• ই-পেপার

দ্বিন ও দুনিয়া

সব কাজে সফলতার তিন সূত্র

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৮৩

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

যারা তোমার হাতে বায়াত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বায়াত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর। অতঃপর যে তা ভঙ্গ করে, তা ভঙ্গ করার পরিণাম তারাই। আর যে আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার পূর্ণ করে তিনি অবশ্যই তাকে মহাপুরস্কার দেন।

(সুরা : ফাতহ, আয়াত : ১০)

আয়াতে বায়াতে রিদওয়ানের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে বায়াত করা আল্লাহর হাতে বায়াত করার মতো। কেননা বায়াত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করা হয়।

২. তাদের হাতের ওপর আল্লাহর হাত বাক্যে আল্লাহর হাত দ্বারা আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ উদ্দেশ্য। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর হাতের স্বরূপ আল্লাহই ভালো জানেন। মানুষের জন্য তা জানতে চাওয়াও শুদ্ধ নয়।

৩. নেক কাজের জন্য বায়াত গ্রহণ করা বৈধ এবং নবীজি (সা.) থেকে তা বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত।

৪. হাতে হাত রেখে বায়াত করা প্রাচীন ও মাসনুন পদ্ধতি, এটা শর্ত নয়। বায়াতের আসল শর্ত কোনো বিশেষ কাজের জন্য তা করা।

৫. যে কাজের অঙ্গীকার করা হয় তা পূর্ণ করা আইনত ওয়াজিব এবং তার বিরুদ্ধাচরণ করা হারাম। (মাআরেফুল কোরআন : ৮/৫৬)

 

প্রশ্ন-উত্তর

সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

প্রশ্ন-উত্তর

পুরনো মসজিদের জায়গায় টিউবওয়েল লাগানো

প্রশ্ন : আমাদের এলাকায় একটি পুরনো মসজিদ ভেঙে নতুন মসজিদ নির্মাণকালে পুরনো মসজিদের কিছু অংশ রয়ে গেছে। এখন সেখানে জনসাধারণের সুবিধার্থে ডিপ টিউবওয়েল দেওয়া যাবে কি?

শাহেদ, ফরিদপুর

উত্তর : প্রশ্নে উল্লিখিত জায়গায় জনসাধারণের জন্য নলকূপ বসানো জায়েজ হবে না; বরং ওই স্থানেও মুসল্লিদের নামাজের ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভব না হলে ওই স্থানকে মসজিদের মতো সংরক্ষণ করা জরুরি। (সুরা : জিন, আয়াত : ১৮, বুখারি, হা. : ২৬৮৩, আদ্দুররুল মুখতার : ৪/৩৫৮)

 

ইসলামে ত্যাজ্যপুত্রের বিধান

প্রশ্ন : এক ভাইকে তার বাবা হুমকি দিয়েছেন, উনার পছন্দের মেয়েকে বিয়ে না করলে ত্যাজ্য করবেন। আমার প্রশ্ন হলো, ইসলামে ত্যাজ্যপুত্রের বিধান কী? এবং ত্যাজ্যপুত্র মিরাস থেকে বঞ্চিত হবে কি?

শাহাদাত, নাটোর

উত্তর : প্রশ্নে উল্লিখিত ব্যক্তির উচিত, কোনো ইসলাম সমর্থিত সমস্যা না থাকলে তার বাবার আদেশ পালন করা। তবে ইসলামে সন্তানকে ত্যাজ্য করার কোনো ভিত্তি নেই। বিধায় মিরাস থেকে বঞ্চিত হওয়ার ইসলামী কারণ না পাওয়া গেলে ত্যাজ্যপুত্র মিরাস থেকে বঞ্চিত হবে না। (রদ্দুল মুহতার : ১১/৬৭৮, ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৪/৩৬৪, ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম : ১৭/৫৪০)

তায়েফে মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
তায়েফে মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত মসজিদ

