সারা দেশে তীব্র গ্যাসসংকট দেখা দিয়েছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি। অনেক স্টেশন বন্ধ রাখা হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করেও গ্যাস পাওয়া যায় অনেক কম। অনেক স্থানেই চালকরা সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করছেন। গ্যাসসংকটে শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। বাসাবাড়িতেও গ্যাসের প্রবাহ খুবই ক্ষীণ। অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, চুলাই জ্বলে না। সমস্যায় পড়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোও। গ্যাসসংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। জানা যায়, গ্যাসের এমন দুরবস্থার মধ্যেও প্রতিদিন সিস্টেম লসের নামে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস গায়েব হয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে, বিশেষ করে বিতরণ ও সেবামূলক কার্যক্রমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক ও সিএনজি খাতে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। গত বুধবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, কারিগরি বিশেষজ্ঞরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মেরামতের কাজ করছেন। দু-তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ অনেকটাই কম। ঘাটতি এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। ভাসমান টার্মিনালের ত্রুটি সারিয়ে আরো ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করলেও বড় ঘাটতি থেকেই যাবে। তদুপরি বিতরণব্যবস্থায় অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার কারণে সংকটের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। তাই জনভোগান্তি কমাতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট কাটাতে দ্রুত পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। জানা যায়, সরকার ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে একনেক সভায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ এবং সুনামগঞ্জে ৭২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি নতুন গ্যাসকূপ খনন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের ভূমিকা ধীরে ধীরে নীতিনির্ধারণ ও তদারকিতে সীমিত করতে চাই আমরা। এর মাধ্যমে সরকার বিতরণ ও সেবামূলক কার্যক্রমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে চায়। জ্বালানি তেল আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের একক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। এতে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে, সরকারের আর্থিক দায় কমবে এবং সেবার মান উন্নত হবে। বিদ্যুৎ বিতরণ কম্পানিগুলো পর্যায়ক্রমে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।’ বুধবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রূপান্তর’ শীর্ষক পলিসি কনক্লেভে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জ্বালানিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা তৈরির চেষ্টা করছি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীরও স্পষ্ট নির্দেশনা হলো, সরকারি অর্থে আর সবকিছু করার প্রয়োজন নেই। যেখানে সম্ভব, বেসরকারি খাতকে দায়িত্ব দিন।’ বিদ্যুত্মন্ত্রী বলেন, ‘সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়া উচিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাইকারি পর্যায়ে সরবরাহ নিশ্চিত করা। সরকারের খুচরা পর্যায়ের ব্যবসা পরিচালনা করা উচিত নয়।’
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবে জনদুর্ভোগ চরমে ওঠে। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাই এই খাতে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। যেকোনো মূল্যে জনভোগান্তি কমাতে হবে।

