• ই-পেপার

অপরাধের পরিসংখ্যানগত প্রতিবেদন ও বাস্তবতা

  • মো. সাখাওয়াত হোসেন

দেশেই চালু হলো ‘স্কিন ব্যাংক’

ডা. ইকবাল আহমেদ

দেশেই চালু হলো ‘স্কিন ব্যাংক’

মানুষের শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ কোনটি? অনেকেই হূিপণ্ড, মস্তিষ্ক বা ফুসফুসের কথা বলবেন। অথচ সঠিক উত্তরত্বক। এই ত্বক আমাদের শরীরের প্রথম প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এটি শুধু বাইরের আঘাত থেকে রক্ষা করে না, জীবাণু, তাপ, পানি ও নানা ক্ষতিকর উপাদানের বিরুদ্ধেও শরীরকে সুরক্ষা দেয়। তাই আগুনে পুড়ে গেলে শুধু ত্বক নষ্ট হয় না, ভেঙে পড়ে শরীরের সবচেয়ে বড় ঢালও। তখন সংক্রমণ, অতিরিক্ত তরল ও প্রোটিন ক্ষয়, ব্যথা, প্রদাহ এবং সেপসিস রোগীর জীবনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই গুরুতর দগ্ধ রোগীর চিকিৎসায় স্কিন ব্যাংক একটি যুগান্তকারী সংযোজন।

দেশে স্কিন ব্যাংক চালু হওয়ার অর্থ হলো বার্ন চিকিৎসায় নতুন আশার সঞ্চার হওয়া। কারণ অনেক সময় রোগীর নিজের চামড়া দিয়ে ক্ষত ঢেকে রাখা সম্ভব হয় না। তখন দান করা চামড়া সাময়িকভাবে ক্ষতস্থানে ব্যবহার করা হয়। এটি ক্ষত ঢেকে রাখে, সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়, ব্যথা ও প্রদাহ হ্রাস করে, তরল ক্ষয় রোধ করে এবং রোগীকে স্থিতিশীল হতে সাহায্য করে। এই সময়ের মধ্যেই রোগীকে পরবর্তী স্থায়ী চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে এই কয়েকটি দিনই জীবন বাঁচিয়ে দেয়।

আমরা যেমন ব্লাড ব্যাংকের কথা জানি, স্কিন ব্যাংকও অনেকটা তেমন একটি ব্যবস্থা। একজন মানুষের দান করা চামড়া সংগ্রহ করে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজনে অন্য একজন রোগীর ক্ষতস্থানে ব্যবহার করা যায়। রক্তের মতো এখানে গ্রুপ মেলানোর প্রয়োজন হয় না। তবে অন্যের চামড়া স্থায়ীভাবে শরীরে থাকে না; কয়েক সপ্তাহ পর শরীর সেটিকে প্রত্যাখ্যান করে। তবু এই অল্প সময়ই রোগীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চামড়া শুধু জীবিত অবস্থায় অপসারিত টিস্যু থেকে নয়, মৃত্যুর পরও দান করা যায়। যেমন আমরা চক্ষুদানের কথা জানি, তেমনি মৃত্যুর পর একজন মানুষের শরীরের চামড়াও দান করা সম্ভব। সাধারণত মৃত্যুর ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে উপযুক্তভাবে চামড়া সংগ্রহ করতে হয়। এরপর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জীবাণুমুক্তকরণ এবং সংরক্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা স্কিন ব্যাংকে রাখা হয়। বিশেষ তাপমাত্রা ও মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই চামড়া ব্যবহার উপযোগী রাখা হয়। চামড়া দান শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়; এটি মানবতার বিষয়। আশার সেতুবন্ধ।

বাংলাদেশে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্কিন ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হওয়া তাই শুধু একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়; এটি অসংখ্য দগ্ধ মানুষের জন্য নতুন আশার দরজা। কিন্তু স্কিন ব্যাংকে চামড়া আসবে কোথা থেকে? এখানেই আসে সমাজের অংশগ্রহণ।