সৌদি আরবের তায়েফ নগরীর আল-মাসনাহ এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক আল-কানতারা মসজিদ ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও মহানবী (সা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা। এটি মাসজিদ আল-মাদহোন এবং মাসজিদ কাবিল নামেও পরিচিত। কাল পরিক্রমায় মসজিদটি আজ পরিত্যক্ত ও তালাবদ্ধ। তাতে আর নিয়মিত নামাজের কাতার বসে না। তবে পরিত্যক্ত হলেও এর নীরব দেয়াল যেন এখনো সাক্ষ্য দেয় ইসলামের ইতিহাসের এক বেদনাময় অথচ অনুপ্রেরণাদায়ক অধ্যায়ের। যা মূলত মহানবী (সা.)-এর তায়েফ সফরের স্মৃতির কারণে নির্মাণ করা হয়েছিল। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, উসমানীয় শাসনামলে ১৯ শতকে শরীফ আব্দুল মুত্তালিব ইবনে গালিবের সময়ে মসজিদটি নির্মিত হয়। এর স্থাপত্যে আব্বাসীয় ধারার প্রভাব লক্ষ করা যায়। ধারণা করা হয়, ১৮৪৬ সালের দিকে মসজিদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।

নবীজির (সা.) তায়েফ সফরের স্মৃতিবিজড়িত স্থান

ইসলামের ইতিহাসে তায়েফ সফর ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম কঠিন ও বেদনাদায়ক অধ্যায়। মক্কায় চরম নির্যাতনের মুখে তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তায়েফে যান। কিন্তু সেখানকার নেতৃবৃন্দ তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। শুধু তা-ই নয়, তারা শিশু-কিশোর ও উচ্ছৃঙ্খল লোকদের উসকে দেয়, যাতে তারা নবীজি এবং তাঁর সঙ্গী জায়েদ ইবনে হারিসা (রা.)-এর ওপর পাথর নিক্ষেপ করে। অবিরাম পাথর নিক্ষেপে রাসুলুল্লাহ (সা.) ও জায়েদ (রা.) গুরুতর আহত হন। তাঁদের শরীর রক্তাক্ত হয়ে যায়। এক পর্যায়ে তায়েফ নগরী থেকে বের হয়ে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অবস্থায় তাঁরা শহরের উপকণ্ঠে একটি আঙুরবাগানে আশ্রয় নেন।

বাগানটির মালিক মহানবী (সা.)-এর অসহায় অবস্থা দেখে তাদের খ্রিস্টান ক্রীতদাস আদ্দাসকে এক থোকা আঙুর নিয়ে তাঁর কাছে পাঠান। মহানবী (সা.) বিসমিল্লাহ বলে আঙুর খেতে শুরু করলে আদ্দাস বিস্মিত হন। কথোপকথনের এক পর্যায়ে মহানবী (সা.) তাঁকে তাঁর জন্মস্থান নিনেভা এবং মহান আল্লাহর নবী ইউনুস (আ.) সম্পর্কে জানান। এতে আদ্দাস গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং শ্রদ্ধাভরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ও মাথায় চুম্বন করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলামের ইতিহাসে এটি এক অনন্য ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনা।

ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয়, পরবর্তীকালে যে স্থানে আল-কানতারা মসজিদ নির্মিত হয়, সেটিই ছিল সেই স্মৃতিবিজড়িত এলাকা, যেখানে নবীজি (সা.) তায়েফ থেকে ফেরার পথে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন। মসজিদটি মাসজিদে মাদহোন নামেও পরিচিত। ধারণা করা হয়, এর নামকরণ হয়েছে নিকটবর্তী আল-মাদহোন পাহাড়ের নাম অনুসারে। স্থানীয়ভাবে এটি মাসজিদ কাবিল নামেও পরিচিত।

আজ মসজিদটি পরিত্যক্ত হলেও এটি মুসলিম ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। মহানবী (সা.)-এর ধৈর্য, আল্লাহর ওপর অটল ভরসা এবং কঠিন পরীক্ষার মধ্যেও দাওয়াতি দায়িত্ব পালনের অনন্য দৃষ্টান্তের স্মারক হিসেবে আল-কানতারা মসজিদ ইতিহাসপ্রেমী ও মুসলিম দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

