হামে আক্রান্ত শিশু কোলে মা। গতকাল বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ
ব্যাগ টানতেই রিকশা থেকে পড়ে যান, বাঁচানো গেল না সোহেলিকে
মার কোলে হামে আক্রান্ত শিশু

ডা. দিপ্রার ‘রহস্যজনক’ মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ বলছেন সহপাঠীরা
সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে এফসিপিএসে অধ্যয়নরত নাফিসা তাবাসসুম দিপ্রার ‘রহস্যজনক’ মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ দাবি করে শ্বশুরবাড়ির পরিবারের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন দিপ্রার সহপাঠী, সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা।
গত ৪ জুন শ্বশুরবাড়িতে ডা. দিপ্রার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাঁকে শাহবাগের ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি করান। ওই দিন সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জানা গেছে, এই হাসপাতালেই চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত আছেন ডা. দিপ্রার শ্বশুর ডা. এম এ রশিদ।
মৃত্যুর কারণ হিসেবে ডা. দিপ্রার শ্বশুর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছিলেন, ডা. দিপ্রার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তবে ডা. দিপ্রার শ্বশুরের এই দাবি অস্বীকার করেছেন দিপ্রার সহপাঠী ও স্বজনরা। তাঁরা বলছেন, শাশুড়ির সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে দিপ্রার স্বামী ডা. সিয়াম দিপ্রাকে মৃত্যুর আগের তিন দিন ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখেন। এরপর ডা. সিয়াম দিপ্রার বাবা-মাকে ডাকলে দিপ্রার মা মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যান। শশুরবাড়িতে গেলে দিপ্রা ভাত খেতে চান। ওই সময় অভুক্ত দিপ্রা হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন। অসুস্থ দিপ্রাকে তখন রাজধানীর ধানমণ্ডির বাসার কাছের কোনো হাসপাতালে না নিয়ে শ্বশুরের কর্মস্থল শাহবাগের ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। ভর্তি করার পর সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
জানা গেছে, একাধিক সহপাঠী ও বোনকে মৃত্যুর আগে মারধরের আঘাতের চিহ্নসহ ছবি পাঠিয়েছিলেন ডা. দিপ্রা। তাঁর আমেরিকাপ্রবাসী বান্ধবী ডা. ফাবিহা তানজিমকে বলেছিলেন, দিপ্রার শাশুড়ি ও দুই ননদ মিলে মানসিক নিপীড়ন করছেন এবং স্বামী ডা. সিয়াম তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করছেন।
সহকর্মীদের দাবি, দিপ্রা শ্বশুরবাড়িতে নিয়ত নির্যাতনের শিকার হতেন। সন্তান প্রসব-পরবর্তী মানসিক সমস্যায় ডাক্তারের পরামর্শে মানসিক চিকিৎসাও নিচ্ছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যায়ে শশুরবাড়ির লোকজন টাকা না দেওয়ায় চিকিৎসার পর্ব শেষ করতে পারেননি। এসংক্রান্ত মারধরের ছবি ও মানসিক নির্যাতনের তথ্য কালের কণ্ঠের কাছে সংরক্ষিত আছে।
এ বিষয়ে ডা. দিপ্রার বাবা আলাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার মেয়েজামাই ফোন করে জানায়, দিপ্রা কয়েক দিন ধরে খাওয়া-দাওয়া করছে না। এ জন্য আমাদের তাদের বাসায় যেতে বলে, আমার কাজ থাকায় যেতে পারিনি। দিপ্রার মা গেলে মায়ের কাছে দিপ্রা খেতে চায়। ওই সময় কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয় তার। পরে হাসপাতালে সে মারা যায়।’
এ ঘটনায় মামলা করেননি কেন—প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার নাতির বয়স দুই বছর, এর মধ্যে ওর মা মারা গেল। এখন মামলা করলে সেটা কোনদিকে যাবে, তাকে লালন-পালনের বিষয় আছে, কী করব এখন, সব মিলিয়ে আমরা কিছু করছি না।’
এদিকে এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বারডেম হাসপাতালের সামনে ডা. দিপ্রার মরদেহের ময়নাতদন্ত করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিতের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন দিপ্রার সাবেক সহপাঠী ও পরিবারের একাধিক সদস্য।
মানববন্ধনে উপস্থিত ডা. দিপ্রার বোন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডা. দিপ্রার মা অসুস্থ হওয়ায় এবং শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্যরা ক্ষমতাশালী হওয়ায় আইনগত পদক্ষেপ নিতে ভয় পাচ্ছেন।’
আরেক সহকর্মী সাফিয়া বিনতে আহমেদ অভিযোগ করেন, দিপ্রার মৃত্যুর পর তাঁর ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলা হয়েছে। এতে সম্ভাব্য বিভিন্ন তথ্য ও যোগাযোগের রেকর্ড হারিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
