বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ওয়ার্ল্ড হেপাটাইটিস অ্যালায়েন্সের আহ্বানে হেপাটাইটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর পালিত হয় বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘Let’s break it down’। অর্থাৎ হেপাটাইটিস প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবার পথে থাকা সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসিক বাধাগুলো ভেঙে ফেলতে হবে; দূর করতে হবে কুসংস্কার ও বৈষম্য। এ উপলক্ষে ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ নানা সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
হেপাটাইটিস কী
লিভারের এক ধরনের ভাইরাসজনিত প্রদাহ হেপাটাইটিস। হেপাটাইটিস ভাইরাসের রয়েছে মোট পাঁচটি ধরন—এ, বি, সি, ডি এবং ই। খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায় হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাস। এ দুটি ভাইরাসের সংক্রমণে দেখা দেয় তীব্র (acute) হেপাটাইটিস। সাধারণত চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে এটি নিজে থেকেই সেরে যায়। তবে গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস-ই দেখা দিলে ভ্রূণ ও মায়ের দেহে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমণে দেহে নানা জটিল রোগ দেখা দেয়, মৃত্যুঝুঁকিও রয়েছে। বিশ্বে প্রায় ২৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষ এ দুটি ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণও হেপাটাইটিস বি এবং সি। লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণও এ দুটি ভাইরাস। প্রাথমিক লক্ষণ না থাকায় আক্রান্ত ১০ জনের ৯ জনই জানে না যে তারা ভাইরাসে আক্রান্ত। তাই এ দুটি ভাইরাসকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’।
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে প্রায় ৪.৪ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস-বি এবং ০.৬ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস-সিতে আক্রান্ত। অর্থাৎ দেশে আনুমানিক এক কোটি মানুষ এই ভাইরাসে ভুগছে। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে আশ্রিত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে হেপাটাইটিস-সির সংক্রমণ হার আশঙ্কাজনক, প্রায় ২০ শতাংশ। গ্রামে স্বাস্থ্য সচেতনতা, প্রতিরোধ ও চিকিৎসার সুযোগ কম থাকায় এবং কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার দরুন রোগীরা জটিল অবস্থায় চিকিৎসকের কাছে আসে। তখন আর রোগ নিরাময় সম্ভব হয় না।
লক্ষণ
হেপাটাইটিস-এর লক্ষণগুলো ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। অনেক সময় কোনো উপসর্গই থাকে না। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড ক্লান্তি, ক্ষুধামান্দ্য, হালকা জ্বর, বমি ভাব, পেটের ডান পাশে ব্যথা, গাঢ় প্রস্রাব, ফ্যাকাসে মল, জয়েন্টে ব্যথা এবং ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)। তবে মেডিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া হেপাটাইটিস সংক্রমণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
প্রতিরোধে করণীয়
♦ হেপাটাইটিস এ এবং ই প্রতিরোধে নিরাপদ খাবার, পানি ও পরিচ্ছন্নতা জরুরি। ‘এ’ ভাইরাসের টিকা গ্রহণ করা যেতে পারে।
♦ হেপাটাইটিস বি এবং সি সংক্রমিত হয় রক্ত ও অন্যান্য শারীরিক তরলের মাধ্যমে। রক্ত পরিসঞ্চালনের আগে সঠিক স্ক্রিনিং, ডিসপোজেবল ইনজেকশন, সিরিঞ্জ ও ব্লেড ব্যবহার, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিস (রেজার, টুথব্রাশ, কাঁচি) শেয়ার না করা, নিরাপদ যৌন চর্চা এবং চিকিৎসাকাজে জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে এর সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব। হেপাটাইটিস-বির টিকা নেওয়া যেতে পারে। হাত মেলানো বা রোগীর খাবারের পাত্র ব্যবহারে এই রোগ ছড়ায় না।
মা ও শিশুর সুরক্ষা
মায়ের দেহে হেপাটাইটিস সংক্রমণ থাকলে সেটি নবজাতকের দেহেও ছড়িয়ে পড়ে। জন্মের সময় সংক্রমিত হলে ৯৫ শতাংশ, জন্মের কিছু সময় পর আক্রান্ত হলে ৮০-৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে শিশুরা দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিসে ভোগে এবং ২০-২৫ শতাংশ শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মারা যায়। তাই গর্ভবতী মায়ের হেপাটাইটিস পরীক্ষা এবং আক্রান্ত হলে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে বার্থ ডোজ টিকা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চিকিৎসার প্রয়োজনে ইমিউনোগ্লোবুলিনও দিতে হবে। আমাদের দেশে এখনো প্রায় ৪৮ শতাংশ ডেলিভারি ধাত্রীদের মাধ্যমে হয়। ফলে ধাত্রীদের সচেতনতা এবং সরকারের ইপিআই শিডিউলে ২৪ ঘণ্টার বার্থ ডোজ দ্রুত সংযুক্ত করা প্রয়োজন।
চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
হেপাটাইটিসের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুততম সময়ে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন। হেপাটাইটিস বি এবং সি চিকিৎসার জন্য মুখে খাওয়ার ওষুধ ও ইনজেকশন দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। হেপাটাইটিস-সি চিকিৎসার ওষুধ (DAAs)বেশ দামি, তবে সরকারি কিছু সেন্টারে এটি বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। হেপাটাইটিস-বির ওষুধ দীর্ঘদিন খেতে হয়। হঠাৎ ওষুধ বন্ধ করলে লিভার ফেইলিউরের ঝুঁকি বাড়ে, তাই এর চিকিৎসায় হেলাফেলা করা যাবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূল করা। এই লক্ষ্য অর্জনে ভ্যাকসিনেশন, মা থেকে শিশুতে সংক্রমণ রোধ, নিরাপদ ইনজেকশন/রক্ত সঞ্চালন ও সহজলভ্য চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, সব গর্ভবতী মায়ের পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, বিনা মূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং জাতীয় হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রাম চালুর দিকেও জোর দিতে হবে। ভাইরাল হেপাটাইটিস মুক্ত প্রজন্মই হবে আমাদের আগামী দিনের বড় অর্জন।
লেখক : মহাসচিব
ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