সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পাকিস্তান নিজেকে অনেকটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন। তাঁরা বাইরের সংকট মোকাবেলা করছেন যখন, তখন নিজেদের ঘর পুড়ছে। দেশটির সবচেয়ে বড় প্রদেশ, মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকা নিয়ে বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে। নিজেদের স্বতন্ত্র মুদ্রা, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা এবং প্রশাসনিক কাঠামো সৃষ্টি করেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। মোট ৫ লাখ সশস্ত্র যোদ্ধা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও দাবি করে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করবে বলে জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী নেতারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার নজির টেনে তাঁদের ঘোষিত নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির বৈধতার পক্ষে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
উত্তাল বেলুচিস্তানের এই অস্থিরতায় বাড়তি প্রণোদনা হিসেবে রয়েছে দেশটির উত্তর-পশ্চিমের প্রদেশ খাইবারপাখতুনখোয়া। দুর্গম, পাহাড়ি উপত্যকা, জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং সেই সঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই
অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুরক্ষায় বৈষম্য অঞ্চলটির জনতাকে ক্রমেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসিয়ে তুলেছে। এই অঞ্চলটির সবচেয়ে কৌশলগত ‘খাইবার গিরিপথ’ ভারতীয় উপমহাদেশ এবং মধ্য এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ ও সরু একটি পথ, যা অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দেশটির জন্য অনেক সম্ভাবনাময় হতে পারত, অথচ এটি এখন আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের বর্তমান অবনতিশীল সম্পর্কের কারণে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) জন্য বরাবরের একটি সহজ যাতায়াতের পথ হিসেবে খাইবারপাখতুনখোয়াসহ বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে বাড়তি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রসদ হিসেবে নিজেদের ব্যবহার করতে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ নতুন করে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করেছে। এটি শুধু এ কারণে নয় যে বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের ডাক দিয়েছে। এটি বরং এ কারণেই নিরাপত্তা শঙ্কার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক যে দিনে দিনে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে টিটিপির তৎপরতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করেছে। এর নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের জানা দরকার কী কারণে এবং কিভাবে এই শক্তি তারা অর্জন করতে সক্ষম হলো। এখানে বেলুচিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মূল সমস্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, খাইবারপাখতুনখোয়ার মতোই বেলুচিস্তানের মানুষও একইভাবে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক বৈষম্যের শিকার। অথচ পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনীতির জন্য বেলুচিস্তান হচ্ছে সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। একদিকে পাকিস্তানের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েদার বন্দর, যা বেলুচিস্তানে, আরব সাগরের উপকূলে, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) এবং চীন সরকারের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রকল্প; অন্যদিকে এই প্রদেশটিতে রয়েছে মূল্যবান হীরা, সোনা, রুপা, তামা, গ্যাস ও কয়লার মতো মূল্যবান খনিজ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। পাকিস্তানের মোট সীমান্তের ৪৪ শতাংশজুড়ে বেলুচিস্তানের আয়তন এবং জনসংখ্যার বিবেচনায় সবচেয়ে ছোট (মাত্র এক কোটি ৫০ লাখ) প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও সরকারের অব্যাহত বৈষম্যমূলক নীতির ফলে আজকের এই ফুঁসে ওঠা।
তবে এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে একটি বিষয় আলোচনার দাবি রাখে, আর সেটি হচ্ছে এই ফুঁসে ওঠার কারণ কতটা স্বতঃস্ফূর্ত আর কতটা বাইরের উসকানি এখানে কাজ করেছে। আমাদের এর আগে এটিও জানা দরকার যে বেলুচিস্তানের সঙ্গে ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত রয়েছে এবং ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তানের মধ্যকার চাবাহার বন্দর ওমান সাগরের তীরে ভারত ও ইরানের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, যার মাধ্যমে মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সহজতর হয়েছে। গোয়েদার বন্দরকে এড়িয়ে এই পথে বাণিজ্যের ফলে পণ্য পরিবহনে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ সময়ের সাশ্রয় হয়। সুতরাং এই বিবেচনায় ইরান সংগত কারণেই চাইবে না বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে পাকিস্তানকে চটিয়ে চাবাহার বন্দরের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে। বাকি রইল ভারত। এ ক্ষেত্রেও একই যুক্তি। তবে এখানে একটি কথা থেকে যায়, আর সেটি হচ্ছে ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর থেকে ভারতের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। আবার টিটিপি আফগান তালেবানেরই মদদপুষ্ট গোষ্ঠী। সুতরাং ভারতের দিক থেকে হয়তো বেলুচ বিদ্রোহীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করা হচ্ছে না, তবে পরোক্ষ সহযোগিতার বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এখানে আরেকটি প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে, এই অঞ্চলে বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে ক্রমেই চীনের আধিপত্য বৃদ্ধির প্রচেষ্টা লক্ষণীয় হচ্ছে, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের জন্য বেশ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে থাকতে পারে। বেলুচিস্তানের গোয়েদার বন্দরের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০২ সালে, প্রথমবার পরীক্ষামূলক বাণিজ্য জাহাজ চলাচল করে ২০০৮ সালে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এটির উদ্বোধন হয় ২০১৬ সালে। বর্তমানে এটি ৪০ বছর মেয়াদে চায়না ওভারসিজ হোল্ডিং লিমিটেড কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে। এর পর থেকে এটি হরমুজ প্রণালি ও মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে চীনের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার যোগাযোগের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সিপিইসি ও বিআরআইয়ের আওতায় বেলুচিস্তানের খনিগুলোতে কাজ করছে বিভিন্ন চীনা কম্পানি এবং কয়েক হাজার চীনের নাগরিক, যেখানে চীনের কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্ন হামলায় বেশ কিছু চীনা নাগরিক সেখানে নিহত হয়েছে। সংগত কারণেই চীনের চাওয়া থাকবে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সুতরাং সংগত কারণেই প্রশ্ন আসতে পারে, এই অস্থিতিশীলতা কার জন্য বাড়তি সুবিধা বয়ে আনতে পারে?
