতদের কেউ কেউ তাঁদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। জানি না, এ ক্ষেত্রে মিডিয়ার কোনো হিসাব ছিল কি না। ফুটবলের চেহারা ও চরিত্র বোঝা মুশকিল। খেলাটি মজা ও রহস্য করতে ভালোবাসে। ফুটবলকে বিধাতা ছাড়া কেউ চিনতে পারেনি। এই খেলা কাউকে অনেক দিয়েও আবার শেষ সময়ে কেড়ে নিতে দ্বিধা করে না। পর্তুগালের ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেও শূন্য হাতে বিদায় নিলেন। কেপ ভার্দের অপরিচিত গোলরক্ষক ভোজিনিয়া এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসে হিরো হয়ে গেছেন। নিজেই বলেছেন, আমি রাস্তায় রান্না করতাম আর আমার দরজার বাইরে বসে খেতাম। আর এখন আমি যখন ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাই মানুষ পাগল হয়ে যায়। এটিই বিশ্বকাপের জাদু।

১৯৯৮ সালের পর এবার বিশ্বকাপে খেলেছে নরওয়ে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর আর্লিং হালান্ড বলেছেন, পৃথিবীর মানচিত্রে নরওয়েকে যেভাবে আমরা চেনাতে পেরেছি, সেটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যাচ্ছে।

জয় হোক বিশ্বকাপের আবেদনের। জিতুক ফুটবল।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত ‘ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো’

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত ‘ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো’

বর্তমান বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট এবং বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিশ্বকে বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছে। এত দিন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান মাধ্যম ছিল ভবনের ছাদে স্থাপিত প্রচলিত সোলার প্যানেল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কম্পানি স্বচ্ছ সোলার গ্লাস বা ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো প্রযুক্তি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই প্রযুক্তিতে ভবন, অফিস, শপিং মল, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর, এমনকি ব্যক্তিগত বাড়ির কাচের জানালাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস পরিণত হতে পারে। বিশেষ ধরনের স্বচ্ছ ফটোভোল্টাইক  আবরণ কাচের ওপর প্রয়োগ করা হয়, যা সূর্যের অতিবেগুনি (ইউভি) ও অবলোহিত (ইনফ্রারেড) রশ্মি শোষণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে এবং বরাবরের মতো দৃশ্যমান সূর্যের আলোকে ওই কাচের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে দেয়। ফলে ঘরের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশে কোনো উল্লেখযোগ্য বাধা সৃষ্টি হয় না। প্রচলিত সোলার প্যানেলের তুলনায় এই প্রযুক্তি স্থাপনে আলাদা জায়গার প্রয়োজন হয় না, নান্দনিকতাও বজায় থাকে। ফলে ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটি নির্মাণে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উল্লেখ্য, সূর্যালোক মূলত তিনটি ভাগে বিভক্তদৃশ্যমান আলো, অতিবেগুনি রশ্মি এবং অবলোহিত রশ্মি। আমাদের চোখ শুধু দৃশ্যমান আলো দেখতে পায়। কিন্তু সোলার উইন্ডো অতিবেগুনি ও অবলোহিত রশ্মিকে শোষণ করতে পারে। ফলে কাচটি দেখতে পুরোপুরি স্বচ্ছ হয়। প্রচলিত সোলার প্যানেলের মতো এটি ভবনের সৌন্দর্য নষ্ট করে না, বরং সৌন্দর্য বাড়ায়।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত ‘ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো’স্বচ্ছ সোলার গ্লাসের কার্যপদ্ধতি প্রচলিত সৌর প্যানেলের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন হলেও মূলনীতি একই। সাধারণ সোলার প্যানেলে দৃশ্যমান সূর্যালোক সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডোতে এমন বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা মানুষের চোখে দৃশ্যমান আলোর বেশির ভাগ অংশ কাচের মধ্য দিয়ে যেতে দেয় এবং একই সঙ্গে অতিবেগুনি ও অবলোহিত রশ্মি সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জানালার চারপাশে স্থাপিত সূক্ষ্ম পরিবাহী স্তরের মাধ্যমে ভবনের বিদ্যুত্ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা বা জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডেও সরবরাহ করা সম্ভব। ভবনের বাইরের দেয়াল বা কাচের সম্মুখভাগ যদি পুরোপুরি এই প্রযুক্তিতে তৈরি হয়, তাহলে একটি বহুতল ভবন প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। একই সঙ্গে এই কাচ সূর্যের অতিরিক্ত তাপ প্রবেশ কমিয়ে ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। ফলে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারের প্রয়োজন কমবে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। বর্তমানে গবেষকরা এই প্রযুক্তির দক্ষতা বা রূপান্তর হার আরো বাড়ানোর জন্য নতুন উপাদান, বিশেষ করে পেরোভস্কাইট এবং উন্নত স্বচ্ছ ফটোভোল্টাইক উপকরণ নিয়ে গবেষণা করছেন। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব, অর্থনৈতিক এবং ব্যবহারবান্ধব। প্রচলিত সোলার প্যানেল বসানোর জন্য আলাদা ছাদ বা খোলা জায়গা দরকার হয়, কিন্তু স্বচ্ছ সোলার গ্লাসে সেই সমস্যা নেই। উপরন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো ধোঁয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড বা শব্দদূষণ সৃষ্টি হয় না। ফলে পরিবেশ রক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং শহরাঞ্চলে বহুতল কাচের ভবনের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো প্রযুক্তিতে শহরের আধুনিক ভবন, শিল্প-কারখানা, শপিং মল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি ভবন নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের একটি বড় অংশ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারবে। একই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গাড়ি, বাস, ট্রেন, জাহাজ এবং বিমানেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এতে যানবাহনের জানালা থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে ব্যাটারি চার্জ করা, আলো, এয়ারকন্ডিশনিং, সেন্সর ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র পরিচালনা করা যাবে। একইভাবে ট্রেন বা মেট্রো রেলের জানালায়, এমনকি বর্তমানে সারা বাংলাদেশে সয়লাব ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের ওপর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ আলো, তথ্য প্রদর্শন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পরিচালনার জন্য সহায়ক বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে। কৃষি খাতেও গ্রিনহাউসের কাচে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই সঙ্গে ফসল উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। ফলে জমির দ্বৈত ব্যবহারও নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই প্রযুক্তি বিশেষ সম্ভাবনাময়। কারণ প্রাকৃতিকভাবেই বাংলাদেশে বছরে দীর্ঘ সময় সূর্যালোক পাওয়া যায়, যা এই প্রযুক্তির জন্য একটি বড় সুবিধা। বাস্তবায়ন  করতে পারলে এটি শুধু একটি জানালা নয়, বরং একটি ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমবে।