তিনি বলেন, দিপ্রার মরদেহ দ্রুত দাফন করা হয় এবং পরিবারের সবাইকে শেষবারের মতো তাঁর মুখ দেখতে দেওয়া হয়নি।
সাফিয়া দাবি করেন, দিপ্রাকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় তাঁর শ্বশুর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্য বিষয় নিয়ে পোস্ট করেছিলেন। পরে দিপ্রার মৃত্যুর পর দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে ডা. এম এ রশিদ দিপ্রাকে নিজের ‘তৃতীয় কন্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ফেসবুক থেকে উধাও ডা. দিপ্রার পোস্ট : নিজের ও শিশু সন্তানের প্রতি অবহেলা, মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন নিয়ে ফেসবুকের ‘ফিমেল ডক্টরস ইন বাংলাদেশ’ পেজে নিজের নাম উহ্য রেখে পোস্ট দিয়েছিলেন ডা. দিপ্রা। দিপ্রার মৃত্যুর পর ফেসবুক পোস্টটি যে তাঁরই ছিল সেটা অ্যাডমিন প্যানেল থেকে স্ক্রিনশর্ট দিয়ে নিশ্চিত করা হয়।
কিন্তু ফেসবুক থেকে পোস্টটি পরে সরিয়ে দিলে অভিযোগ ওঠে—ডা. দিপ্রার ননদ শাবনাজ রশিদ দিয়া প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দিতে চাইছেন। শাবনাজ রশিদ দিয়া ফেসবুকের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের প্রধান হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তবে এ বিষয়ে জানতে শাবনাজ রশিদকে কালের কণ্ঠ থেকে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠানো হয়। কিন্তু তিনি কোনো জবাব দেননি।
মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও ডা. দিপ্রার শ্বশুর ডা. এম এ রশিদের কাছ থেকে সাড়া মেলেনি। তাঁর কর্মস্থল ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল ও যশোরের ‘আমাদের বাড়ি’ নামের চিকিৎসাকেন্দ্রেও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
‘আমাদের বাড়ি’ চিকিৎসাকেন্দ্রে তাঁর সহকারীকে ফোন দিলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ছেলের বউয়ের মৃত্যুর পর থেকে তিনি ছুটিতে আছেন, কারো সঙ্গে কথা বলছেন না।
ডা. দিপ্রা ২০১১-১২ সেশনে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়ে এমবিবিএস পাস করেন। পরে ২০১৮ সাল থেকে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত হন। ২০২০ সালে তিনি তাঁর সহপাঠী রহমত রশিদ সিয়ামকে বিয়ে করেন। ২০২৪ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে এফসিপিএসে ভর্তি হয়ে প্রথম পার্ট পাস করে দ্বিতীয় পার্টের পরীক্ষার অপেক্ষায় ছিলেন।
বেনাপোল দিয়ে এলেন ভারতের নতুন হাইকমিশনার
একই আকাশ, একই বাতাস, একই জলতরঙ্গ মিলেমিশে কাজ করব

‘একই আকাশ, একই বাতাস, একই জলতরঙ্গ—আমরা মিলেমিশে কাজ করব। শুধু অভিন্ন সীমান্ত নয়, আমাদের অভিন্ন স্বপ্নও আছে।’ বাংলাদেশে পা রেখে এভাবেই দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদের বার্তা দিলেন বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।
গতকাল শুক্রবার সকালে বেনাপোল-পেট্রাপোল চেকপোস্ট দিয়ে সড়কপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তিনি। ওই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী মৃণাল (মিনাল) ত্রিবেদী। বেনাপোল স্থলবন্দরে পৌঁছালে বাংলাদেশ ও ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান। পরে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেওয়া হয় নবনিযুক্ত এই কূটনীতিককে।
বাংলাদেশে প্রবেশের পর দীনেশ ত্রিবেদী সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের জনসংখ্যা ১৪০ কোটি। বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষকে সঙ্গে নিলে আমরা ১৬০ কোটির একটি বৃহৎ পরিবার। আমি এখানে আলাদা কিছু ভাবতে আসিনি; আমরা একসঙ্গে এগিয়ে যেতে চাই। ভিসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা ও সমাধানের পথ খুঁজে বের করব।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, অনেক চ্যালেঞ্জও এক। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
তিনি বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক আরো দৃঢ় করা। আমরা সবাই ভাই-বোন। দুই দেশের মানুষের কল্যাণ, পারস্পরিক আস্থা ও যোগাযোগ বৃদ্ধিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত দক্ষিণ এশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। পারস্পরিক সহযোগিতা আরো সম্প্রসারিত হলে তা আঞ্চলিক উন্নয়ন, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে নতুন গতি যোগ করবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে সম্পর্ককে আরো উচ্চতায় নেওয়ার আগ্রহের কথাও জানান তিনি।
ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর বিষয়ে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, বিষয়টি তাঁর বিবেচনায় রয়েছে। এমন উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে দুই দেশের সাধারণ মানুষ উপকৃত হন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ আরো সহজ হয়।
হাইকমিশনারকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পবন বাঁধে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল আরিফ মাহমুদ, সিনিয়র সহকারী সচিব সরোয়ার মোহাম্মদ শাহরিয়ার খান, বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা।
ইমিগ্রেশন ও প্রটোকল কার্যক্রম শেষে দীনেশ ত্রিবেদী সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
সোহেলের ইতালির স্বপ্ন লিবিয়ায় দাফন
৬৩ লাখ টাকা খুইয়ে তিনি শুধু রক্তাক্তই নন, সর্বস্বান্তও মূল আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন মাদারীপুরের সোহেল। সেই স্বপ্নকে বাস্তব বানাতে স্থানীয় একটি দালালচক্রের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। বৈধ ভিসায় ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দেয় চক্রটি। চক্রটির তাঁর পরিবারের সঙ্গে ইতালি যাওয়ার চুক্তি চূড়ান্ত হয় ২৪ লাখ টাকায়। স্বপ্নপূরণের আশায় দালালদের হাতে প্রাথমিকভাবে নগদ চার লাখ টাকা তুলে দেয় পরিবার। এরপর ধাপে ধাপে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আরো ১৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল ইতালি পৌঁছানোর পর।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দালালচক্রের ৪ নং আসামি (মামলা হিসেবে) মো. আলাউদ্দিন কবিরাজ নিজে উপস্থিত থেকে সোহেলকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে একটি ফ্লাইটে উঠিয়ে দেয়। পরিবারের সবাই ভেবেছিল, সোহেল এবার ইতালির মাটিতে পা রাখবেন। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে নিয়ে যাচ্ছিল এক নির্মম নরকের দিকে। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে সোহেলকে ইতালি না নিয়ে নিয়ে যায় লিবিয়ার ত্রিপোলিতে। সেখানে অপেক্ষারত একটি
অজ্ঞাতনামা মাফিয়াচক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয় হতভাগা সোহেলকে। শুরু হয় এক বিভীষিকাময় বন্দিজীবন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ভিকটিম সোহেলের স্ত্রী ঊর্মি বেগমের ইমো নম্বরে (সুলতান ভাই) নামের একটি আইডি থেকে প্রথম একটি ভিডিও আসে। স্ক্রিনে চোখ রাখতেই ঊর্মি বেগমের বুক কেঁপে ওঠে। সেটি ছিল তাঁর স্বামীর রক্তাক্ত ও মারধরের ভিডিও। সেসব নির্যাতনের ভিডিও কালের কণ্ঠের হাতেও এসেছে। ভিডিও দেখানোর পর মাফিয়াচক্র ইমো আইডির নাম পরিবর্তন করে (কিং কোবরা) নামে ভিকটিমের পরিবারের কাছে ২৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকার জন্য সোহেলের ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। অপহরণকারীরা তাঁকে দীর্ঘদিন অনাহারে-অর্ধাহারে আটকে রাখে। তাঁর হাত-মুখ বেঁধে নগ্ন করা হয়। এরপর ইলেকট্রিক তার দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। প্লাস দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয় হাতের নখ। ব্লেড দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান কেটে চলে টাকার জন্য ব্যাপক চাপ।
স্বামীকে বাঁচাতে নিরুপায় ঊর্মি বেগম ইতালিপ্রবাসী মূল দালাল রিয়াজুল ও তার স্থানীয় ম্যানেজার টিটুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা মুক্তিপণের বিষয়টি রফাদফা করার আশ্বাস দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সরবরাহ করে। স্বামীকে জীবিত ফেরত পেতে ঊর্মি বেগম আসামি সুরিয়া বেগম ও শিউলি ডেইরি ফার্মের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দুই ধাপে আরো ২০ লাখ টাকা পাঠান। এর পরও নির্যাতন থামেনি। গত ৫ এপ্রিল অপহরণকারীদের দেওয়া এনামুল হকের আরেকটি ইসলামী ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আরো পাঁচ লাখ টাকা পাঠানো হয়। এভাবে ধাপে ধাপে এই চক্রের হাতে সর্বমোট ৬৩ লাখ টাকা তুলে দেয় ভিকটিমের পরিবার।