এই অঞ্চলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাত ঐতিহাসিক। তবে স্পর্শকাতর কাশ্মীরের কারণে দুই দেশই বড় ধরনের সংঘাত এড়িয়ে চলতে চায়, বিশেষ করে তারা উভয়েই পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হওয়ার পর থেকে। তবে ভারতের অভ্যন্তরে বেশ কিছু নাশকতার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটি কর্তৃক বেলুচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নানা মন্তব্য উচ্চারিত হয়েছে। কয়েক বছর আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ভারতের নিরাপত্তা খর্ব হলে পাকিস্তানের দুর্বল স্থানে আঘাত করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন। তার পরও ইরানের সঙ্গে চাবাহার বন্দরের সুবিধার কারণে এবং সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া চীন-ভারত সুসম্পর্কের আলোচনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের সরাসরি সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থাকবে, এটিই অনুমান করা যায়।
এমতাবস্থায় বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা তাদের স্বপ্নকে কতটুকু বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে, সেটি নিয়ে রয়েছে অনেক ধরনের আইনি এবং আন্তর্জাতিক গোলকধাঁধা। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ববিষয়ক ১৯৩৩ সালের মন্টিভিডিও কনভেনশন অনুযায়ী, একটি দেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নিতে হলে তাকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, নির্দিষ্ট অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতা থাকতে হবে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিরাপত্তা পরিষদের সব স্থায়ী সদস্যের সম্মতি এবং সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন থাকার বিষয়টি। এ সবকিছুই বেলুচিস্তানের বর্তমান বাস্তবতায় একপ্রকার অসম্ভব বিষয়।
সংগত কারণেই এখন প্রশ্ন আসবে, এই সংকট তাহলে পাকিস্তানের জন্য কী ধরনের ভবিষ্যৎ নির্ণয় করতে যাচ্ছে? এর উত্তরে এটিই বলা যায়, এটি পাকিস্তান সরকারকেই নির্ধারণ করতে হবে। সমস্যাগুলোর সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত এসবের সমাধানে রাজনৈতিক প্রচেষ্টার চেয়ে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতাই বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। একই সঙ্গে এটিও দৃশ্যমান হয়েছে, রাজনৈতিক সরকারের চেয়ে সামরিক বাহিনীর অধিক হস্তক্ষেপ এই সংকট আরো বৃদ্ধি করেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি স্বাধীনতার পর থেকে একটি উল্লেখযোগ্য সময় সরাসরি সামরিক শাসক দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। দেড় যুগের বেশি সময় ধরে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও কার্যত পুরোপুরি সামরিক হস্তক্ষেপের বাইরে যেতে পারেনি দেশটি। বেলুচিস্তান ও খাইবারপাখতুনখোয়া পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের এপিঠ-ওপিঠ। এর যেকোনো একটির পরিস্থিতির অবনতি অন্যটির সংকটকেও বাড়িয়ে তুলবে। সমস্যা আসলে গোড়ায়, সরকার যতক্ষণ না সামরিক হস্তক্ষেপের বাইরে গিয়ে সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিকভাবে এটি সমাধানে মনোনিবেশ করতে পারবে, সমাধান ততই জটিল হতে থাকবে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়




১৮ জুলাইয়ের পরে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রথমে আমি অন্য গণমাধ্যমের বিশেষ ব্যবস্থার ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করে খবর পাঠানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। পরে সেই ব্যান্ডউইথও সংকুচিত করে দিলে ছবি বা ভিডিও কিছুই পাঠানো যাচ্ছিল না। তখন আমি সরাসরি মোবাইল ফোনে এখান থেকে জার্মানিতে ৪৯ টাকা মিনিটে কল করে সংবাদ দিচ্ছিলাম এবং বন শহরের অফিসে বসে দিনরাত জার্মানিতে কর্মরত সাংবাদিক মারুফ মল্লিক তা লিখে নিচ্ছিলেন। সেই সময় হাসপাতাল থেকে ডেথ রেজিস্টার গায়েব করা হচ্ছিল, পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ ফেরত দেওয়া হচ্ছিল, সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা লুকানো হচ্ছিল। এমনকি পুলিশেরও কিছু সদস্য জনরোষে প্রাণ হারিয়েছিলেন।