বান্দরবান পার্বত্য জেলায় পাহাড়, নদী ও বন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ধস আবারও দেখিয়ে দিয়েছে—এই অনন্য ভূ-প্রকৃতি আজ গভীর পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে। টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে বান্দরবানের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সদর, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, রুমা ও থানচির মতো উপজেলার বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগ, কৃষি, শিক্ষা ও স্থানীয় অর্থনীতি। অনেক পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়েছে।
সম্প্রতি কালের কণ্ঠে বান্দরবান পার্বত্য জেলার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে ‘বন্যা পাহাড়ধস বিচ্ছিন্ন যোগাযোগে জনজীবন বিপর্যস্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী পানিবন্দি প্রায় ৫০ হাজার মানুষ, কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা! পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে আরো প্রায় ৩০ হাজার বাসিন্দা। সর্বোপরি এই পরিস্থিতিকে শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে বড় একটি সত্য আড়ালে থেকে যাবে। বান্দরবানের বন্যা ও পাহাড়ধস আসলে প্রকৃতি ও মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতার একটি বড় সতর্কসংকেত। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পাহাড় ও বন ধ্বংস এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের বাধাগ্রস্ত হওয়া—সবকিছু মিলেই এই সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে।
প্রথমত, ভারি বৃষ্টিপাত এখন আগের তুলনায় বেশি অনিয়মিত ও তীব্র হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়ছে। পাহাড়ি এলাকায় এই ধরনের বৃষ্টিপাতের প্রভাব আরো ভয়াবহ হয়। কারণ পাহাড় থেকে দ্রুত পানি নিচের দিকে নেমে আসে। ফলে মানুষ প্রস্তুতি নেওয়ার পর্যাপ্ত সময় পায় না এবং আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়।
বান্দরবানের ক্ষেত্রে উজানের পাহাড়ি অঞ্চল, বিশেষ করে মায়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকার বৃষ্টিপাতও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর মতো নদীগুলোর পানি শুধু স্থানীয় বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে না; আন্ত সীমান্ত পাহাড়ি পানিপ্রবাহও নদীর পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই আধুনিক বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থায় শুধু দেশের অভ্যন্তরের বৃষ্টিপাত নয়, উজানের আবহাওয়া ও পানিপ্রবাহের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, নদী ও পানিপ্রবাহ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বছরের পর বছর পলি জমে নদীর নাব্যতা কমে গেলে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। একইভাবে খাল, ছড়া ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ দখল, ভরাট বা সংকুচিত হয়ে গেলে অতিরিক্ত পানি দ্রুত বের হতে পারে না। ফলে স্বাভাবিক বৃষ্টিও অনেক সময় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও বন্যার রূপ নেয়।
তৃতীয়ত, পাহাড় কাটা ও বন উজাড় বান্দরবানের পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য বড় হুমকি। পাহাড়ের মাটি ধরে রাখার ক্ষেত্রে গাছের শিকড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বন উজাড় হলে মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি পায় এবং পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটার ফলে প্রাকৃতিক ঢালের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়। ভারি বৃষ্টির সময় এসব এলাকা সহজেই পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে পড়ে।
পাহাড়ধস শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, অনেক ক্ষেত্রে এটি মানুষের তৈরি ঝুঁকির ফলও। পাহাড়ের পাদদেশে অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা উপেক্ষা করে বসবাস মানুষের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই সাধারণত এসব ঝুঁকির সবচেয়ে বড় শিকার হয়। কারণ নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ ও সম্পদ তাদের সীমিত।
এই বাস্তবতায় বান্দরবানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে শুধু জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত পরিকল্পনা ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন। প্রথমত, সাঙ্গু, মাতামুহুরীসহ জেলার গুরুত্বপূর্ণ নদী, খাল ও ছড়ার নিয়মিত জরিপ, খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। তবে নদী ব্যবস্থাপনায় শুধু খনন নয়, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্যও বিবেচনায় নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাহাড় রক্ষাকে শুধু পরিবেশগত বিষয় হিসেবে নয়, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসতি ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা প্রয়োজন। যারা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকায় বসবাস করছে, তাদের জন্য নিরাপদ পুনর্বাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু উচ্ছেদ নয়, মানুষের জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সমাধান তৈরি করতে হবে।
চতুর্থত, প্রযুক্তিনির্ভর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ, নদীর পানি বৃদ্ধির তথ্য, পাহাড়ধসের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব।
বান্দরবানের বন্যা ও পাহাড়ধস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত করে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। পাহাড়, নদী ও বন শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এগুলো মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তার ভিত্তি।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন উন্নয়ন দর্শন, যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তা একসঙ্গে বিবেচিত হবে। বান্দরবানের সংকট তাই শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়, এটি পুরো দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতের দুর্যোগকে পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও এর ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
লেখক : জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক




