মধ্যপ্রাচ্যে হরমুজ প্রণালির কর্তৃত্ব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বাবেল মানদেব প্রণালি। লোহিত সাগরে অবস্থিত এই প্রণালি পাড়ি দিতে গিয়ে গতকাল মঙ্গলবার অপরিশোধিত তেলবাহী দুটি সৌদি জাহাজ ইউ টার্ন নিয়ে মিসরের সুয়েজ খালের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ইয়েমেনি হুথি বিদ্রোহীদের হুমকির কারণে এই দুটি সৌদি জাহাজ গতিপথ পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে। তেল ও পণ্য পরিবহনে বাবেল মানদেব প্রণালি হরমুজের মতোই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, হরমুজের পর বাবেল মানদেব বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব তেলবাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছবে।
এদিকে ইরান যাতে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে না পারে, সেই লক্ষ্য নিশ্চিত করতে ট্রাম্প যে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, সেখান থেকে ওয়াশিংটন এখন দৃশ্যত সরে গেছে। যুদ্ধটা এখন হরমুজকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি সেই জায়গা, যেখানে ইরানের প্রতিটি যুদ্ধবিরতি বিলীন হয়ে গেছে। তাঁরা বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে : ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ভেস্তে গেছে এবং তা সব সময় একই অমীমাংসিত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে—হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজের বৈধতা কে যাচাই করবে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন যেকোনো মূল্যে হরমুজ প্রণালির কর্তৃত্ব নিশ্চিতে ইরানের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। টানা দশম রাতের মার্কিন বোমাবর্ষণের পর বাহরাইন ও জর্দানের বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি কুয়েতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ইরানও গতকাল মঙ্গলবার নতুন করে হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় কুয়েতের একটি লবণাক্ত পানি শোধনাগার ও একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন লেগে গেছে এবং সেগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে হুথি বিদ্রোহীদের হুমকির কারণে লোহিত সাগর থেকে তেলবাহী দুটি সৌদি জাহাজ রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিতে জটিলতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইরান যেকোনো মূল্যে হরমুজ ধরে রাখবে : অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক আমিন সাইকাল বলেছেন, মার্কিন-ইসরায়েল সূচিত ‘যুদ্ধের’ ফলে ইরানের প্রাপ্তি হলো হরমুজ প্রণালি এবং দেশটি এই ‘পুরস্কার’ কখনোই ছাড়বে না। উভয় পক্ষই একে অন্যের ওপর ব্যাপক ক্ষতিসাধনের চেষ্টা করে আসছে এবং অনেক দিক থেকেই তারা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তিনি আরো বলেন, যুক্তিগতভাবে এর ফলে তাদের আলোচনায় বসা উচিত। কিন্তু অবশ্যই এই মুহূর্তে তেমনটা হচ্ছে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় এবং এটা এমন একটা বিষয় যা ইরানিরা কখনোই ছেড়ে দেবে না।
জর্দানে ইরানি হামলায় নিহত ২ মার্কিন সেনার পরিচয় প্রকাশ : জর্দানের মুওয়াফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে ইরানি হামলায় নিহত দুই মার্কিন সেনার নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন)। নিহত সেনা সদস্যরা হলেন ২৫ বছর বয়সী ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গঞ্জালেস। যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ডিপার্টমেন্ট জানায়, টেক্সাসের অধিবাসী গঞ্জালেস গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) হামলায় প্রাণ হারান এবং হাওয়াই থেকে যোগ দেওয়া ফিহান শনিবার আঘাতজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ফিহানের স্বজনরা জানায়, এই মিশন শেষ করে বাড়ি ফিরে বিয়ে করার কথা ছিল তাঁর।
মার্কিন হামলার পরিণতি নিয়ে সিআইএর ভাষ্য : যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত সামরিক আগ্রাসন সত্ত্বেও ইরান তাদের আলোচনার অবস্থান সহজ করবে না এবং এই বিমান হামলার ফলে তেহরানের ওপর বড় কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই বলে নতুন এক গোয়েন্দা তথ্য উঠে এসেছে। ওয়াশিংটন-তেহরান বর্তমানে শান্তিবস্থা ও যুদ্ধের মধ্যবর্তী এক অনিশ্চিত অচলাবস্থায় আটকে গেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সিআইএ প্রধানত এই নতুন গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করেছে, যেখানে বলা হয়েছে শীর্ষ সামরিক নেতা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম হারিয়েও তেহরান সরকার টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ পরিচালক জোনাথন প্যানিকফ জানান, সামরিক চাপ দিয়ে ইরানকে নমনীয় করার মার্কিন ধারণা ভুল, কারণ ইরানের মূল অগ্রাধিকার হলো তাদের সরকারের টিকে থাকা। ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, তেহরানের ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের নমনীয় মনোভাবাপন্ন অংশ এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের হার্ডলাইনারদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকলেও সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এবং প্রধান আলোচনাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন।
লোহিত সাগরে সৌদি অপরিশোধিত তেলবাহী দুটি ট্যাংকার ইউ টার্ন নিয়েছে : ইয়েমেনের হুথি মিলিশিয়াদের সতর্কবার্তার পর চীন ও ভারতের জন্য সৌদি অপরিশোধিত তেলবোঝাই দুটি তেল ট্যাংকার লোহিত সাগরে ইউ টার্ন নিয়ে সুয়েজের দিকে রওনা দিয়েছে। সোমবার হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে একটি নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে একটি সম্ভাব্য নতুন রণাঙ্গন উন্মোচন করেছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের প্রতি হুমকি বাড়িয়ে তুলেছে। হুথিরা শিপিং কম্পানিগুলোকে পাঠানো একটি ই-মেইলে সৌদি আরবের বন্দরগুলোতে পণ্য বোঝাই বা খালাস না করার জন্য সতর্ক করেছে এবং বলেছে যে এই ধরনের কার্যকলাপের ফলে ‘যেকোনো স্থানে’ হামলার শিকার হতে পারে।
উল্লেখ্য, হুথিরা লোহিত সাগরের মোহনার বাব আল-মানদেব প্রণালির উপকূলসহ উত্তর ইয়েমেন নিয়ন্ত্রণ করে।
সূত্র : দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, সিএনএন, আল জাজিরা