বর্তমানে অনেক প্লাস্টিক সার্জারিসহ বিভিন্ন সার্জারিতে শরীরের কিছু অংশ কেটে ফেলে দিতে হয়। যেমন টামি টাক সার্জারিতে ঝুলে যাওয়া পেটের অতিরিক্ত চামড়া, ব্রেস্ট রিডাকশন সার্জারিতে অপসারিত চামড়া ও টিস্যুর একটি অংশ। এসব চামড়া যথাযথ স্ক্রিনিং ও প্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে স্কিন ব্যাংকে সংরক্ষণ করা সম্ভব। একই সঙ্গে সচেতন ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যরাও চামড়া দানের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে চামড়াদাতার ক্ষতস্থান একটি নির্দিষ্ট সময় পরে চামড়া গজিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠে।

আজ আমরা রক্তদানকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করেছি। একসময় কর্নিয়া দানও মানুষের কাছে অচেনা ছিল। হয়তো খুব দূরের ভবিষ্যৎ নয়, যখন চামড়া দানও হবে সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বাভাবিক অংশ।

লেখক : যুগ্ম পরিচালক ও সহযোগী অধ্যাপক, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি, ঢাকা

বিভেদ নয় ঐক্য, সংঘাত নয় শান্তি

শায়রুল কবির খান

বিভেদ নয় ঐক্য, সংঘাত নয় শান্তি

একটি সুন্দর সম্প্রীতির বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং সমাজ গঠনের মূল চাবিকাঠি হলো উদারনৈতিক নীতি মেনে চলা। সমাজ থেকে হিংসা, হানাহানি ও অশান্তি দূর করে সবাই মিলেমিশে সুখে-শান্তিতে বসবাস করার মাঝেই মানবতার আসল সৌন্দর্য নিহিত। এই সুন্দর বার্তাটি বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য নেতৃত্বের জায়গা থেকে কিছু সহজ উপায় বের করে নিতে হয়। যেমন যেকোনো বিষয়ে মতের অমিল হলে ভুল-বোঝাবুঝি বা সংঘাত তৈরি না করে, নেতৃত্বের দূরদর্শিতা নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। কারণ আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব।

পাশাপাশি একে অপরের ধর্ম, বর্ণ ও ভিন্ন মতামতকে সম্মান জানানো অপরিহার্য মনে করতে হবে। কারণ এই পারস্পরিক সম্মানই সমাজে একতা বা ঐক্য তৈরি করে। সেই সঙ্গে সমাজে যারা দুর্বল বা পিছিয়ে পড়া মানুষ, তাদের সাহায্য করতে সহমর্মিতা নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত, যা মানুষের মধ্যকার ভালোবাসার বন্ধনকে আরো দৃঢ় করে। বাস্তব জীবনের ভিত্তিতে এর উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে একটি পরিবারে যেমন সব ভাই-বোন মিলে সুখে থাকে, তেমনি পুরো দেশ বা সমাজকে একটি বড় পরিবারের মতো ভেবে বাস্তবতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হয়।

বিভেদ নয় ঐক্য, সংঘাত নয় শান্তি  একজনের বিপদে অন্যজন এগিয়ে এলে সমাজে কোনো অশান্তি থাকে না। সম্প্রীতির এই বার্তা নিয়ে নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করতে পারা এবং একতাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। কারণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে যেকোনো কঠিন কাজও সহজে সম্পন্ন করা যায় বা সম্পন্ন হয়ে যায়। তাই বিভেদ বা ভেদাভেদে না গিয়ে আমাদের সবার উচিত শান্তি ও ঐক্যের পথে হাঁটা। সবাই মিলেমিশে এগিয়ে চলা।

