দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন একেকটি মৃত্যুফাঁদ। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনায় ঝরছে তাজা প্রাণ। আর এই ধারাবাহিক সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে লাখ লাখ ফিটনেসবিহীন যানবাহন। মেয়াদোত্তীর্ণ, লক্কড়ঝক্কড় এবং যান্ত্রিক ত্রুটিপূর্ণ এসব গাড়ি বছরের পর বছর সড়ক ও মহাসড়কে কিভাবে চলাচল করছে, সেটিও এক বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যের বরাত দিয়ে গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ছয় লাখেরই ফিটনেস সনদ নেই। এই হিসাবে প্রতি তিনটি যানবাহনের মধ্যে একটি ফিটনেসবিহীন। হতাশার কথা হলো, এসব ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে, কিন্তু প্রয়োগের অভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েই চলছে।
ফিটনেসবিহীন যানবাহনের আধিক্য বুঝতে পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয় না। রাজধানীর মতো শহরে খোলা চোখেই দেখা যায়, প্রতিদিন সড়কে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বহু পুরনো রং উঠে যাওয়া ভাঙাচোরা যানবাহন। অনেক যানবাহনের স্টিয়ারিং, হেডলাইট, সিগন্যাল লাইটসহ অনেক যন্ত্রপাতি ত্রুটিপূর্ণ। প্রতিনিয়ত এসব গাড়ি থেকে নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া। ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে অনেক সময় মাঝপথেই বিকল হয়ে তৈরি করছে যানজট। এসব কারণে নগরবাসীর দুর্ভোগের শেষ নেই।
খবরে বলা হয়েছে, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি পুলিশকে চিঠি দিয়েছে বিআরটিএ। সংস্থাটির মুখপাত্র ও পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘১৭ লাখ চার চাকার যানবাহনের মধ্যে প্রায় ছয় লাখের ফিটনেস নেই। আমরা পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছি।’ জবাবে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি (অ্যাডমিন) হাবিবুর রহমান খান বলেন, ‘আমরা মহাসড়কভিত্তিক কাজ করি। ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা আঞ্চলিক সড়ক ও নগরের অভ্যন্তরে বেশি। মহাসড়কে তুলনামূলক কম।’ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম স্বীকার করেছেন, ‘দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও চালকদের দক্ষতার ঘাটতি।’ অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন অপসারণে অন্যতম বাধা হিসেবে কাজ করে থাকে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের রাজনৈতিক প্রভাব।
জানা গেছে, ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরাতে সরকার চলতি বছর ‘মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬’ জারি করেছে। এই নীতিমালার লক্ষ্য হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এবং দীর্ঘদিন ফিটনেসবিহীন থাকা যানবাহন পরিবেশবান্ধব উপায়ে স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং করা।
আমরা মনে করি, দেশে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ত্রুটিপূর্ণ সব ধরনের গাড়ি সরিয়ে ফেলতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকার যে নীতিমালা জারি করেছে, তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন সড়ক-মহাসড়কে কড়া নজরদারি।

