জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।’ এই মূল্যায়ন জীবনানন্দ দাশের, সবার নয়। এই মূল্যায়নের সঙ্গে অনেকে একমত পোষণ করেছেন, সবাই নয়। এই মতের বিপরীত মতের কাব্যদর্শন হাজির করেছেন আল মাহমুদ। তাঁর ভাষ্যে বোঝা যায়, মানুষমাত্রই কবি। তাঁর এই লেখার বিশ্লেষণ হয়তো জীবনানন্দ দাশের মতকে বাতিল করা কিংবা সেই মতের যুক্তি বিচার করার জন্য লিখিত নয়। আল মাহমদু যে সূত্রে সব মানুষকে কবি বলতে চেয়েছেন, তার একটি নাতিদীর্ঘ বয়ান পাওয়া যায় তাঁর ‘কবির কররেখা’ গ্রন্থে। এই গ্রন্থে কাব্য তথা কবি আলোচনায় কবিতা সম্পর্কে যে বিশ্লেষণ কবি আল মাহমুদ রেখে গেছেন তা পাঠকমাত্রকে ভাবনার নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে পারে।
আল মাহমুদ ‘কবিতা এমন’ কবিতা লিখেছেন—‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা অক্তার।’ এক চরণে তিনি কবিতার যে সংজ্ঞায়ন করেছেন তা কাব্যিক ভাষারই স্বরূপ। আল মাহমুদ কবিতার বিশ্লেষণে-সংজ্ঞায়নে যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে কবিতার নিজস্ব কোনো কাঠামো নেই। তিনি ‘কবির কররেখা’ গ্রন্থের শুরুতে কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আদম-হাওয়ার সৃষ্টিবিষয়ক কাহিনি তুলে ধরেছেন। আল মাহমুদের ভাষায়, ‘আদম ও ঈভ পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের শ্রম, ঘাম ও দুর্ভাগ্যের উপার্জনের শস্য আহরণ করে পৃথিবীতে বাস করতে শুরু করলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ফেলে আসা স্বর্গের স্বপ্ন সুপ্ত হয়ে থাকল। এই স্বপ্ন তাঁদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যেও সঞ্চারিত থাকল। মানুষমাত্রই স্বপ্ন দেখে, সে আবার স্বর্গোদ্যানে ফিরে যাবে। এই স্বপ্নের নামই হলো কবিতা।’
আল মাহমুদ যেকোনো কবিতার বিশ্লেষণকে শুধু নিরুৎসাহই করেননি, বরং অর্থহীন বলেও উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি অবশ্য কবিতার সমালোচনায় অবিশ্বাসী মানুষ। আমি মনে করি, কাব্যের কোনো ক্রিটিক থাকবে না। শুধু অ্যাপ্রিসিয়েশন বা সমর্থন থাকতে পারে। কিন্তু ক্রিটিক কদাপি নয়।’ কবির এই অভিমত অনুসারী হলে কবিতার বিশ্লেষণ থাকে না। তবু কবিতার বিশ্লেষণ হয়। পাঠ্যপুস্তকে কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা, কবিতা পড়ানো—এগুলোকেও কবি বিশেষ ইতিবাচকার্থে গ্রহণ করেননি। তার পরও কবির এই অভিমতবিরোধী অবস্থান নিয়ে অপরাপর কবির মতো তাঁরও কবিতার বিশ্লেষণ আছে, থাকবে।
আল মাহমুদের সত্তার দ্বিবিধ রূপ রয়েছে। একাংশ শাস্ত্রীয় বোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। জীবনের প্রথমাংশে তাঁর কাব্যে শাস্ত্রের প্রভাব ছিল না। এটি তাঁর জীবনের প্রথম পর্ব। দ্বিতীয় পর্বে তিনি শাস্ত্রীয় বোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর এই রূপান্তরবিষয়ক একটি কবিতা ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’।
‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতা। এই কবিতাটিকে একটি বিশেষ কবিতা বলেই মনে হয়। বিশেষত আল মাহমুদ কারাবাসে থাকাকালে তাঁর চিন্তার রূপান্তর ঘটে। এই কবিতার বিষয়ভূমিতে এমন কিছু অনুষঙ্গ কবি রেখে গেছেন, যার মাধ্যমে কবির রূপান্তরের সূত্র সন্ধান করা যায়।
কবিতাটির বিষয় নিয়ে শুরুতে কথা বলা যাক। এই কবিতার বিষয়ভূমি স্বপ্নজনিত ঘটনার পরম্পরা। মানুষ সাধারণত আক্ষরিকভাবে বাস্তবসম্মত ঘটনা স্বপ্নে দেখে না। কবি নিজেও এখানে স্বপ্নকে পুরোপুরি বাস্তবসম্মত কাহিনিরূপে উপস্থাপন করেননি।
কবিতার বিষয় এ রকম—তিনি কারাবাসে আছেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন, তাঁর ঘুম ভেঙে গেছে। ঘুম ভেঙে গেলে তিনি দেখতে পান, সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ বুকের ওপর নিয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। স্বপ্নে দেখতে পান, তিনি এক বিশাল ধ্বংসস্তূপে আছেন। সেখানে আশপাশে আর কাউকে তিনি দেখতে পেলেন না। কবিতার শুরুর অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি—‘পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি বুকের ওপর রেখে/আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হয় এ ছিল সত্যিকার ঘুম/কিংবা দুপুরে খাওয়ার পর ভাতের দুলুনি। আর ঠিক তখুনি/সেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠলো, যার ফাঁক দিয়ে/যে দৃশ্যই চোখে পড়ে, তোমরা বলো, স্বপ্ন।’
স্বপ্নলোকে তিনি যা দেখেছেন, সেই আবহ একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প পরবর্তী অবস্থা। একটি কামান দাঁড়িয়ে আছে। আদালতের অবস্থাও শোচনীয়। কারাগার ভূমির সঙ্গে মিশে গেছে। তিনি তাঁর বাড়িরও খবর নিয়ে দেখেন, কেউ বেঁচে নেই। আবহটা যেন কিয়ামতের মতো।
আল মাহমুদ লিখেছেন, ‘ইটের নিচে চাপাপড়া আমার কক্ষের দিকে চোখ পড়তেই/দেখলাম, সুটকেস, পোশাক-আশাক বইপত্র/সবকিছু ঢাকা পড়ে আছে। কোনো কিছুই উদ্ধারের আশা নেই।/আমি শুধু বিছানার ওপর পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থটি দেখলাম—/কোরান, খোলা, বাতাসে পবিত্র পৃষ্ঠাগুলো নড়ছে।/আমি জনমানবহীন বিরান নগরীর পরিত্যক্ত পাথরে/আল্লাহর আদেশ পরিত্যাগ করতে পারি না। আমি/ধ্বসংস্তূপের ওপর থেকে সেই মহাগ্রন্থের কাছে নেমে এলাম।’
‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কবিতাটি সুগঠিত কাহিনির ওপর দণ্ডায়মান নয়। আবার এই কবিতায় কোনো কাহিনি নেই এমনও নয়। ভাব-বস্তু-কাহিনির অনন্য রসায়ন হয়ে উঠেছে কবিতাটি। কবিতাটির নির্মিতি কিছুটা স্বতন্ত্র। বাস্তব-স্বপ্ন-কবির চিন্তাজগতের পরিবর্তনসূত্র—সবকিছু এক হয়ে যাওয়া বিষয়ের উপস্থাপনকৌশলও বিষয়ানুগ হয়েছে। কোনো বক্তব্যকে দৃঢ়তার সঙ্গে উপস্থাপন না করে সেই বক্তব্য কবিতাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। কবিতাকে কেউ যদি শুধু একটি স্বপ্ন হিসেবে দেখতে চান, তাতেও ভুল হতো না যদি তাঁর জীবনদর্শনে পরিবর্তন না আসত। এই কবিতার নির্মিতি অর্থাৎ শিল্পমান পাঠকভেদে ভিন্ন ভিন্ন হবে। কবিতার ক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কবির ভাবকাঠামো যে শব্দগত রূপ পেয়েছে, তার আঙ্গিকগঠন কবিতাশিল্পের অনন্যতাস্পর্শী।
