জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় ঘূর্ণিঝড়, অতিভারি বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়ছে। এসব দুর্যোগে মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় আগাম সতর্কতা ও নির্ভুল আবহাওয়া পূর্বাভাস প্রয়োজন। নির্ভুল আবহাওয়া পূর্বাভাসে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার যেখানে আধুনিক রাডার নেটওয়ার্ক, ঘন ঘন পূর্বাভাস এবং উন্নত পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, সেখানে সারা দেশে পাঁচটি রাডার থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে চারটি বন্ধ রয়েছে। এতে পূর্বাভাসে প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, একসময় আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে ছিল। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় এবং ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ও নির্ভুল পূর্বাভাস দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের গতি কমে যাওয়ায় সেই সক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে ঘুর্ণিঝড়, বজ্রপাত ও অতিবৃষ্টিতে তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে রাডার নেটওয়ার্কের আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরি, আধুনিক পূর্বাভাস প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালে কক্সবাজারে দেশের প্রথম আবহাওয়া রাডার স্থাপন করা হয়েছিল। এরপর ১৯৮৮ সালে আগারগাঁওয়ে দ্বিতীয় রাডার স্থাপন করা হয়েছিল। পরে রংপুর, মৌলভীবাজার ও পটুয়াখালীর খেপুপাড়াসহ মোট পাঁচ রাডার স্থাপন করা হয়। রংপুরের রাডার ছাড়া বাকি সব রাডার অচল হয়ে পড়ে আছে। রংপুরের রাডারটিও দুই বছর পর গত ১১ জুলাই সচল করা হয়েছে। গত ৪ জুলাই থেকে ঢাকার রাডার, তিন বছর ধরে কক্সবাজারের রাডার, চার বছর ধরে মৌলভীবাজারের রাডার এবং আট বছর ধরে পটুয়াখালীর খেপুপাড়ার রাডার বন্ধ হয়ে অচল অবস্থায় আছে। যান্ত্রিক ত্রুটি, যন্ত্রাংশের সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এসব রাডার দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে আছে।
বর্তমানে আবহাওয়া অধিদপ্তরের একটি মাত্র রাডার সচল রয়েছে। ফলে বজ্রঝড়, ভারি বৃষ্টিপাত কিংবা স্থানীয় আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া ৫৯টি প্রথম শ্রেণির সিনথেটিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া দৈনিক দুইবার আবহাওয়া পূর্বাভাস, চারটি অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর সতর্কতা, সামুদ্রিক সতর্কতা, দুর্যোগকালীন সময়ে বিশেষ আবহাওয়া বুলেটিন দিয়ে থাকে।
ভারতের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের তথ্যমতে, ভারতজুড়ে বর্তমানে ৪৮টি আধুনিক ডপলার আবহাওয়া রাডার সচল রয়েছে। নিজস্ব প্রযুক্তিতে আরো ২০টি রাডার স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া তাদের নিজস্ব আবহাওয়া মডেল ও স্যাটেলাইট রয়েছে। সাধারণ সময়ে প্রতিদিন চারবার জাতীয় আবহাওয়া বুলেটিন প্রকাশ করা হয়। ঘূর্ণিঝড়, ভারি বর্ষণ বা অন্য কোনো দুর্যোগ পরিস্থিতিতে প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর তাৎক্ষণিক পূর্বাভাস ও হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করে থাকে। এ ছাড়া ভারতীয় বিমানবাহিনী দেশজুড়ে ৮২টি স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপন করেছে। যেগুলোর মাধ্যমে সারা দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করা হয়। তবে আঞ্চলিক সক্ষমতায় নিজেদের সবার পেছনে মানতে নারাজ আবহাওয়াবিদ এস এম কামরুল হাসান। তাঁর মতে, ভারত সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেও এরপরে বাংলাদেশের অবস্থান। বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় আধুনিক মডেলের ব্যবহারের অনেকটা এগিয়ে গেছে। তবে যান্ত্রিক ত্রুটিতে রাডার অচল হয়ে পড়ায় কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১০ সালের পর থেকে আমরা অনেকটা এগিয়ে গিয়েছি। পূর্বে দুই দিন আগে দিলেও এখন পাঁচ দিন আগে আবহাওয়া পূর্বাভাস দিয়ে থাকি। সক্ষমতার কোনো ঘাটতি নেই, তবে লোকবলসংকটে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক সমরেন্দ্র কর্মকার কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রযুক্তির দিক থেকে প্রতিবেশী দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে বর্তমানে অনেক এগিয়ে গেছে। রাডার অচলাবস্থা আর দক্ষ জনবলসংকটে দক্ষিণ এশিয়ায় আবহাওয়া ব্যবস্থাপনায় অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। নিখুঁত পূর্বাভাসের জন্য রাডার প্রযুক্তিরও কোনো বিকল্প নেই। পূর্বাভাস আরো সুনির্দিষ্ট করার জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং দক্ষ জনবল তৈরি করা দরকার।