অপরাধের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান বের করা হয় রিপোর্টেড ক্রাইমের ওপর ভিত্তি করে। সরকারি নথিতে লিপিবদ্ধ অপরাধের সংখ্যার সঙ্গে মোট জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে অপরাধের হার নির্ণয় করা হয়। সরকারের কাছে সাধারণত অফিশিয়াল তথা লিপিবদ্ধকৃত তথ্য-উপাত্ত থাকে এবং সরকারি ওয়েবসাইটে এসব রিপোর্ট পাওয়া যায়। সরকার রিপোর্টেড ক্রাইমের ওপর ভিত্তি করেই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা করে থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এ ব্যবস্থা চলমান। তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা পুরোপুরি অপরাধকে মোকাবেলা করতে পারছে না। এর পেছনে অন্যতম মৌলিক কারণ হচ্ছে অপরাধের সঠিক তথ্য সরকারের কাছে নেই। এ কথা মনে রাখতে হবে, নথিভুক্ত অপরাধের বাইরেও অসংখ্য অপরাধের ঘটনা ঘটছে, যেগুলোর যথাযথ হিসাব সরকারের কাছে থাকছে না। ফলে সরকারের অপরাধের বিপরীতে গৃহীত ব্যবস্থা জনমনে সন্তুষ্টি নিয়ে আসতে পারছে না। কাজেই অপরাধকে কঠোর হস্তে দমন করতে চাইলে নন-রিপোর্টেড ক্রাইমকে রিপোর্টেড ক্রাইমের সঙ্গে সংযুক্ত করেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
অপরাধের সঠিক পরিসংখ্যান, তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণের মাধ্যমে অপরাধের ভিন্নতা, অপরাধের ভয়াবহতা, অঞ্চলভিত্তিক অপরাধ, ঋতুভিত্তিক অপরাধ, অপরাধের সময়, অপরাধীর ব্যবহৃত কৌশল, ব্যবহৃত অস্ত্র, মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র সম্পর্কে সহজে জানা সম্ভব হয়। সামগ্রিক বিষয় যথাযথভাবে জেনে অপরাধ প্রতিকারে ও প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তিতে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব। কিন্তু তথ্যের ঘাটতি থাকলে গৃহীত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। সে কারণেই অপরাধবিদরা অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর কৌশল নির্ধারণের পূর্বে অপরাধের পরিসংখ্যানের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে থাকেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অপরাধে ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য জরিপের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থাগুলো বের করে থাকে। সরকার জরিপের বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
বাংলাদেশে সাধারণত বিভিন্ন কারণে থানায় মামলা নথিভুক্ত হয় না। প্রথমত, পুলিশের সঙ্গে পাবলিকের দূরত্ব, অর্থাৎ জনগণ পুলিশকে আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গায় নিতে পারেনি। সংগত কারণেই জনগণ পুলিশকে ভরসায় নিতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কারণে পুলিশ মামলা গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। সরকারের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু পুলিশের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ হয়নি। আবার রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে অনেকেই পুলিশের কাছে মামলা প্রদানে অস্বীকৃতি প্রদান করে। তৃতীয়ত, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে বাদী-বিবাদীর মধ্যে এক ধরনের সমঝোতার ব্যবস্থা করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় এক পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তথাপি দালালদের দৌরাত্ম্য এখনো বিদ্যমান। চতুর্থত, স্থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও কমিউনিটি বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলা করার চেষ্টা করা হয়। এ ছাড়া অসংখ্য কারণে পুলিশের কাছে মামলা নথিভুক্ত হয় না। বিশেষ করে সাম্প্রতিক কালে মবের ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে অনেকেই ভয়ে মামলা করছে না আবার থানাও মামলা গ্রহণ করছে না। আবার এমনও ঘটনা দেখা যায়, পারিবারিক সম্মান ও লোকচক্ষুর ভয়ে অনেকেই নিজের ওপর অত্যাচারের বিষয়টি গোপন রাখছেন।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত দেশে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে রিপোর্ট তৈরি করে থাকে। সেই সঙ্গে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে বিষয়েও তারা সজাগ ও সচেতন থাকে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কর্মীর মাধ্যমে জরিপ পরিচালনা করে থাকে। যেহেতু জাতীয় দৈনিকগুলো গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে থাকে সেহেতু সংবাদগুলোর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কেননা উপযুক্ত উৎস ও তথ্যের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ছাড়া অপরাধের সংবাদ পত্রিকা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ করে না। কাজেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জরিপগুলোকে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। প্রকৃত অর্থে অপরাধের সঠিক পরিসংখ্যান জানার জন্য বেসরকারি সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রকাশিত প্রতিবদনে জানানো হয়, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে মোট ১৩০টি ঘটনায় ১৮৮ জন সাংবাদিক হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার, ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা এবং সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। পর্যবেক্ষণে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে উঠে আসে, মার্চ ও এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে দেশে ২৯৪টি ছিনতাই, ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ এবং ৩,৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও ঢাকা, কুষ্টিয়া ও সিলেটে ঐতিহ্যবাহী মাজার ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাসহ দেশজুড়ে ৬৯ থেকে ৮০টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন হাট-বাজার ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ বদল অব্যাহত রয়েছে।
