• ই-পেপার

প্রশ্ন-উত্তর

  • সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৮০

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি দান করেন, যেন তারা তাদের ঈমানের সঙ্গে ঈমান দৃঢ় করে নেয়, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর বাহিনীগুলো আল্লাহরই এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। এটা এ জন্য যে তিনি মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের দাখিল করবেন জান্নাতে, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেখানে তারা স্থায়ী হবে...।

(সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৪-৫)

আয়াতদ্বয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আল্লাহর আনুগত্যের পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

 

১. আয়াতে অন্তরের প্রশান্তি দ্বারা উদ্দেশ্য হুদাইবিয়ার সন্ধির ফলে সাহাবিদের অন্তরে সৃষ্ট মনঃকষ্ট ও গ্লানি দূর করা।

২. হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় উমর (রা.) বলেন, আমরা সত্য দ্বিনের অনুসারী। তাহলে কেন দ্বিনের ব্যাপারে আমরা হীনতা মেনে নেব? রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তর দেন, আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। আমি কখনো তাঁর আদেশের অবাধ্য হবো না এবং তিনি কখনো আমাকে ধ্বংস করবেন না।

৩. আল্লাহর অনুগ্রহে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মুমিনরা শুধু এই বাহ্যিক গ্লানি মেনে নেয়নি, বরং তাদের ঈমানি দৃঢ়তাও বৃদ্ধি পায়।

৪. নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করার পুরস্কার হলো পাপ মুক্তি ও জান্নাত লাভ।

৫. সব পরিস্থিতিতে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং দ্বিনের ওপর অটল থাকাকে আয়াতে মহাসাফল্য বলা হয়েছে।

  (জাদুল মাসির : ৭/৪২৫)

অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু থেকে বাঁচার দোয়া

অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু থেকে বাঁচার দোয়া

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল হাদমি ওয়া আউজুবিকা মিনাত তারাদ্দি, ওয়া আউজুবিকা মিনাল গারাকি ওয়াল হারাকি ওয়াল হারামি, ওয়া আউজুবিকা আইয়াতাখব্বাতানিশ শায়তানু ইনদাল মাওতি, ওয়া আউজুবিকা আন আমুতা ফি সাবিলিকা মুদবিরান ওয়া আউজুবিকা আন আমুতা লাদিগান।

অর্থ : হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ থেকে আশ্রয় চাই, আশ্রয় চাই গহ্বরে পতিত হয়ে মৃত্যুবরণ থেকে, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই পানিতে ডুবে ও আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণ থেকে এবং অতি বার্ধক্য থেকে। আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই মৃত্যুকালে শয়তানের প্রভাব থেকে, আমি আশ্রয় চাই আপনার পথে জিহাদ থেকে পলায়নপর অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা থেকে এবং আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই বিষাক্ত প্রাণীর দংশনে মৃত্যুবরণ থেকে।

সূত্র : আবুল ইয়াসার (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরূপ দোয়া করতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৫৫২)

জিজ্ঞাসা

কবরে ফলক স্থাপন করা যাবে কি

আমার নাম ওমর ফারুক মজুমদার। ঢাকার সাইনবোর্ড এলাকায় থাকি। কিছুদিন আগে আমার শাশুড়ি ইন্তেকাল করেছেন। সন্তানরা তাঁর কবরে একটি ফলক স্থাপন করতে চাচ্ছে। যেভাবে ঢাকা শহরের প্রায় সব কবরস্থানে ফলক স্থাপন করা হয়। যেখানে মৃত ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, জন্মসন, মৃত্যুসন ইত্যাদি থাকে। তাদের দাবি, ফলক স্থাপন করলে তারা সহজেই মায়ের কবর চিহ্নিত করতে পারবে এবং জিয়ারত করতে পারবে। আমার প্রশ্ন হলো, কবরের ওপর মৃত ব্যক্তির নাম-ঠিকানা সংবলিত ফলক স্থাপন করা কি জায়েজ?

মুফতি আবদুল্লাহ নুর
কবরে ফলক স্থাপন করা যাবে কি

প্রাজ্ঞ আলেমরা বলেন, চেনার জন্য কবরের ওপর নাম-ঠিকানা সংবলিত ফলক লাগানো বা অন্য কোনো চিহ্ন দেওয়া জায়েজ। শুধু কবর চিহ্নিত করে রাখার জন্য এমনটি করা নিষেধ নয়, কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা নাম-ঠিকানা ছাড়া অন্য কিছু লেখা জায়েজ নয়। যেমন কোরআনের আয়াত, কবিতা কিংবা প্রশংসা-স্তুতিমূলক বাক্য ইত্যাদি লিখে রাখা নিষেধ। একইভাবে অহংকার-অহমিকা প্রকাশ পায় এমন কিছু লেখাও নিষিদ্ধ। যেমনসাবেক মন্ত্রী, এমপি, শিল্পপতি ইত্যাদি।