ধর্মীয় জ্ঞান ও মানবতার মানদণ্ডে সাফল্য অর্জন করার এটিই হলো প্রথম ধাপ, যেখানে সমাজ পরিবর্তনের মূল হাতিয়ার হলো দর্শনভিত্তিক জ্ঞানসমৃদ্ধ বই। এ রকম বই বাংলাদেশের সমাজ, নেতৃত্ব ও জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেওয়া সচেতন নাগরিকদের নৈতিক দায়িত্ব, যা সমাজের গুণগত পরিবর্তনে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিনিয়োগও বটে। তাই দেশের অর্থ-বিত্তশালী ব্যক্তিদেরও এই মহৎ কাজে এগিয়ে আসা উচিত। কারণ জ্ঞানদানের এই বুদ্ধিবৃত্তিক কাজটিই হলো পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্রতম কাজ এবং মহান দায়িত্ব।

ইতিহাসের মহামনীষীদের অনেকেরই হয়তো অন্যকে অর্থদান, গৃহদান বা বস্ত্রদানের সামর্থ্য ছিল না, তবু তাঁরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দান করে গেছেন। তাঁরা আমৃত্যু জ্ঞানদান করে গেছেন। যেমনটি সক্রেটিস বলেছিলেন, জ্ঞানের আলো হচ্ছে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ আলো, আর অজ্ঞতা হলো অন্ধকার। অর্থ, বস্ত্র কিংবা সুন্দর গাড়ি-বাড়ি মানুষকে কখনোই শান্তির পথ দেখায় না; বরং মানুষের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত ও প্রকৃত শান্তির পথ দেখায় মানবিক জ্ঞান ও সভ্যতার আলো।

বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জ্ঞানদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, অতীতের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে শহীদ ও নির্যাতিতদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাঁদের আদর্শের পথটি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখানে স্মরণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, আমি তোমার মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকারের জন্য আমি আমার জীবন দিতে পারি। ঠিক এই চেতনার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই আমাদের ইতিহাসের পাতায়।

৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ৭০-এর নির্বাচন, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সবটুকুতেই গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানবসভ্যতার শান্তি নিহিত রয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এর প্রতিটি অধ্যায় যে মহান লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু ও সমাপ্ত হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত কি আমরা সেই পরিকল্পিত ও কার্যকর সাফল্য পূর্ণাঙ্গভাবে অর্জন করতে পেরেছি?

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভৌগোলিক দিক থেকে ছোট, কিন্তু বীরত্বে অনন্য এক দেশ বাংলাদেশ। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যার জন্ম এবং যার উত্তরে হিমালয় ও দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশি। এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করেই স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে এসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর-উত্তম স্বনির্ভর বাংলাদেশকে নিজস্ব জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের মেলবন্ধনে এক মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যার দূরদর্শী চিন্তাকে ধারণ করেই মূলত দেশের প্রতিটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

সময়ের চাহিদা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের এই ধারাবাহিকতা সুদীর্ঘ; যেমন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে, জিয়াউর রহমানের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মোড় পরিবর্তন ছিল (বাংলাদেশ : পলিটিকস অ্যান্ড গভর্ন্যান্স)। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৪ সালের একদলীয় শাসন বাকশাল বিলুপ্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে সংবিধানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে সমৃদ্ধ করেছে। এরই পথ ধরে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষাই ছিল বৈষম্যহীন সমাজ গঠন, ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশ এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার প্রথম দিন থেকেই সেই সংস্কার ও জবাবদিহির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছেন। দেশের সচেতন মহল গভীরভাবে আশাবাদী যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নীতি ও আদর্শের যোগ্য উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা রাষ্ট্রীয় সংস্কার কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই অর্জিত হবে টেকসই শান্তি, দূর হবে সামাজিক বৈষম্য এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বাংলাদেশ রূপান্তরিত হবে একটি প্রকৃত মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিককর্মী