কবি আল মাহমুদ মনে করেন, কবিতার প্রাসঙ্গিকতা সব সময় এক না-ও হতে পারে। তাঁর এই মন্তব্য তাঁর কবিতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ‘কবির কররেখা’ গ্রন্থে তিনি এই বিষয়ের ওপরও আলোকপাত করেছেন। সেখানে সংস্কৃত সাহিত্যের আলোচনাও আছে। কাব্যের প্রাসঙ্গিকতা সব সময় বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। এ কবিতার প্রাসঙ্গিকতা দূরবিস্তৃত হবে। কবিতাটির সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ বিযুক্ত; তাই কবিতার শিল্পবিচার ছাড়াও এক শ্রেণির পাঠকের কাছে এর মর্যাদা অটুট থাকতে পারে। তবে আল মাহমুদের কবিতায় বিষয়গত কবিদর্শন বদলে যে শাস্ত্রীয় আবহ লাভ করেছে, এই উদ্ভাসন কারো কাছে ইতিবাচক, কারো কাছে নেতিবাচক। সময়ান্তরে কবির বদলে যাওয়ার মূল্যায়ন বদলাতে থাকবে।
কবি আল মাহমুদের ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ কবিতার উপজীব্য, নির্মাণশৈলী, প্রসঙ্গিকতা তাঁর কাব্যদর্শনের বাইরেও মূল্যায়িত হচ্ছে, হবে। কবিতাটি তাঁর বাঁক পরিবর্তনের দলিল হিসেবে বিবেচ্য। একক কবিতা হিসেবে এটি গভীরতা ও বহুমাত্রিকতায় সমৃদ্ধ।
কবির জন্মস্মরণে এই ভাষিক নিবেদন।
আল মাহমুদ। জন্ম : ১১ জুলাই ১৯৩৬। মৃত্যু : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯



ওই সময়টাকে আমরা বলতাম ‘জোয়ারের দিন’। বর্ষা শুরুর কাল। এখন আর রোদের মুখ দেখা যাবে না। মেঘের ছায়ায় ভরে থাকবে দিনগুলো। মাছদের প্রজননকাল। কত মাছ তখন! খাল-বিল ভরা মাছ। পুকুর-ডোবা ভরা মাছ। জোয়ারের জলের সঙ্গে শুরু হয়েছে মাছদের উচ্ছ্বাস-আনন্দ। পুঁটি মাছের শরীরের দুই পাশে লাল রেখা পড়েছে। আমরা বলতাম, পুঁটি মাছ শাড়ি পরেছে। পেট ভর্তি ডিম একেকটা মাছের। গ্রামের মানুষ মাছ ধরায় মেতে উঠেছে। ধান-পাটের ক্ষেতে গোড়ালি ডুবে যাওয়া জল। আনন্দে মাতোয়ারা মাছ। খাল-বিল, পুকুর-ডোবা ছেড়ে ধান-পাটের ক্ষেতে উঠে যাচ্ছে কেলি করতে। টেঁটা দিয়ে সেই মাছ মারছে গ্রামের মানুষ। পুকুর উপচানো জল নালা বেয়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। হাজামবাড়ির ছেলে রব আর হাফিজুদ্দি আমার বন্ধু। ওদের সঙ্গে গিয়ে ভেসালের মতো করে ছোট জাল পেতেছি মিয়াদের জোড়া হিজলগাছের তলায়। সেখানে হাত দুয়েক চওড়া একটা নালা। আমিনুল মামাদের পুকুর থেকে এই নালা বেয়ে জলস্রোত নেমে যাচ্ছে মাঠের দিকে। পাঁচ-সাত মিনিট পর পর রব-হাফিজুদ্দির সঙ্গে জাল তুলছি। ছোট ছোট কত মাছ! পুঁটি ট্যাংরা, বেলে পাবদা, খলিশা টাকি, কই শিং, টাটকিনি আর ভেদা মাছ। বাইন মাছের বাচ্চা, রুই, মৃগেল আর কাতল মাছের বাচ্চা আছে। শোল গজার আর বোয়াল মাছের বাচ্চা আছে, ফলি মাছ আছে। মাছের অন্ত নেই। মাছ রাখার বেতের তৈরি পাত্রটিকে বলি ‘ডুলা’। ঘণ্টা কাবার হতে পারে না, ডুলা ভরে যায় মাছে। এক ডুলা নিয়ে যায় রব, এক ডুলা আমি, আরেক ডুলা হাফিজুদ্দি। বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের অবস্থা হয়েছে ঝোড়ো কাকের মতো। কে ওসব খেয়াল করে! মাছের নেশায় মাতাল হয়ে আছি।