‘রথযাত্রা, লোকারণ্য, মহা ধুমধাম,
ভক্তেরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম।
পথ ভাবে আমি দেব, রথ ভাবে আমি,
মূর্তি ভাবে আমি দেব—হাসেন অন্তর্যামী।’
রথযাত্রা ঘিরে উৎসবে মাতোয়ারা সবাই। ভক্তরা ফুল, বাতাসা, নকুলদানা ও কাঁদি কাঁদি কলা নিয়ে সকাল থেকে উপস্থিত রথযাত্রায় অংশ নিতে। হাজার হাজার ভক্ত রথের রশি টেনে নিয়ে যাবেন। রথটানা শুরুর আগেই আকাশে ঘন কালো মেঘ জমে। রথটানা শুরু মাত্রই আশ্চর্যভাবে অনেকটা ভারাক্রান্ত ও বেদনাচ্ছন্ন হয়ে এসব ঘন মেঘ দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে মাটির পৃথিবীতে ঝরে পড়ে। সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে নেচে-গেয়ে মতোয়ারা হন সবাই। সেই সঙ্গে সমান তালে বাজতে থাকে ঘণ্টাবাদ্যি। একদিকে পুরুষরা শঙ্খ, ঘণ্টা, কাঁসা, ঢাক, ঢোল বাজিয়ে পরিবেশমুখর করে তোলেন, অন্যদিকে নারীরা উলুধ্বনি ও মঙ্গলধ্বনির মাধ্যমে রথটানায় আনন্দচিত্তে শামিল হন। রথ থেকে রাস্তায় দাঁড়ানো দর্শনার্থীদের দিকে ছুড়ে দেওয়া হয় কলা আর ধানের খই। শাস্ত্রে রয়েছে, ‘রথে চ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যাতে’ অর্থাৎ রথে চড়ে বামন জগন্নাথকে দেখতে পেলে জীবের আর পুনর্জন্ম হয় না। এ বিশ্বাস বুকে ধারণ করেই আজ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের এ মহা উৎসবের আয়োজন।
শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী প্রাণের উৎসব। মিলনের এক মহামেলা। আষাঢ়ের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে বর্ষা ঋতুর আগমনের শুরুতেই রথযাত্রা উৎসব গ্রামে-গঞ্জে, নগরে বিপুলভাবে সর্বজনীন রূপ নেয়। এ মহা উৎসবকে কেন্দ্র করে বর্ষাবিধুর আবহাওয়ার মধ্যেও মেলা বসে। রথযাত্রা উপলক্ষে জাতি-বর্ণ-নির্বিশেষে সবারই পদচারণে মুখরিত থাকে বিভিন্ন সড়ক। শিশু থেকে বয়োবৃদ্ধ সবাই রথযাত্রায় সারথি হতে পথে নেমে পড়ে। ভক্তকুলের ব্যাপক অংশগ্রহণে রথযাত্রা উৎসব মহা উৎসবে রূপ নেয়। বিশ্বের কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবলম্বীর হৃদয়ে শ্রীশ্রী জগন্নাথ প্রত্যক্ষ দেবতা হিসেবে পূজিত হয়ে আসছেন।
পদ্মপুরাণে উল্লিখিত রথযাত্রায় শ্রী বিষ্ণুর মূর্তিকে রথারোহণ করানোর কথা বলা হয়েছে। আর পুরীর জগন্নাথ দেবের মূর্তি যে শ্রীকৃষ্ণ তথা শ্রী বিষ্ণুরই আরেকটি রূপ, তা সবাই স্বীকার করে। স্কন্দপুরাণে কিন্তু প্রায় সরাসরিভাবে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার কথা রয়েছে। সেখানে ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র মাহাত্ম্য’ কথাটি উল্লেখ করে মহর্ষী জৈমিনি রথের আকার, সাজসজ্জা, পরিমাপ ইত্যাদির বর্ণনা দিয়েছেন। ‘পুরুষোত্তম ক্ষেত্র’ বা ‘শ্রীক্ষেত্র’ বলতে পুরীকেই বোঝায়। তাই দেখা যাচ্ছে যে সেই পুরাণের যুগেও এই রথযাত্রার প্রচলন ছিল।
‘উৎকলখণ্ড’ এবং ‘দেউল তোলা’ নামক ওড়িশার প্রাচীন পুঁথিতে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার ইতিহাস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে এই রথযাত্রার প্রচলন হয়েছিল সত্যযুগে। সে সময় আজকের ওড়িশার নাম ছিল মালবদেশ। সেই মালবদেশের অবন্তীনগরী রাজ্যে ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে সূর্যবংশীয় এক পরম বিষ্ণুভক্ত রাজা ছিলেন, যিনি ভগবান বিষ্ণুর এই জগন্নাথরূপী মূর্তির রথযাত্রা শুরু করার স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন পুরীর এই জগন্নাথমন্দির নির্মাণ ও রথযাত্রার প্রচলন করেন।
জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা উৎসব অন্যান্য দেশের মতো আমাদের বাংলাদেশেও সাড়ম্বরে পালিত হয়। ঢাকা শহরের অদূরে ধামরাইয়ের এ উৎসব বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম। ধামরাই রথযাত্রার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। জানা যায়, ১০৭৯ বাংলা সন থেকে দীর্ঘ ৩৪০ বছর ধরে ধামরাইয়ের রথযাত্রা ও রথমেলা উৎসব পালিত হয়ে আসছে। কিভাবে এই বাঁশের রথটি কাঠের রথে পরিণত হয়, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। ১২০৪ থেকে ১৩৪৪ বাংলা সন পর্যন্ত মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া থানার বালিয়াটির জমিদাররা বংশানুক্রমে এখানে পর পর চারটি রথ তৈরি করেন। ১৩৪৪ বাংলা সনের রথের ঠিকাদার ছিলেন নারায়ণগঞ্জের সূর্য নারায়ণ সাহা। এই রথটি তৈরি করতে সময় লাগে এক বছর। ধামরাই, কালিয়াকৈর, সাটুরিয়া ও সিংগাইর থানার বিভিন্ন কাঠশিল্পী যৌথভাবে নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করে ৬০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন রথটি তৈরি করেন। এই রথটি ছিল ত্রিতলাবিশিষ্ট, যার প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় চার কোণে চারটি এবং তৃতীয় তলায় একটি প্রকোষ্ঠ ছিল। এর নাম নবরত্ন। রথটি টানার জন্য প্রায় ২৭ মণ পাটের কাছি দরকার হতো, যদিও আজ সেই বড় রথটি আর নেই। কিন্তু এখন ছোট আকারের ৩০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন রথ তৈরি করে উৎসব পালন করা হচ্ছে এবং রথ টানার সময় একই আনন্দের সৃষ্টি হয়ে থাকে।
রাজধানী ঢাকার সূত্রাপুরে রামসীতা মন্দির কমিটির আয়োজনে ৫০০ বছরের পুরনো রথযাত্রার অনুষ্ঠান চলে আসছে। পুরান ঢাকায় শ্রীশ্রী রাধামাধব জিউ দেববিগ্রহ মন্দির, ঠাটারীবাজার শিবমন্দির ও রাধাগোবিন্দ জিউ ঠাকুর মন্দিরেও রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকায় সবচেয়ে বড় রথযাত্রার উৎসব অনুষ্ঠিত হয় ইসকন মন্দিরে। শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেব, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর বিগ্রহ সুসজ্জিত রথ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে ইসকন মন্দির থেকে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়, আবার অষ্টম দিবসে উল্টো রথযাত্রা হিসেবে রথ তিনটিকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনা হয়। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, বানিয়াজুরী, পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজার, যশোরের কেশবপুর, নড়াইলের লোহাগড়া, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, হবিগঞ্জ এবং সিলেট অঞ্চলে উৎসবের উচ্ছ্বাসটা অন্য এলাকার চেয়ে একটু বেশিই।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ



নদীর গতি পরিবর্তন, পানিপ্রবাহ এবং পলিমাটির সমস্যা নিয়ে নানা তত্ত্ব রয়েছে। কেউ মনে করেন, হিমালয়ে বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে ভূমিক্ষয় হচ্ছে বেশি এবং সেই সঙ্গে ওই অঞ্চলের পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে গেছে। ফলে সমতলে বন্যার তীব্রতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। আবার কারো মতে, হিমালয় অঞ্চলে সাধারণত প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং ওই অঞ্চলের ভূমি অধিকতর ঢালু হওয়া এবং শিলাচ্যুতির কারণে ভূমির ক্ষয় হচ্ছে বেশি। তা ছাড়া ভূকম্পনের ফলেও সেখানে বড় বড় ভূমিধস হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, হিমালয় অঞ্চলে শুধু বনায়ন করলেই ভূমিক্ষয় হ্রাস করা যাবে না এবং নিম্নাঞ্চলে পলিমাটির সমস্যা ঠেকানো যাবে না।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, সংসদ নির্বাচনসহ যেকোনো নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন নির্বাচনী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যেকোনো কর্মযজ্ঞের পরিসংখ্যান একই কর্মের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি অপরিহার্য অংশ। এটি প্রকাশ না করাটা দুঃখজনক। এক ধরনের দায়িত্বহীনতাও বটে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়াটা বা প্রকাশের ন্যূনতম উদ্যোগ না নেওয়াটা নির্বাচনের নামে প্রহসনকে আড়াল করার অপচেষ্টারই নামান্তর।