ছেঁড়া নোটের বিড়ম্বনা ও ‘বাংলা কিউআর’ লেনদেন

নির্মল চক্রবর্তী

ছেঁড়া নোটের বিড়ম্বনা ও ‘বাংলা কিউআর’ লেনদেন

দৈনন্দিন জীবনে টাকার ব্যবহার অপরিহার্য। কোনো বস্তুর দাম পরিশোধের আধুনিক মাধ্যম হলো টাকা। টাকা দিয়েই প্রতিদিনের জিনিসপত্র কেনাকাটা করি। এটি হচ্ছে পণ্য ও সেবা বিনিময়ের মাধ্যম, মূল্যের পরিমাপক। টাকা ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা অচল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য এই যে ছেঁড়া টাকা, পোড়া টাকা, আজেবাজে লেখাযুক্ত টাকা এবং ময়লা টাকায় ভরে গেছে পুরো দেশ। এসব টাকা দিয়ে লেনদেন করতে অনেক কষ্ট হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের খুচরা বাজারে এই জরাজীর্ণ টাকা গ্রাহকদের জন্য এক বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পাঁচ, ১০ ও ২০ টাকার মলিন ও ছেঁড়া কাগজের নোট দৈনিক বাজারব্যবস্থায় এক বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসবাই এসব নোট নিয়ে প্রতিদিন ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষুদ্র অর্থনীতি ও সামাজিক সম্পর্কের স্বাভাবিক গতিকেও ব্যাহত করছে।

জরাজীর্ণ এসব নোট নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সাধারণ মানুষ। একজন দিনমজুর বা রিকশাচালক দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনি করে যে টাকা উপার্জন করছেন, তার মধ্যে যদি দু-একটি এমন নোট ঢুকে যায়, তবে দিনশেষে চাল-ডাল কিনতে গিয়ে তাঁকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। প্রতিদিন সামান্য কয়েক টাকার লেনদেন নিয়ে তৈরি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত তর্কাতর্কি, হাতাহাতি ও চরম তিক্ততা। বাস-লেগুনার কন্ডাক্টর, ফুটপাতের হকার, রিকশাচালক এবং সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে এই নোট আদান-প্রদান নিয়ে বচসা এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

টাকা শুধু বিনিময়ের মাধ্যমই নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার এবং জাতীয় মর্যাদারও ব্যাপার। বিদেশি পর্যটক বা ব্যবসায়ীরা যখন দেশে আসেন, তখন তাঁদের হাতে এমন জরাজীর্ণ নোট গেলে তাতে দেশেরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।

ছেঁড়া নোটের বিড়ম্বনা ও ‘বাংলা কিউআর’ লেনদেনঅথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো তফসিলি ব্যাংক ছেঁড়া, ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট পরিবর্তন করে নতুন বা উপযোগী নোট দিতে বাধ্য। বিশেষ করে পাঁচ, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার ছোট নোট বিনিময়ের জন্য প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ কাউন্টার চালু রয়েছে। কিন্তু সেই সুফল লাভ মোটেই সহজলভ্য নয়। নিয়ম থাকলেও ব্যাংকগুলো এটি মানতেই চায় না। উল্টো আরো বিব্রত হতে হয়। অভিযোগ করেও তেমন একটা ফল হয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা শুধু বিভিন্ন ব্যাংক শাখার দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেতেই দেখা যায়। কিন্তু নির্দেশনাটুকু মানতে দেখা যায় না। ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ এবং তার বিনিময় মূল্য প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। বলা হয়েছে, বিনিময় মূল্য প্রদানে অনীহা প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আপনার কাছে থাকা ছেঁড়া বা নষ্ট নোট বদলানোর জন্য আপনার অ্যাকাউন্ট থাকা যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখায় অথবা নিকটস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করতে পারেন। যেকোনো ব্যাংকের শাখা যদি ছেঁড়া-ফাটা নোট গ্রহণ করতে বা বদল করে দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপন্থী। কোনো ব্যাংক শাখা সহযোগিতা না করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রয়েছে।

গত এপ্রিল মাসেও এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একটি সার্কুলার জারি করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। সার্কুলারে বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়, বাজারে ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোটের আধিক্য বেড়ে গেছে। ব্যাংকগুলোকে এসব নোট বদলে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তার পরও এসব নোটের প্রচলন বাজারে বেড়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাঁচ টাকা, ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকার ছেঁড়া-ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট বদল করে নিতে বিশেষ কাউন্টার খোলার নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফেসবুক পেজেও সার্কুলারটি আপলোড করা হয়েছে। সার্কুলারটি দেখার পর দেশের নাগরিকরা যেসব মন্তব্য করেছে, তা বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত এবং পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় বলে মনে করি।

নাজমুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ব্যাংকাররা কানাকে হাইকোর্ট দেখায়। ছেঁড়া-ফাটা নোট নিয়ে গেলে বলে, ছয় মাস পরে নতুন নোট নিতে হবে। তারা ১০০টা ছেঁড়া নোটের একটা বান্ডেল মিলিয়ে সেটা তাদের হেড অফিসে পাঠাবে, হেড অফিস বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাবে, বাংলাদেশ ব্যাংক হেড অফিসকে নতুন নোটের বান্ডেল দেবে, সেই নতুন নোটের বান্ডেল হেড অফিস থেকে ব্রাঞ্চে আসবে। এরপর গ্রাহককে নতুন নোট দেওয়া হবে। একাধিক ব্যাংকে গিয়ে এসব হয়রানিমূলক কথা শুনেছি।

এস এম ইমামুল হক লিখেছেন, আপনাদের এই বক্তব্য ঘোষণা বা পোস্ট পর্যন্ত কার্যকর, সোনালী ব্যাংকে সেদিন দুই হাজার টাকা দিলাম নিল না। ম্যানেজারের রুম পর্যন্ত গেলাম। তিনি বললেন, আমরা এগুলো নিতে পারব না।

ওমর শাহাদাত লিখেছেন, ইসলামী ব্যাংকে গিয়েছিলাম টাকা জমা দেওয়ার জন্য। ৫০০ টাকার ছেঁড়া নোট নেয় না, বলে নতুন টাকার ব্যবসায়ীদের কাছে দিতে।

নাজমুল হোসাইন নাইম লিখেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনা মোটামুটি বেশির ভাগ ব্যাংকই মানে না। ছেঁড়া, ময়লা বা ফাটা জাতীয় টাকা দিলে কোনো ব্যাংকই গ্রহণ করে না। সঙ্গে সঙ্গে ফেরত দিয়ে দেয় এবং বলে, টাকা পরিবর্তন করে দিন। বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি এই বিষয়গুলো খুব কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য।

এমন কয়েক শ অভিযোগ ও সমস্যার কথা জানিয়েছেন নেটিজেনরা। আর এসব অভিযোগে ছেঁড়া-ফাটা নোট ছাড়াও এসংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কথাও সামনে এসেছে, যার সমাধান একেবারেই বাঞ্ছনীয়। ছেঁড়া-ফাটা নোট থেকে বাঁচতে এম মোরশেদ নামের একজন লিখেছেন, অতি জরুরি ভিত্তিতে ক্যাশলেস ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। মান্ধাতার আমলের ব্যাংকিং কার্যক্রম আর কতকাল দেখবে জনগণ?

ছেঁড়া-ফাটা নোট, জাল টাকা ও খুচরা টাকার ঝামেলা কমাতে ১ জুলাই থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বাংলা কিউআর লেনদেন ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে একটিমাত্র কিউআর কোড ব্যবহার করে ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকরা সহজেই পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের আর্থিক সচেতনতা বা ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু প্রযুক্তি চালু করলেই হবে না। এই উদ্যোগ সফল করতে হলে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবহারে দক্ষ করে তুলতে হবে। বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশের মানুষের আর্থিক সচেতনতা এখনো কম। তাই স্কুল পর্যায় থেকেই ফিন্যানশিয়াল লিটারেসি শেখানো প্রয়োজন।

আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি পরিকল্পনা নিয়ে মানুষের আর্থিক জ্ঞান বাড়ানো গেলে বাংলা কিউআরের মতো উদ্যোগ থেকে টেকসই সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে তবেই বাংলা কিউআর দেশের ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাকে আরো নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সহজ করে তুলবে।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

দুর্নীতি বন্ধ করতে প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

দুর্নীতি বন্ধ করতে প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো দুর্নীতি বন্ধ করার বিষয়ে সব সময়ই একমত। ক্ষমতায় থাকুক, আর বিরোধী দলেই থাকুকসবাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতি বন্ধ হয় না। ক্রমাগত বেড়েই চলে দুর্নীতির চিত্র। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনের আগে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স-এর কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন এক চিত্র আমাদের সামনে আসে।