পরে ৬ মে ভিকটিম সোহেলকে মুক্তি না দিলে নিরুপায় হয়ে তাঁর স্ত্রী ঊর্মি বেগম তুরাগ থানায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা করেন। মামলার তদন্ত শুরু করে পিবিআই পুলিশ। গত ২১ এপ্রিল মাদারীপুর থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে প্রধান আসামি রিয়াজুলের স্থানীয় ম্যানেজার টিটু ঢালী ওরফে ম্যানেজার টিটু (২৫) এবং রিয়াজুলের মা রহিমা বেগমকে (৫০)। টিটু দেশে বসে ইতালি যাওয়ার লোক সংগ্রহ করত আর রহিমা বেগম দেখত স্থানীয় লেনদেনের হিসাব। চার দিনের পুলিশ রিমান্ড শেষে এই দুজন আসামিচক্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে আদালতে স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। গত ১ মে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তদন্তে প্রাপ্ত সন্দিগ্ধ আসামি মো. ইসমাইল দেওয়ানকে (৪৯)। তাঁর ব্যবহৃত ইসলামী ব্যাংক অ্যাকাউন্টেও মুক্তিপণের টাকা জমা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদে ইসমাইল স্বীকার করেন, লিবিয়ায় অবস্থানরত তাঁর আপন ভাই ইকবাল দেওয়ানের (৩৫) নির্দেশেই তিনি এই টাকা গ্রহণ ও বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতেন। তিন দিনের রিমান্ড শেষে তাঁকেও আদালতে সোপর্দ করে পরে কারাগারে পাঠানো হয়।
ভিকটিমের স্ত্রী মামলার বাদী ঊর্মি বেগম এসব চক্রের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে তারা সব মিলিয়ে মোট ৬৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আমার স্বামীকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে প্রায় আড়াই মাস আটকে রেখে নির্মমভাবে মারধর করেছে। আমরা এখনো সেই টাকাগুলো ফেরত পাইনি, যার সব ডকুমেন্টস আমার কাছে আছে।’
সোহেলের আইনজীবী মো. লিটন মিয়া কালের কণ্ঠকে জানান, গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে রহিমা বেগমকে আদালত ভিকটিম সোহেলকে তার ছেলে রিয়াজুলের সঙ্গে কথা বলে ফিরিয়ে আনা, তদন্ত কর্মকর্তাকে সহায়তা করাসহ তিনটি শর্তে জামিন দিয়েছেন। তবে তিনি এখনো কারামুক্ত নন। কারণ আরো একটি মানবপাচার মামলায় রহিমা বেগমকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ মামলাটিতে তিনি গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে এবং জবানবন্দিতে সব স্বীকার করেছেন। এ ছাড়া গ্রেপ্তার বাকি আসামিরা কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু এখনো চক্রের মূল আসামিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পিবিআই সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন মাফিয়াদের টর্চার সেলে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকার পর অবশেষে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন ভিকটিম সোহেল। দেশে আসার পরে ভিকটিম সোহেল তাঁর সঙ্গে হওয়া নির্মম নির্যাতনের চিত্র আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। দীর্ঘদিন বন্দির এক পর্যায়ে সোহেলকে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে অজ্ঞাত স্থানে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তিনি স্থানীয় বাংলাদেশিদের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ত্রিপোলি থেকে ২৫ মে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাঁকে হেফাজতে নেয় পুলিশ। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছেন তাঁর স্ত্রী। মামলাটিতে এজাহারনামীয় আসামি মোট ১১ জন এবং অজ্ঞাতনামা আরো পাঁচ-ছয়জন থাকলেও তদন্তে আরো দুজনের নাম যুক্ত হয়েছে। চক্রের প্রধান হোতা রিয়াজুল মাতুব্বর (২৪) ইতালিপ্রবাসী এবং লিবিয়াপ্রবাসী ইকবাল দেওয়ান (৩৫) এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। একই সঙ্গে এজাহারভুক্ত অন্য আসামি মো. আলাউদ্দিন কবিরাজ (৫০), হিমেল ঢালী (২৫), রিয়াজুলের ভাই রিমন মাতুব্বর (২৮), পিতা আইয়ুব আলী মাতুব্বর (৫৪), বোন তানিয়া (৩০) এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারী আসামি সুরিয়া বেগম, শিউলি ডেইরি ফার্ম ও এনামুল হকসহ বাকি সহযোগীরা এখনো পলাতক। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই উপপরিদর্শক মো. জাকারিয়া আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রেপ্তার আসামিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট রেকর্ড পর্যালোচনা করে এই মানবপাচার ও মুক্তিপণ লেনদেনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতালিতে অবস্থানরত চক্রের প্রধান রিয়াজুল মাতুব্বরসহ সবাইকে আইনের আওতায় নিতে এরই মধ্যে আমরা ইন্টারপোলের কাছে নোটিশ দিয়েছি।’