বৈধতার প্রমাণ হিসেবে ফকিহরা নিম্নোক্ত হাদিসটি পেশ করেন। হাদিসে এসেছে, উসমান ইবনে মাজউন (রা.) ইন্তেকাল করার পর তাঁর দাফন শেষে রাসুলুল্লাহ (সা.) একজনকে একটি পাথর নিয়ে আসার আদেশ দেন। কিন্তু সেই সাহাবি তা বহন করে আনতে সক্ষম হননি। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) পাথরটি নিজেই বহন করে উসমান ইবনে মাজউন (রা.)-এর মাথার কাছে এনে রাখেন এবং বলেন, এর দ্বারা আমার (দুধ) ভাইয়ের কবর চিহ্নিত করে রাখলাম এবং পরে আমার পরিবারের কেউ মারা গেলে এর কাছাকাছি দাফন করব।

(আবু দাউদ, হাদিস : ৩২০৬)

আর বিধি-নিষেধের ব্যাপারে তাঁরা এই হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করেন। জাবের (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) কবর পাকা করা, তার ওপর লেখা, কবরের ওপর ঘর নির্মাণ করা এবং তা পদদলিত করা থেকে নিষেধ করেছেন। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৫২; তাবয়িনুল হাকায়িক : ১/৫৮৮; খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ১/২২৬)

আল্লাহ সব বিষয়ে সবচেয়ে ভালো জানেন।

বন্যায় সাপের উপদ্রব সচেতনতার এখনই সময়

মুফতি মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি
বন্যায় সাপের উপদ্রব সচেতনতার এখনই সময়

বর্ষাকাল বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেমন রহমতের বার্তা নিয়ে আসে, তেমনি অতিবৃষ্টি ও বন্যা অনেক সময় তা দুর্ভোগে পরিণত করে। চলমান বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামের বহু এলাকা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানুষের সামনে দেখা দিয়েছে আরেকটি নীরব কিন্তু প্রাণঘাতী সংকটসাপের উপদ্রব।

বন্যার পানিতে সাপের গর্ত ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ডুবে গেলে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বসতঘর, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, খড়ের গাদা, বিদ্যালয়, আশ্রয়কেন্দ্র, এমনকি বিছানার নিচেও আশ্রয় নিতে পারে। ফলে অসতর্কতার কারণে সাপের কামড়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ভয় নয়, সচেতনতা, সঠিক জ্ঞান এবং দ্রুত চিকিৎসাই হতে পারে জীবন রক্ষার সর্বোত্তম উপায়।

মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ মর্যাদা

ইসলাম মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল। (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)

অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৫)

যদিও এই আয়াতের মূল প্রসঙ্গ আল্লাহর পথে ব্যয়, তবু এর নির্দেশনা অনুযায়ী নিজের জীবনকে অযথা ঝুঁকির মুখে না ফেলা ইসলামের একটি সাধারণ নীতি। আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, হে ঈমানদাররা! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন করো। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭১)

এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে সম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি ও সতর্কতা অবলম্বন করা ঈমানদারের কর্তব্য।

চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি নবীজির উৎসাহ

রাসুলুল্লাহ (সা.) চিকিৎসা গ্রহণের প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেছেন, হে আল্লাহর বান্দারা! চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি, যার চিকিৎসা নেই। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ৩৮৫৫; জামে তিরমিজি, হাদিস : ২০৩৮)

এই হাদিস স্পষ্ট করে যে দুর্ঘটনা বা রোগব্যাধির ক্ষেত্রে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করা তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়; বরং ইসলামের নির্দেশনা।

সাপে কামড়ালে কী করবেন?

সাপে কামড়ানোর পর অনেকেই ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা কুসংস্কারের আশ্রয় নেন। এতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখতে হবে, কামড়ানো অঙ্গ যতটা সম্ভব স্থির রাখতে হবে এবং দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিতে হবে। বিষ চুষে বের করা, ক্ষত কেটে রক্ত বের করা বা শক্ত করে দড়ি বাঁধার মতো ভুল পদ্ধতি পরিহার করতে হবে।

প্রতিরোধই সর্বোত্তম ব্যবস্থা

বন্যার সময় কয়েকটি সাধারণ সতর্কতা অনেক বড় দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারে। রাতে চলাফেরার সময় টর্চ ব্যবহার করা, খালি পায়ে না হাঁটা, ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, জুতা ও কাপড় ব্যবহারের আগে পরীক্ষা করা, মেঝেতে না শুয়ে উঁচু খাটে ঘুমানো এবং শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবেশ ও ইসলামের ভারসাম্য

ইসলাম অকারণে কোনো প্রাণী হত্যা সমর্থন করে না। সাপ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করলে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া বৈধ। তবে নিরাপদভাবে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে সেটিই উত্তম। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপেরও একটি ভূমিকা রয়েছে, কারণ তারা ইঁদুরসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের করণীয়

বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আলো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাপ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনমের মজুদ এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

বৃহত্তর চট্টগ্রামের মতো পাহাড়ি, বনাঞ্চলসংলগ্ন ও জলাবদ্ধ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জন্য এই সচেতনতা আরো বেশি প্রয়োজন। কারণ সামান্য অবহেলা একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বন্যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় ধৈর্য, দোয়া, সতর্কতা এবং যথাযথ ব্যবস্থাসবকিছুর প্রয়োজন।

লেখক : প্রভাষক (আরবি), মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া

ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি), বন্দর, চট্টগ্রাম