প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন এবং এখনো গবেষণা ও উন্নয়নের পথে রয়েছে। তবু জ্বালানিব্যবস্থায় এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বাংলাদেশ যদি সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ করে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের অসংখ্য ভবন ও যানবাহন নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। এর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে বাংলাদেশ আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারবে। তবে এসব সাফল্য পেতে হলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। যেমনবর্তমানে প্রযুক্তিটির উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং দক্ষতা প্রচলিত উচ্চ ক্ষমতার সোলার প্যানেলের তুলনায় এখনো কম। এ ছাড়া দেশে এই প্রযুক্তি উৎপাদনের শিল্প, দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষণাগার এবং মানসম্মত স্থাপনা ব্যবস্থাও এখনো গড়ে ওঠেনি। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যৌথভাবে গবেষণা ও বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে দেশেই স্বচ্ছ সোলার গ্লাস উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। নতুন নির্মিত সরকারি ও বেসরকারি ভবনে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে করছাড়, সহজ ঋণ ও প্রণোদনা দিলে এর প্রসার আরো দ্রুত ঘটবে। পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীদের জন্য এ বিষয়ে গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।

অবশ্য প্রচলিত সোলার প্যানেলের তুলনায় ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডোর খরচ প্রায় দুই থেকে চার গুণ বেশি। এতে অর্গানিক সেমিকন্ডাক্টর বা পেরোভস্কাইট প্রযুক্তির মতো উন্নত উপাদান ব্যবহার করায় খরচ বেশি হয়। এ ছাড়া স্বচ্ছ হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাও প্রচলিত প্যানেলের তুলনায় বেশ কম। আবার প্রচলিত প্যানেলের কর্মদক্ষতা যেখানে ১৫ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে, সেখানে ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডোর কর্মদক্ষতা মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশ হয়। তবু ভবনের কাচ বা জানালাগুলোকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করার জন্য প্রযুক্তিটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এর উৎপাদন খরচ ও দাম কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়

দেশব্যাপী বন্যার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং দেশের অভ্যন্তরে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তর, উত্তর-পূর্ব, মধ্য-উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বহু নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও নওগাঁর কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং আরো কয়েকটি নদী অববাহিকার চর ও নিচু জমি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি উদ্বেগজনক অবস্থায় থাকায় হাওর, বিল ও নদীর তীরবর্তী ফসলি জমিতে পানি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধিতে নওগাঁর পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার কিছু জেলায়ও নতুন করে প্লাবন দেখা দিতে পারে। তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলার পরিস্থিতি আপাতত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও উজানে নতুন করে ভারি বৃষ্টি হলে তা দ্রুত বদলে যেতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকার উজানে ভারি বৃষ্টি হলে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো সর্বত্র ভয়াবহ নয়, তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে প্লাবনের বিস্তৃতি বাড়তে পারে এবং কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও মাঠে থাকা ফসলের ওপর চাপ তীব্র হতে পারে।

বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বন্যার হুমকি এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন অনেক এলাকায় আউশ ধানে শীষ বের হওয়া, ফুল আসা বা দানা ভরার পর্যায়ে রয়েছে। এসব পর্যায়ে ধানগাছ কয়েক দিন পানির নিচে থাকলে সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয়, পরাগায়ণ ও দানা গঠন কমে যায় এবং গাছ হেলে পড়তে পারে। প্রবল স্রোত থাকলে ধানগাছ উপড়ে যাওয়া বা কাদা-পলির নিচে চাপা পড়ার আশঙ্কাও থাকে। পানি দ্রুত নেমে গেলেও অপুষ্ট দানা, চিটা বৃদ্ধি এবং ফলন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। যেসব জমির আউশ ধান প্রায় পরিপক্ব, সেখানে সুযোগ থাকলে দ্রুত কাটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে অপরিপক্ব ধান তাড়াহুড়া করে কাটলে ফলন ও চালের গুণমান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জমির অবস্থা, ধানের পরিপক্বতা এবং সম্ভাব্য প্লাবনের সময় বিবেচনা করে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

একই সময়ে রোপা আমন মৌসুমের প্রধান কার্যক্রম চলছে। বেশির ভাগ এলাকায় বীজতলা তৈরি শেষ হয়েছে। কোথাও চারা তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও সদ্য চারা রোপণ করা হয়েছে। বীজতলা দীর্ঘ সময় ডুবে থাকলে চারা পচে যেতে বা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সদ্য রোপণ করা চারা স্রোতে ভেসে যেতে কিংবা কাদা ও পলির নিচে চাপা পড়তে পারে। এতে কৃষককে পুনরায় জমি তৈরি, চারা সংগ্রহ ও রোপণ করতে হবে। পর্যাপ্ত চারা না পাওয়া গেলে রোপণ বিলম্বিত হবে এবং তাতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় আমনের লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক আবাদও ব্যাহত হতে পারে।

এই ঝুঁকি মোকাবেলায় উঁচু ও নিরাপদ স্থানে বিকল্প বীজতলা তৈরি করা প্রয়োজন। বিলম্বিত রোপণের উপযোগী আলোকসংবেদী জাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। কমিউনিটি বা সমবায় ভিত্তিক বীজতলা স্থাপন করলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মধ্যে দ্রুত চারা বিতরণ সম্ভব হবে। অতিরিক্ত চারা সংরক্ষণ, প্রয়োজনে ভাসমান বীজতলা তৈরি এবং দেরিতে রোপণযোগ্য আমন জাতের বীজ প্রস্তুত রাখাও জরুরি।

বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে মূল জমিতে রোপণ বিলম্বিত হলে বোলান বা দ্বিরোপণ পদ্ধতি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে বীজতলার চারা তুলে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে ঘন করে সাময়িকভাবে রোপণ করা হয়। পরে পানি নামার পর মূল জমি প্রস্তুত হলে সেই চারা আবার তুলে চূড়ান্ত জমিতে রোপণ করা হয়। এতে চারা অতিবয়স্ক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বিলম্বিত পরিস্থিতিতেও আমন আবাদ ধরে রাখা সম্ভব হয়। তবে জাত নির্বাচন, চারার বয়স এবং প্রথম ও দ্বিতীয় রোপণের সময় ঠিক রাখার জন্য স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