সরকার বদলায়, স্লোগান বদলায়, কিন্তু দুর্নীতি থেকে যায়। কখনো কখনো তা আরো বিস্তৃত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে জানানো হয় যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেবা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ আমলে ২০২৩ সালে যে পরিস্থিতি ছিল, তার তুলনায় ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেবা খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আরো বাড়ার চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, ২০২৫ সালে দেশের সেবাগ্রহীতাদের ৮১.৬ শতাংশ কোনো না কোনো খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যা ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০.৯ শতাংশ।

দুর্নীতি বন্ধ করতে প্রয়োজন আত্মশুদ্ধিদুর্নীতি হচ্ছে মূলত মাঠ পর্যায়ে। সরকার বদলালেও কাঠামো বরাবরই একই রকম ছিল। দুর্নীতি, ঘুষ কিংবা অবৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের অপরাধে শাস্তির উদাহরণ না থাকায় তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে। তবে দেশের অনেকেই আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো দুর্নীতি হবে না। সব অফিশিয়াল কাজকর্ম নিয়ম অনুযায়ী হবে। ঘুষ, দুর্নীতির কোনো চিহ্ন দেখা যাবে না। দেশে কোনো বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু বাস্তবে সব উল্টো হয়েছে। বৈষম্য বেড়েছে, দুর্নীতি বেড়েছে। কিছুদিন আগে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি হয়েছে। অবশ্য তিনি নিজেও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। টিআইবির প্রতিবেদনে তেমনটাই প্রমাণিত হয়েছে, যেমনটা এনসিপির আহ্বায়ক বলেছিলেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের মুখে জোরালো আওয়াজ শোনা গেলেও তা কমাতে বাস্তবিক তারা কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি। কোনো কোনো উপদেষ্টার ব্যক্তিগত সহকারীর বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার অভিযোগ উঠলেও প্রধান উপদেষ্টা সেটি আমলে নেননি। এমনকি কমিশন গঠন ছাড়া মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতি দমনে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

টিআইবি পরিচালিত সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫-এর ফলাফলে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এক বছরে ঘুষ লেনদেন হয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এই অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮ শতাংশ এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ০.২৩ শতাংশের সমান।

বাংলাদেশে জমির খতিয়ান তুলতে ঘুষ, বিদ্যুতের সংযোগ নিতে ঘুষ, ব্যবসার অনুমোদন পেতে ঘুষ, চাকরি পেতে ঘুষ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার পেতেও ঘুষ দিতে হয়। যে রাষ্ট্রের নাগরিককে সেবা দেওয়ার কথা, সেই রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সেবাকে অনেক সময় পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো উদ্বেগজনক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। সরকারি অফিসে ঘুষ, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, অর্থপাচার এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ জনমনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, আসলে সমস্যা কোথায়?

অনেকে মনে করে, দুর্নীতির মূল কারণ কিছু অসৎ ব্যক্তি। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা বা রাজনীতিক জন্মগতভাবে দুর্নীতিবাজ হয়ে ওঠেন না। তিনি একটি দুর্বল ব্যবস্থার সুযোগ গ্রহণ করেন। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি থাকে না, যখন আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় না, যখন রাজনৈতিক পরিচয় বিচারকে প্রভাবিত করে, তখন দুর্নীতি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা থেকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।

দুর্নীতি এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি নয়, একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একজন কর্মকর্তা, একজন ব্যবসায়ী, একজন রাজনৈতিক নেতা এবং একটি স্বার্থগোষ্ঠী পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে এমন এক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পদে রূপান্তরিত হওয়ার পথ তৈরি হয়।

বিগত এক দশকে বাংলাদেশ অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সেতু হয়েছে, মহাসড়ক হয়েছে, মেট্রো রেল হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। সেসব ক্ষেত্রেও দুর্নীতি হয়েছে। আর উন্নয়ন হলে দুর্নীতি হবেএটি এ দেশে অস্বাভাবিক কিছু নয় বলেই মনে করা হয়। কিন্তু বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে মোটাদাগে কোনো উন্নয়নই হয়নি বলা যায়। তাহলে এত দুর্নীতির চিত্র কেন?