টিআইবি প্রণিত রিপোর্টকে যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে রিপোর্টের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করে রিপোর্টের সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে। কোনো রকম যাচাই-বাছাই ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। তা ছাড়া বিগত তিন মাসে প্রকাশিত পত্রিকার কপি থেকে সহজেই রিপোর্টের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব। যদি টিআইবি প্রণিত রিপোর্ট সত্য হয়, তাহলে সরকারের কোনো কিছুই লুকানো উচিত হবে না। তা ছাড়া সাধারণ মানুষ পূর্বের যেকোনো সময়ের তুলনায় সচেতন ও সমসাময়িক বিষয় সম্পর্কে অবগত। আমরা সবাই জানি রিপোর্টেড ক্রাইমের সংখ্যা কখনোই প্রকৃত অপরাধের সংখ্যাকে তুলে নিয়ে আসতে পারে না। নথির বাইরে থাকা অপরাধের সংখ্যাকে বিবেচনায় নিলেই সরকার অপরাধ প্রতিকার ও প্রতিরোধে যথার্থ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার উদ্যোগ নিতে পারবে। অন্যথায় গৃহীত সব ব্যবস্থাই মুখ থুবড়ে পড়বে।
আমেরিকায় ন্যাশনাল ক্রাইম ভিক্টিমাইজেশন সার্ভে নামে একটি জরিপ দেশব্যাপী পরিচালনা করা হয়, যেখানে সব রকমের অপরাধে আক্রান্তদের তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করা থাকে, যার ভিত্তিতে আমেরিকার সরকার তাদের নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সহজেই কৌশল নির্ধারণ করতে পারে। বাংলাদেশে যেহেতু এ ধরনের কোনো জরিপ পরিচালনা করা হয় না সেহেতু বিশ্বাসযোগ্য এবং দীর্ঘদিন ধরে সুনির্দিষ্ট সেক্টরে কাজ করছে এমন প্রতিষ্ঠানের দালিলিক পরিসংখ্যানকে বিবেচনায় নিয়ে সরকারের নীতি প্রণয়ন করা উচিত।
কাজেই সরকারের মৌলিক কাজ হবে অপরাধের সঠিক তথ্য-উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণে একটি কার্যকর ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা। এ ইউনিটের কাজ হবে বাংলাদেশের সর্বত্র ঘটে যাওয়া সব অপরাধের খবরাখবর সংগ্রহ করা। বিশেষ করে জাতীয় দৈনিক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে থানায় রুজু হওয়া অপরাধের বাইরে ঘটে যাওয়া অপরাধের তথ্য হালনাগাদ করা। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সোর্স নিয়োগের মাধ্যমে অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করা। আমরা সবাই জানি তথ্যই শক্তি, তথ্যই নির্দেশনা প্রদান করে থাকে। অপরাধসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব থাকায় সরকারের গ্রহণ করা পদক্ষেপ তেমন কাজে আসে না। সে কারণেই রিপোর্টেড ও নন-রিপোর্টেড ক্রাইমের সঠিক উপাত্তই সরকারকে অপরাধের বিপরীতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়




অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, যেকোনো তফসিলি ব্যাংক ছেঁড়া, ফাটা ও ময়লাযুক্ত নোট পরিবর্তন করে নতুন বা উপযোগী নোট দিতে বাধ্য। বিশেষ করে পাঁচ, ১০, ২০ ও ৫০ টাকার ছোট নোট বিনিময়ের জন্য প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ কাউন্টার চালু রয়েছে। কিন্তু সেই সুফল লাভ মোটেই সহজলভ্য নয়। নিয়ম থাকলেও ব্যাংকগুলো এটি মানতেই চায় না। উল্টো আরো বিব্রত হতে হয়। অভিযোগ করেও তেমন একটা ফল হয় না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা শুধু বিভিন্ন ব্যাংক শাখার দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেতেই দেখা যায়। কিন্তু নির্দেশনাটুকু মানতে দেখা যায় না। ছেঁড়া-ফাটা, ত্রুটিপূর্ণ ও ময়লাযুক্ত নোট গ্রহণ এবং তার বিনিময় মূল্য প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। বলা হয়েছে, বিনিময় মূল্য প্রদানে অনীহা প্রকাশ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, 
দুর্নীতি হচ্ছে মূলত মাঠ পর্যায়ে। সরকার বদলালেও কাঠামো বরাবরই একই রকম ছিল। দুর্নীতি, ঘুষ কিংবা অবৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের অপরাধে শাস্তির উদাহরণ না থাকায় তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে। তবে দেশের অনেকেই আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কোনো দুর্নীতি হবে না। সব অফিশিয়াল কাজকর্ম নিয়ম অনুযায়ী হবে। ঘুষ, দুর্নীতির কোনো চিহ্ন দেখা যাবে না। দেশে কোনো বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু বাস্তবে সব উল্টো হয়েছে। বৈষম্য বেড়েছে, দুর্নীতি বেড়েছে। কিছুদিন আগে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও বলেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি হয়েছে। অবশ্য তিনি নিজেও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। টিআইবির প্রতিবেদনে তেমনটাই প্রমাণিত হয়েছে, যেমনটা এনসিপির আহ্বায়ক বলেছিলেন।