বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশ যেন রঙিন এক ফুটবলের রাজ্যে পরিণত হয়। অজপাড়াগাঁ থেকে শহর, অলিগলি থেকে ক্যাম্পাস, আকাশে-বাতাসে সর্বত্রই ফুটবল নিয়ে মাতামাতি চোখে পড়ে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন কিংবা পর্তুগালের পতাকায় ছেয়ে যায় ছাদ, বারান্দা। রাত জেগে মানুষ খেলা দেখার পর সামাজিক মাধ্যমে চলে দিনভর তর্কবিতর্ক। এমনকি আমার ক্লাসে নিয়মিত অধ্যয়নরত ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানি, মেক্সিকো ও কলম্বিয়ার বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যেও এতটা উন্মাদনা আমি দেখি না। ফলে কিছু প্রশ্ন বারবার আমাদের আহত করে—যে দেশে ফুটবল এত জনপ্রিয়, যেখানে এই খেলা নিয়ে বন্ধুত্বে ধরে ফাটল, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও হয় সিরিয়াস ঝগড়া-বিবাদ, সেই দেশের ফিফা র্যাংকিং ১৮১তম কেন? বিশ্বকাপ তো অনেক দূরের কথা, এশিয়ান কাপেও কেন এখনো নাম লেখাতে পারছে না বাংলাদেশ? কেন আমাদের ভাবতে হয়, মালদ্বীপ, ভুটান বা নেপালের সঙ্গে জয়লাভ করতে পারব কি পারব না?
বাংলাদেশের ফুটবলের সংকটের মূল কারণ প্রতিভার অভাব নয়, বরং প্রতিভা বিকাশের কার্যকর উদ্যোগ ও ব্যবস্থার অভাব। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল উন্নয়নের ধারাবাহিক পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। স্কুল ফুটবল, জেলা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়েছে। ফলে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করে ধাপে ধাপে জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে আসার যে কাঠামো প্রয়োজন, তা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও বড় একটি কারণ। দেশের বহু এলাকায় এখনো মানসম্মত খেলার মাঠ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং আধুনিক ফুটবল একাডেমির অভাব রয়েছে। একসময় কিছু মাঠে অনিয়মিত খেলাধুলা হলেও সেখানে এখন নানা ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করে মাঠ সংকুচিত করা হয়েছে। অনেক প্রতিভাবান তরুণ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সঠিক কোচিং কিংবা প্রয়োজনীয় সুযোগ না পাওয়ায় মাঝপথেই ঝরে পড়ে। আবার কিছু প্রতিভা ঝরে যায় শুধু স্বজনপ্রীতির বেড়াজালে আটকে পড়ে।
আমার স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা ছিল করুণ। তখন অনেক ক্ষেত্রেই খেলাধুলাকে এক ধরনের অপরাধ বা সময়ের অপচয় বলে মনে করা হতো। ফলে লুকিয়ে ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার কাটা কিংবা ভলিবল খেলতাম। জাপানিজ কারাতে শিখতাম অনেকটা চুরি করে। এসব করতে গিয়ে মা-বাবা ও শিক্ষকদের কাছ থেকে যে কত গালি হজম করেছি এবং মার খেয়েছি, তার হিসাব নেই। অথচ উন্নত বিশ্বে প্রায়ই এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। অনেক মা-বাবা সন্তানদের পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল, ক্রিকেট, সুইমিং বা মার্শাল আর্ট ক্লাবে ভর্তি করান। অনেক ক্ষেত্রে সন্তানদের জোরজবরদস্তি করেও ভর্তি করাতে হয়। কারণ সচেতন মা-বাবা খেলাধুলাকে শারীরিক ও মানসিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। এমন সুযোগ স্কুলজীবনে আমি বা আমার মতো আরো অনেকেই পেলে হয়তো এখন আমরাও পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, নেইমার, রোনালদো বা ইমরান খান, টেন্ডুলকার হয়ে যেতাম।
ফুটবল উন্নয়ন কোনো এক বা দুই বছরের প্রকল্প নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সফল দেশগুলো সাধারণত ১০ থেকে ২০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকটাই ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এর পেছনে আরো একটি বড় কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। ক্ষমতার পালাবদল হলে আগের সরকারের রেখে যাওয়া অনেক ভালো উদ্যোগও হারিয়ে যায়। ঘরোয়া ফুটবলের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্বের সফল ফুটবল দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, শক্তিশালী জাতীয় দলের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রতিযোগিতামূলক ঘরোয়া লীগের ওপর। বাংলাদেশের প্রিমিয়ার লীগে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও দর্শকসংখ্যা, বাণিজ্যিক আকর্ষণ এবং প্রতিযোগিতার গভীরতায় এখনো ঘাটতি রয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে আফ্রিকার ছোট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের কুরাসাও। জনসংখ্যার দিক থেকে এই দেশগুলো বাংলাদেশের তুলনায় অত্যন্ত ছোট। যে দেশগুলোর নাম কয়েক সপ্তাহ আগেও পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ জানত না, সেই কেপ ভার্দে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দারুণ লড়াকু মানসিকতা দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ মুহূর্তেই দেশটির পরিচিতি ও আত্মপরিচয়কে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। দু-চার দিন আগেও যেসব খেলোয়াড়ের অনুসারী সংখ্যা ছিল গড়ে ১০ থেকে ২০ হাজার, রাতারাতি তা হয়ে দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন। মাত্র পাঁচ লাখের মতো জনসংখ্যার (বাংলাদেশের বেশির ভাগ জেলার চেয়েও কম) পশ্চিম আফ্রিকার এই ছোট্ট দেশ ফুটবল বিশ্বের বড় বড় শক্তির বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে।
বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের উত্থান ও সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো দেশপ্রেম, ফুটবল অবকাঠামো, জাতীয় দল পরিচালনা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ। একই সঙ্গে প্রবাসী ফুটবলারদের জাতীয় দলের সঙ্গে সংগঠিত ও দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত করা, অভিজ্ঞ স্কাউটিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা অনুসরণ করা এবং সরকার পরিবর্তন হলেও গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোকে অব্যাহত রাখা। কেপ ভার্দে তাদের বৃহৎ প্রবাসী সম্প্রদায়ের ফুটবলারদের ব্যবহার করে জাতীয় দলকে শক্তিশালী করেছে, আর কুরাসাও নেদারল্যান্ডসে বেড়ে ওঠা নিজেদের বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের সফলভাবে জাতীয় দলের অংশ করেছে। বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ সম্প্রতি এই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। তবে বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে, যেন দেশের নিজস্ব প্রতিভা বিকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়। একই সঙ্গে স্বজনপ্রীতি বা ঘুষের লেনদেনকে নিরুৎসাহ করতে বাছাই প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়াও জরুরি।
যেহেতু ১৮ কোটির বেশি মানুষের এই দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফুটবলের প্রতি আগ্রহ আজও প্রবল, তাই প্রতিভার সংকট থাকার কথা নয়। প্রয়োজন সেই প্রতিভাকে খুঁজে বের করার কার্যকর ব্যবস্থা এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তার নিয়মিত তদারকি। স্কুল ও জেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা চালু করা, তৃণমূল উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, স্থানীয় ক্লাব সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা, প্রতিটি স্কুল ও কলেজে একটি খেলার মাঠ নিশ্চিত করা, বয়সভিত্তিক একাডেমি সম্প্রসারণ, আধুনিক কোচ তৈরিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, ফিটনেস ব্যবস্থাপনা ও উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
ফুটবলের উন্নয়নে করপোরেট বিনিয়োগও জরুরি। শুধু ফেডারেশনের ওপর নির্ভর করে একটি দেশের ফুটবলকাঠামো গড়ে তোলা কঠিন। এ ক্ষেত্রে মা-বাবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাঠ্যপুস্তক থেকে অকার্যকর কিছু বিষয় কমিয়ে শরীরচর্চা ও খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচিত্র বিশদ অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করাও সময়ের দাবি। বর্তমান যুবসমাজের একাংশ শরীরচর্চা বাদ দিয়ে জুয়া ও মাদক চর্চায় বেশি আসক্ত। খেলাধুলাই পারে তাদের সুস্থ জীবনের পথে ফিরিয়ে আনতে।
স্বপ্ন সঠিকভাবে দেখলে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে, কেপ ভার্দে বা কুরাসাওয়ের মতো অপরিচিত উন্নয়নশীল দেশ যদি ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে জায়গা করে নিতে পারে, বাংলাদেশের মতো সুপরিচিত দেশ কেন পারবে না? আমরাও দেখতে চাই, একদিন পুরো বিশ্ব বাংলাদেশকে টিভিতে দেখুক, প্রিয় দেশ টক অব দ্য ওয়ার্ল্ডে পরিণত হোক।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট



নদীর গতি পরিবর্তন, পানিপ্রবাহ এবং পলিমাটির সমস্যা নিয়ে নানা তত্ত্ব রয়েছে। কেউ মনে করেন, হিমালয়ে বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে ভূমিক্ষয় হচ্ছে বেশি এবং সেই সঙ্গে ওই অঞ্চলের পানি ধারণ ক্ষমতাও কমে গেছে। ফলে সমতলে বন্যার তীব্রতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। আবার কারো মতে, হিমালয় অঞ্চলে সাধারণত প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং ওই অঞ্চলের ভূমি অধিকতর ঢালু হওয়া এবং শিলাচ্যুতির কারণে ভূমির ক্ষয় হচ্ছে বেশি। তা ছাড়া ভূকম্পনের ফলেও সেখানে বড় বড় ভূমিধস হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, হিমালয় অঞ্চলে শুধু বনায়ন করলেই ভূমিক্ষয় হ্রাস করা যাবে না এবং নিম্নাঞ্চলে পলিমাটির সমস্যা ঠেকানো যাবে না।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, সংসদ নির্বাচনসহ যেকোনো নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন নির্বাচনী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যেকোনো কর্মযজ্ঞের পরিসংখ্যান একই কর্মের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি অপরিহার্য অংশ। এটি প্রকাশ না করাটা দুঃখজনক। এক ধরনের দায়িত্বহীনতাও বটে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়াটা বা প্রকাশের ন্যূনতম উদ্যোগ না নেওয়াটা নির্বাচনের নামে প্রহসনকে আড়াল করার অপচেষ্টারই নামান্তর।