আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি আগামী ডিসেম্বরে সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুমোদিত ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি আর আগের কাঠামোয় এগোচ্ছে না।
বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও নতুন সংস্কার অগ্রাধিকার বিবেচনায় বাংলাদেশ ছয় থেকে সাড়ে ছয় বিলিয়ন ডলারের নতুন একটি ঋণ কর্মসূচির প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে আগের কর্মসূচির কয়েকটি কঠোর শর্ত বাস্তবায়নে নমনীয়তা চেয়েছে সরকার।
গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই ঢাকায় অবস্থান করে আইএমএফের প্রতিনিধিদল সরকারের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শেষ করেছে। আগামী নভেম্বরে সংস্থাটির উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল আবার ঢাকায় এসে চূড়ান্ত আলোচনা করবে। এরপর ডিসেম্বরেই নতুন ঋণ কর্মসূচির চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আইএমএফের প্রতিনিধিদল সফরকালে অর্থ বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে।
পাঁচ বিষয়ে আইএমএফের কড়া বার্তা : ঢাকা ছাড়ার আগে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে পাঁচটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, রাজস্ব আয় বাড়ানো, সরকারের উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট দ্রুত সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে। আইএমএফের মতে, প্রবাস আয় ইতিবাচক থাকলেও বৈদেশিক খাত পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
সংস্কার না হলে প্রবৃদ্ধিতে বড় ধাক্কা : আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন, ভর্তুকি সংস্কার এবং আর্থিক খাতের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু একটি পূর্বাভাস নয়, বরং নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের অকার্যকারিতা এবং বৈদেশিক খাতের চাপ একসঙ্গে অর্থনীতির গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে : আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে বাজেট নীতি, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, রাজস্ব সংস্কার, খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল, আর্থিক খাতের সংস্কার, বাজেট ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণ, নতুন পে স্কেল, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সুশাসন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নতুন কর্মসূচিতে আগের মতো একসঙ্গে অনেক শর্ত বাস্তবায়নের পরিবর্তে বাস্তবতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে সরকার জোর দিয়েছে। আইএমএফও সরকারের এই অবস্থান বিবেচনায় নিয়েছে এবং পরবর্তী আলোচনায় বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
অক্টোবরে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক : অর্থবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অক্টোবরে থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে বাংলাদেশের নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হবে। সেখানে কর্মসূচির কাঠামো, অর্থায়নের পরিমাণ, সংস্কারের সময়সূচি এবং অর্থ ছাড়ের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হবে।
নির্বাচিত সরকারের অগ্রাধিকারেই হবে সংস্কার : আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘নির্বাচিত সরকারের প্রতি সম্মান রেখেই সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ধাপে ধাপে পরিবর্তন আনা হবে। যখন যেটা প্রয়োজন হবে, তখন সেটাই করা হবে।’ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের এই অবস্থান আইএমএফকেও জানানো হয়েছে।
বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ—ড. ওয়ারেসুল করিম : নতুন আইএমএফ ঋণ কর্মসূচি প্রসঙ্গে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বিজনেস স্কুলের ডিন ড. ওয়ারেসুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন ঋণ চুক্তির চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সংস্কারের বাস্তবায়ন। রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ কমানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো—এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় নতুন ঋণ কর্মসূচিও কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনবে না।’