জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না।’
গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে রাওয়া কনভেনশন সেন্টারে ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট— ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্পিকার বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের মুখে যখন জাতি দিশাহারা ও অবদমিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখনই ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সাহসের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট যদি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করত, তাহলে এই দেশ এখনো পাকিস্তান থাকত।’
মুক্তিযুদ্ধ কোনো ‘রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ নয়, বাঙালির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করে বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ব্যাটালিয়ন আলাদাভাবে বিদ্রোহ করে জনগণকে সংগঠিত করেছিল। সেনাবাহিনীতে যোগদান, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে আসা, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এবং নিজের সেনাজীবনের বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন।
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিতে উৎসাহিত করার জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি স্বাধীনতার মহান ঘোষক, এ দেশের মহান রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে, যিনি আমাকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদানের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। তাঁর কথাতেই আমি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছি, অন্যদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে।’
১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে স্পিকার বলেন, সেটি হয়েছিল ছয় দফার ভিত্তিতে। তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পদ ও সুযোগের সমবণ্টন ছিল না। সেই বৈষম্য নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ক্ষুব্ধ ছিল।
তিনি বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তান চারটি প্রদেশকে যেভাবে তত্ত্বাবধান করে, যেভাবে সমৃদ্ধ করে, সে তুলনায় পূর্ব পাকিস্তান ছিল অবহেলিত। পূর্ব পাকিস্তানে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় না।’
স্পিকার বলেন, “তখনকার আন্দোলনটির নাম ছিল ‘সাম্যের আন্দোলন’। দুটি অঞ্চলের মধ্যে সমতা ছিল না। সম্পদের সমবণ্টন ছিল না। এ জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্ষুব্ধ ছিল। এটিকে সম্বল করে আওয়ামী লীগ তৎকালীন নির্বাচনে জিতেছিল।”
শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে স্পিকার বলেন, ‘এমনকি ২৫ মার্চ পাকিস্তান আর্মি নিরীহ বাঙালিদের ওপরে যখন ক্র্যাকডাউন করল, অব্যবহিত পূর্বে প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেব, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়েছেন। গিয়ে বলেছেন যে পাকিস্তানিরা আক্রমণ করতে যাচ্ছে। দেশের মানুষ স্বাধীনতা চায়, এখনো সময় আছে, আপনি স্বাধীনতা ঘোষণা করুন। শেখ মুজিবুর সাহেব বললেন যে না, আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারি না। পাকিস্তান ভাঙাতে আমার কোনো অবদান থাকুক, এটি আমি চাই না। সুতরাং স্বাধীনতার ঘোষণা আমি দিব না। স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। পাকিস্তান ক্র্যাকডাউন চালাল। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে উদভ্রান্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। পাকিস্তানি বাহিনী মেশিনগান, মর্টার, কামান দিয়ে নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যা করছে।’
এ সময় যেকোনো জাতি অবদমিত হয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারত মন্তব্য করে হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘সেই মুহূর্তে জনগণের জীবন এবং নারীদের সম্ভ্রম রক্ষায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এই সময় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন মেজর জিয়াউর রহমান। এটি হলো প্রকৃত সত্য। যে ঘোষণায় জাতি উদ্দীপ্ত হয়েছে, অনুপ্রাণিত হয়েছে। হাজার হাজার ছাত্র-যুবক ঘরবাড়ি ছেড়ে দৌড়ে এসেছে যে যুদ্ধ করবে।’
মুক্তিযুদ্ধকে কোনো রাজনৈতিক দলের যুদ্ধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই মন্তব্য করে স্পিকার বলেন, এটি ছিল জনতার যুদ্ধ। তিনি বলেন, ‘১৯৭১ যারা দেখে নাই, তারা দুর্ভাগা। আমরা ভাগ্যবান, ১৯৭১ সাল দেখতে পেয়েছি। আমাদের তো মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন ছিল। চার হাজার সৈনিক। মুক্তিবাহিনী ছিল প্রায় লাখের মতো। ছাত্র, শিক্ষক, রিকশাচালক, দোকানদার, বাসের চালক, সহকারী, পিয়নসহ সব পেশার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। কিন্তু এই কথা ইতিহাসে নাই।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমদ আযম খান বলেন, দেশের সমৃদ্ধি ও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে একাত্তরে যাদের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, তাদের অকপটে সেই দায় স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশটাকে এগিয়ে নিতে চাই, সমৃদ্ধ করতে চাই। যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের এগিয়ে আসতে হবে। তাঁরা এই বিষয়টিকে অকপটে স্বীকার করে ক্ষমা না চাইলে পুরো জাতি ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া কষ্টকর। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে তাঁদের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ও গণতন্ত্রকে ধারণ করতে হবে।’
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীকে আরো শক্তিশালী ও পেশাদার করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েই বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করতে চাই। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজন ভুলে দেশ গড়ার স্বার্থে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে আসতে হবে।’
অনুষ্ঠানে রাওয়া ক্লাবের চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) আব্দুল হকের সভাপতিত্বে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার ও সদস্যরা বক্তব্য দেন।