আত্মবিশ্বাস ও বিনয় ঈমানের অলংকার

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
আত্মবিশ্বাস ও বিনয় ঈমানের অলংকার

দুটি গুণ ঈমানকে মজবুত করে; এক. আল্লাহর ওপর অগাধ ভরসা থেকে জন্ম নেওয়া আত্মবিশ্বাস। দুই. আল্লাহ ও মানুষের সামনে বিনয়। ক্ষেত্র বিশেষে আত্মবিশ্বাস ছাড়া মানুষ ভালো কাজের সাহস পায় না, আবার ভালো কাজের মাহাত্ম বজায় রাখার জন্য বিনয়ের বিকল্প নেই। ফলে আল্লাহর হুকম পালনের উদ্দেশ্যে অর্জিত এই দুটি গুণকে একে অপরের পরিপূরক বলা যেতে পারে।

আল্লাহর ওপর রাখা অগাধ আস্থা-ভরসা থেকে জন্ম নেওয়া আত্মবিশ্বাস মুমিনকে দৃঢ় করে তোলে। পবিত্র কোরআনেও মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের এই দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাস অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, আর তোমরাই বিজয়ী যদি মুমিন হয়ে থাকো।

(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৯)

এই আয়াতে প্রতিটি মুমিনের জন্য শক্তিশালী অনুপ্রেরণা রয়েছে। এই আয়াত মুমিনকে আশাবাদী, সাহসী ও আত্মবিশ্বাসী হতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে এই আত্মবিশ্বাসের অর্থ এই নয় যে নিজের শক্তিই চূড়ান্ত; বরং এটি আল্লাহর সাহায্য, রহমত ও প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভরশীল।

মানুষ যদি প্রকৃত মুমিন হতে পারে, তাহলে তার হারানোর কিছুই নেই। সে দুনিয়াতে যে অবস্থায়ই থাকুক, তার জীবনে যা-ই ঘটুক, মহান আল্লাহ তাকে কোনো অবস্থায় ঠকতে দেবেন না। তার বিজয় সুনিশ্চিত। এই আত্মবিশ্বাস যদি কোনো মুমিন অর্জন করতে পারে, তাহলে পৃথিবীর কোনো বাধা, দুঃখ, হতাশা মুমিনকে দুর্বল করতে পারবে না।

তবে সতর্ক থাকতে হবে, আত্মবিশ্বাস যেন অহংকারে রূপ না নেয়। কারণ আল্লাহ অহংকারীকে নয়, বরং বিনয়ী বান্দাদের ভালোবাসেন। পবিত্র কোরআনে বিনয়ী বান্দাদের সুনাম করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, আর রহমানের বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদেরকে সম্বোধন করে তখন তারা বলে সালাম (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৩)

বিনয়ের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো, বিনয় মানুষকে দুনিয়াতে সম্মানিত করে, আখিরাতে সফলতা অর্জনে সহায়তা করে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনয় অবলম্বন করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদায় উন্নীত করেন। (মুসলিম, হাদিস : ৬৪৮৬)

এর বিপরীতে অহংকারের ব্যাপারে অন্য হাদিসে তিনি বলেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (মুসলিম, হাদিস : ১৬৮)

আত্মবিশ্বাস ও বিনয়ের সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ ছিলেন রাসুল (সা.)। তিনি আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসতেন, তাদের খোঁজখবর নিতেন, নিজের কাজ নিজেই করতেন এবং কখনো অহংকার করতেন না। আবার আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে জীবনের প্রতিটি কঠিন পরিস্থিতিতে অবিচল থেকেছেন।

আল্লাহর ওপর রাখা ভরসা থেকে জন্ম নেওয়া আত্মবিশ্বাস মানুষকে এগিয়ে নেয়, আর বিনয় সেই অগ্রযাত্রাকে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। এই দুটি মহৎ গুণের সমন্বয় মানুষের ঈমানকে আরো সুন্দর করে তোলে। মহান আল্লাহ সবাইকে আত্মবিশ্বাসী ও বিনয়ী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।