চাঁদাবাজির বিষয়টিও দুর্নীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও অনেক ক্ষেত্রে চাঁদাবাজির ধরন পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সংস্কৃতি পরিবর্তিত হয় না। পরিবহন, বাজার, নির্মাণ খাত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গায় অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আর এই চিত্র ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে।

অনেকেই মনে করে, কঠোর আইন করলেই দুর্নীতি বন্ধ হবে। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী আইন নতুন নয়। সমস্যাটি আইনের অভাব নয়, সমস্যাটি আইনের প্রয়োগে। বড় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তদন্ত হয়, মামলা হয়, কিন্তু বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, অনেক ক্ষেত্রে ফলাফল অস্পষ্ট থেকে যায়। ফলে অপরাধীরা একটি বার্তা পায়ঝুঁকি কম, লাভ বেশি।

দুর্নীতি কমানোর জন্য প্রথম প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা বলতে শুধু বক্তৃতা নয়, বরং নিজের দলের মানুষ হলেও অপরাধ করলে ব্যবস্থা নেওয়ার মানসিকতা। আইনের চোখে সবাই সমানএই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা না হলে দুর্নীতিবিরোধী কোনো অভিযান দীর্ঘ মেয়াদে সফল হবে না।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যদি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপমুক্ত না থাকে, তাহলে তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে না।

তৃতীয়ত, ডিজিটাল সেবার পরিধি আরো বাড়াতে হবে। যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ কমবে, সেখানে ঘুষের সুযোগও কমবে। ভূমি, কর, লাইসেন্স, সরকারি ক্রয় এবং নাগরিক সেবার পুরো প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বচ্ছ করতে হবে।

চতুর্থত, তথ্য অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক অস্ত্রগুলোর একটি। সাংবাদিকরা যদি ভয়ভীতি বা চাপের মুখে কাজ করেন, তাহলে অনেক অনিয়ম অন্ধকারেই থেকে যাবে।

পঞ্চমত, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনতে হবে। নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সংস্কৃতি যত দিন থাকবে, তত দিন ক্ষমতায় গিয়ে সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রবণতাও থাকবে। ফলে দুর্নীতির চক্র ভাঙা কঠিন হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক সংস্কৃতি। আমরা প্রায়ই দুর্নীতির জন্য শুধু রাজনীতিবিদ বা কর্মকর্তাদের দায়ী করি। কিন্তু অনেক সময় আমরাও নিয়ম ভাঙার জন্য শর্টকাট খুঁজি, তদবির খুঁজি, ঘুষ দিয়ে সুবিধা নিতে চাই। অর্থাৎ দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি সমাজেরও দায়িত্ব।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ সংকট এবং কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জএসবের মধ্যে দুর্নীতি দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। দুর্নীতির কারণে শুধু অর্থের অপচয় হয় না, রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আইনের শাসন দুর্বল হয় এবং বৈষম্য আরো গভীর হয়।

যে রাষ্ট্রে একজন গরিব মানুষ ন্যায়বিচার পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়, যে রাষ্ট্রে যোগ্যতার চেয়ে প্রভাব বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে, যে রাষ্ট্রে ক্ষমতার ছায়া আইনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, সেই রাষ্ট্র কখনো প্রকৃত অর্থে সমতার রাষ্ট্র হতে পারে না।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাই নতুন কোনো স্লোগান নয়, প্রয়োজন দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। প্রয়োজন রাষ্ট্রের আত্মশুদ্ধি। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতা নয়, জবাবদিহি হবে প্রধান শক্তি; পরিচয় নয়, আইন হবে সর্বোচ্চ; আর ব্যক্তিস্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থ হবে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলভিত্তি।

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়