পানি নেমে যাওয়ার পর জমির প্রকৃতি ও চারার প্রাপ্যতা অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বীজতলা নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে বীজ বোনা এবং সুস্থ চারা থাকলে বিলম্ব না করে রোপণ করা দরকার। যেখানে চারা আংশিক নষ্ট হয়েছে, সেখানে পুরো জমি পুনরায় রোপণ না করে সুস্থ গুচ্ছ থেকে চারা ভাগ করে ফাঁকা স্থানে বসানো যেতে পারে। এতে চারা ও শ্রমদুই-ই সাশ্রয় হবে।

জলি বা গভীর পানির আমন ধান স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা পানির সঙ্গে কিছুটা খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে পানির গভীরতা দ্রুত বেড়ে গেলে কচি গাছ সম্পূর্ণ ডুবে যেতে বা স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার পানি দ্রুত নেমে গেলে লম্বা ও দুর্বল গাছ মাটিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে গভীর পানির ধানের ক্ষেত্রেও পানির গভীরতা, বৃদ্ধির গতি, স্রোত ও স্থায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ বন্যা অভিযোজনের জন্য স্থানীয়ভাবে উপযোগী গভীর পানির ধানের জাত সংরক্ষণ, মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পাট কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় পাট চাষও ঝুঁকিতে রয়েছে। জমিতে অতিরিক্ত পানি থাকলে পাট কাটা, আঁটি বাঁধা এবং মাঠ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রবল স্রোতে কাটা বা না কাটা পাট ভেসে যেতে পারে। জাগ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ স্থান পাওয়া কঠিন হলে আঁশের গুণমান নষ্ট হতে পারে। শুকানো ও পরিবহনে সমস্যা হলে কৃষক ন্যায্য বাজারমূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন। পাট কাটার উপযোগী হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, উঁচু জায়গায় আঁটি সংরক্ষণ এবং সম্ভব হলে নিয়ন্ত্রিত জাগপদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।

তিলসহ অন্যান্য জলাবদ্ধতা সংবেদনশীল ফসল অল্প সময়ের জলাবদ্ধতায়ই গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ে। তিলের গোড়ায় পানি জমলে শিকড়ের শ্বাসক্রিয়া ব্যাহত হয়, গাছ হলুদ হয়ে যায় এবং দ্রুত মারা যেতে পারে। কাউন ও অন্যান্য ক্ষুদ্র দানাশস্যও দীর্ঘ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। মরিচ, বেগুন, ঢেঁড়স, লাউ, কুমড়া এবং বিভিন্ন গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির জমিতে পানি জমলে শিকড় পচা, ছত্রাকজনিত রোগ ও গাছ মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এসব ফসলের ক্ষতি হলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দামও বাড়তে পারে।

তাই নিচু জমির নালা পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনমতো ছোট নিষ্কাশন নালা কাটা এবং মাচা বা উঁচু বেডের ফসল রক্ষায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পানি নেমে গেলে গাছের গোড়া থেকে কাদা সরিয়ে মাটিতে বাতাস চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বেশি সার প্রয়োগ না করে গাছকে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সময় দেওয়া উচিত। পরে গাছের অবস্থা বুঝে পরিমিত সার এবং প্রয়োজনীয় রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে।

কলা ও আখ তুলনামূলকভাবে বড় ফসল হলেও বন্যার স্রোত, দীর্ঘ জলাবদ্ধতা এবং নরম মাটিতে শিকড়ের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে হেলে পড়তে বা উপড়ে যেতে পারে। পানি নেমে যাওয়ার পরও শিকড় পচা ও রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। হেলে পড়া কলাগাছকে খুঁটি দিয়ে বেঁধে রাখা, ভাঙা ও রোগাক্রান্ত অংশ সরিয়ে ফেলা এবং আখের জমি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। চরাঞ্চলের ভুট্টা, চিনাবাদাম, শাক-সবজি ও পশুখাদ্যের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত বীজ ও পুনর্বাসন সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

বন্যার প্রভাব শুধু মাঠের ফসলে সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষকের ঘরে রাখা বীজ, সার, বালাইনাশক, কৃষিযন্ত্র ও সংরক্ষিত খাদ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গ্রামীণ রাস্তা ও বাজার প্লাবিত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন ও বিপণন ব্যাহত হয়। গবাদি পশুর খাদ্যসংকট, হাঁস-মুরগির খামারের ক্ষতি এবং পুকুর বা ঘের থেকে মাছ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই বীজ, সার, খাদ্য ও কৃষিযন্ত্র উঁচু ও শুকনা স্থানে সরিয়ে নেওয়া, পশুর জন্য শুকনা খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় রাখা এবং পুকুর ও ঘেরে জাল বা অস্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা করা জরুরি।

বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনেও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত ও নির্ভুল হিসাব তৈরি করে অঞ্চল ও ফসল ভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো বীজ, চারা, সার, নগদ সহায়তা ও স্বল্পসুদে ঋণ পৌঁছানো না গেলে পরবর্তী মৌসুমও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত আমন জমিতে পরিস্থিতি অনুযায়ী পুনরায় রোপণ, বিলম্বে রোপণযোগ্য ধান কিংবা পানি নেমে গেলে আগাম রবি ফসলের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। বালু জমা জমি, ভাঙা আইল ও ক্ষতিগ্রস্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারেও সরকারি সহায়তা জরুরি।

সব মিলিয়ে বর্তমান বন্যা এখনো সর্বত্র বিপর্যয়কর রূপ নেয়নি, কিন্তু কৃষির জন্য এটি একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে পানির গভীরতা, স্রোতের তীব্রতা, প্লাবনের স্থায়িত্ব এবং ফসলের বৃদ্ধি পর্যায়ের ওপর। তাই শুধু পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগাম প্রস্তুতি, মাঠভিত্তিক পরামর্শ, বিকল্প বীজতলা, বোলানপদ্ধতির প্রয়োগ, দ্রুত পানি নিষ্কাশন, নিরাপদ ফসল সংগ্রহ এবং সময়োপযোগী পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করা দরকার। সঠিক সময়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ফসলের ক্ষতি অনেকাংশে সীমিত রাখা এবং কৃষকের পরবর্তী উৎপাদনচক্র সচল রাখা সম্ভব হবে।

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচার

বৈশ্বিক কার্বন মার্কেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ

ড. মো. ম‌সিউর রহমান

বৈশ্বিক কার্বন মার্কেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন আইন ও চুক্তি গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে ইউএনএফসিসি, কিয়োটো প্রটোকল, প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট উল্লেখযোগ্য। এই চুক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটে কার্বন ট্রেডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উপকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে কার্বন বিজনেসের মাধ্যমে পরিবেশ ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, ঘনবসতি এবং ভৌগোলিক ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কার্বন ট্রেডিং’ বা কার্বন মার্কেট একটি নতুন সম্ভাবনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। বিশেষ করে বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের পরিমিত প্রয়োগের মতো উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের জন্য এই খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছুই মানবসভ্যতার টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে কার্বন ট্রেডিং বা কার্বন বিজনেস একটি নতুন অর্থনৈতিক ধারণা হিসেবে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, এই খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে—বিশেষ করে বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের পরিমিত প্রয়োগের মাধ্যমে।

বনায়ন কার্বন শোষণের একটি কার্যকর প্রাকৃতিক উপায়। গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং তা তাদের দেহে সংরক্ষণ করে। ফলে বনায়ন ও পুনর্বনায়ন কার্যক্রম কার্বন নির্গমন হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকায় বৃহৎ পরিসরে বনায়নের সুযোগ রয়েছে। সামাজিক বনায়ন ও অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে কার্বন ক্রেডিট তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিক লাভ অর্জন করা যেতে পারে। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন এরই মধ্যে সফল হয়েছে। এখন এটিকে কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তা কার্বন ক্রেডিট তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

কৃষিতে কম পানি ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। বিশেষ করে ধান চাষে অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি স্বল্প নির্গমন প্রযুক্তি। এটি মিথেন নির্গমন কমায় এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনে সহায়ক। এডব্লিউডি পদ্ধতি প্রয়োগ করলে পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি মিথেন গ্যাসের নির্গমন হ্রাস পায়। মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে বোরো ধান চাষে এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে তা পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই লাভজনক হবে। কম নির্গমন মানেই কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ, যা ভবিষ্যতে কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস হতে পারে।

নাইট্রোজেন সারের পরিমিত ব্যবহার কার্বন বিজনেসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আইপিসিসি অনুযায়ী নাইট্রোজেন নির্গমন কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস। বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তি; যেমন—লিফ কালার চার্ট (এলসিসি), ইউরিয়া ডিপ প্লেসমেন্ট (ইউডিপি) এবং প্রিসিশন ফার্টিলাইজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সারের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ কমে, অন্যদিকে পরিবেশদূষণ হ্রাস পায় এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এফএও এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার (সিএসএ) কার্বন হ্রাস ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক, যা কার্বন বাজার কৃষকদের অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করতে পারে। অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ও সাসটেইনেবল রাইস প্রোডাকশন পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য কার্বন ক্রেডিট তৈরি করতে সক্ষম। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী কৃষি, বন ও ভূমি ব্যবহার খাত (এএফওএলইউ) বৈশ্বিক কার্বন হ্রাসে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রাখতে পারে।

কার্বন বিজনেস মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশ যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে পারে বা কার্বন শোষণ বাড়াতে পারে, তাহলে তারা ‘কার্বন ক্রেডিট’ অর্জন করে। এই ক্রেডিট আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যায়। একেকটি কার্বন ক্রেডিট এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন হ্রাসকে নির্দেশ করে। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী কার্বন বাজার (ভলান্টারি কার্বন মার্কেট) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে। বাংলাদেশের জন্য এই খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশের বৃহৎ কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠী, জলবায়ু অভিযোজনমূলক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ—সবকিছু মিলিয়ে কার্বন বিজনেস দ্রুত বিকাশ লাভ করতে পারে। এরই মধ্যে ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার ক্লাইমেট এবং প্রসপারিটি প্ল্যানের মতো উদ্যোগ এই খাতে ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে; যেমন—কার্বন

নিরূপণ ও যাচাইকরণ (এমআরভি) ব্যবস্থার দুর্বলতা, কৃষক পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং সুস্পষ্ট নীতিমালার ঘাটতি।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কার্বন বাজার নীতিমালা প্রণয়ন, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা প্রদান এবং পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

সব শেষে বলা যায়, বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের দক্ষ ব্যবস্থাপনা শুধু পরিবেশ সুরক্ষায় নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্বন বিজনেস দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনীতিতে একটি টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগটি কার্বন ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং এটি থেকে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কার্বন ক্রেডিট আয়ের সুযোগ রয়েছে। এই উদ্যোগ সরাসরি যে ভূমিকাগুলো রাখবে—

কার্বন শোষণ ও ক্রেডিট তৈরি : গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। রোপণ করা গাছগুলো বড় হলে তা বিশাল পরিমাণ কার্বন সিংক তৈরি করবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন ক্রেডিট হিসেবে বিক্রি করা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সফলভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বার্ষিক প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের কার্বন ক্রেডিট অর্জন করতে পারবে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এর ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করতে পারবে। তবে এই উদ্যোগ থেকে পুরোপুরি কার্বন ট্রেডিংয়ের সুবিধা পেতে হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বৃক্ষরোপণের স্থানগুলোর নিবন্ধন এবং যথাযথ মেজারমেন্ট, রিপোর্টিং, ভেরিফিকেশন (এমআরভি) সিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো হলো, বাংলাদেশের এমআরভি সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রবেশের প্রক্রিয়াটি জটিল। কৃষকদের সংগঠিত করা অনেক কঠিন। দেশে এজাতীয় নীতিমালার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

আমাদের করণীয় হলো জাতীয় কার্বন ট্রেডিং নীতিমালা প্রণয়ন। এমআরভি সিস্টেমের উন্নয়ন (ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার) এবং দেশের জন্য তা প্রয়োগযোগ্য করা। এ ক্ষেত্রে  আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা গ্রহণ করা। পাইলট প্রকল্প চালু করা এবং কৃষকদের জন্য ইনসেনটিভ ও প্রশিক্ষণ প্রদান। এ জন্য বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য কার্বন বিজনেস একটি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ, যা আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত। কার্বন বিজনেস শুধু একটি পরিবেশগত উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্টের আলোকে কৃষি খাতে কার্বন ক্রেডিট উন্নয়ন করলে তা শুধু পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সঠিক নীতিমালা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কার্বন বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। বনায়ন, পানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং সারের সুষম ব্যবহার—এই তিনটি পদক্ষেপ একযোগে বাস্তবায়ন করা গেলে তা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্বন বিজনেসে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে এবং টেকসই উন্নয়নের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

 

লেখক : মুখ‌্য বৈজ্ঞা‌নিক কর্মকর্তা, উদ‌্যানতত্ত্ব গ‌বেষণা কেন্দ্র, বাংলা‌দেশ কৃ‌ষি গ‌বেষণা ইন‌স্টি‌টিউট