মাইগ্রেনের সঙ্গে পরিচিত কমবেশি সবাই। চড়া রোদ, ঠাণ্ডা আবহাওয়া, অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত পরিশ্রম ইত্যাদি কারণে মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়ে। কয়েক ধরনের খাবারও মাইগ্রেন অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়। এগুলো এড়িয়ে চললে মাইগ্রেন অ্যাটাকের আশঙ্কা অনেকটাই কমে।
অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা খাবার
অতিরিক্ত গরম খাবার অতি দ্রুত খেলে মাথার রক্তনালিগুলো হুট করে সম্প্রসারিত হয়, পাশাপাশি মুখের ব্যথার স্নায়ুতে চাপ পড়ে। এর ফলে দেখা দিতে পারে মাথা ব্যথা। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা খাবার গ্রহণেও রক্ত সঞ্চালন ও স্নায়বিক কারণে মাথা ব্যথা করে, প্রচলিত ভাষায় যার নাম ‘ব্রেইন ফ্রিজ’। এ ধরনের মাথা ব্যথা মাইগ্রেনে রূপ নিতে পারে। আইসক্রিম, ঠাণ্ডা দই বা যেকোনো হিমায়িত খাবার সরাসরি ফ্রিজ থেকে বের করে খাওয়া যাবে না। গরম খাবারও স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
লবণাক্ত খাবার
লবণ শরীরের জন্য যতটা প্রয়োজনীয়, অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ ততটাই ক্ষতিকর। লবণ বেশি গ্রহণের দরুন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ নানা রোগ দেহে বাসা বাঁধে। অতিরিক্ত লবণ খেলে রক্তচাপ বেড়ে যায়, যার প্রভাবে মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়তে পারে।
প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে। চিপস, ফাস্ট ফুড, সস, খাবারের সঙ্গে বাড়তি লবণ গ্রহণ বর্জনের পাশাপাশি রান্নায়ও যতটা সম্ভব লবণ ব্যবহার কমাতে হবে।
আচারজাতীয় ফার্মেন্টেড খাবার
দীর্ঘদিনের পুরনো পনির, আচার ও অন্যান্য ফার্মেন্টেড খাবারে থাকে টাইরামিন (Tzramine) নামক এক পদার্থ। এ ধরনের খাবার যত পুরনো হয়, ততই বাড়ে টাইরামিনের পরিমাণ। মস্তিষ্কের রক্তনালি সংকুচিত করে এটি। ফলে মাইগ্রেনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। টাইরামিনজনিত মাইগ্রেনের ব্যথাও হয় তীব্র। তাই যতটা সম্ভব ফার্মেন্টেড ও পুরনো খাবার এড়িয়ে চলতে হবে।
প্রক্রিয়াজাত মাংসজাতীয় খাবার, যেমন—সসেজ বা বেকনেও এই পদার্থ রয়েছে। আরো একটি ফার্মেন্টেড খাবার ইস্টযুক্ত রুটি। তাই পাউরুটি, বান ও ইস্টযুক্ত প্রোটিন পাউডার এড়িয়ে চলাও জরুরি।
ক্যাফেইন
চা-কফির মতো উত্তেজক পানীয়র মধ্যে আছে ক্যাফেইন। অল্প পরিমাণে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে মাইগ্রেনের ব্যথা কমতে পারে, অনেকেই মাথা ব্যথার ঘরোয়া চিকিৎসা হিসেবে চা বা কফি পান করেন। তবে দিনে ২০০ মিলিগ্রামের বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করলে উল্টো মাইগ্রেন ট্রিগার হতে পারে। কেননা ক্যাফেইনের প্রভাবে একদিকে যেমন রক্তনালি সংকুচিত হয়ে রক্তচাপ বাড়ে, অন্যদিকে ক্যাফেইনের প্রভাবে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, যা মাইগ্রেনের একটি বড় কারণ। তাই মাইগ্রেন রোগীদের দিনে দুই কাপের বেশি চা বা কফি গ্রহণ করা অনুচিত।
অ্যালকোহল ও তামাক
মাইগ্রেন অ্যাটাকের আশঙ্কা বৃদ্ধির অন্যতম প্রভাবক হলো অ্যালকোহল। বিশ্বের মোট মাইগ্রেন রোগীর বড় অংশ অ্যালকোহল গ্রহণকারী। রক্ত সঞ্চালনে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি অ্যালকোহল থেকে উৎপন্ন টক্সিনের প্রভাবেও মাইগ্রেন দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের রক্তনালি সংকুচিত করে তামাকের মধ্যে থাকা নিকোটিন। এটি দেহের রক্তচাপও বাড়িয়ে দেয়। তাই মাইগ্রেন রোগীদের উচিত যত দ্রুত সম্ভব তামাক ও অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস ত্যাগ করা। ই-সিগারেট, নিকোটিন গাম বা পাউচ গ্রহণেও একই ধরনের সমস্যা হতে পারে, কেননা এতে ধোঁয়া না থাকলেও নিকোটিন ঠিকই আছে।
কৃত্রিম মিষ্টি ও চকোলেট
কৃত্রিম চিনিতে বেশির ভাগ সময় ব্যবহৃত হয় অ্যাসপারটেম। কিছু রোগীর মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের পরিমাণ বদলে দেয় এটি। প্রায় ৮ শতাংশ মাইগ্রেন রোগীর ক্ষেত্রে অ্যাসপারটেম গ্রহণের কিছু সময় পরই দেখা দেয় তীব্র মাথা ব্যথাসহ মাইগ্রেন অ্যাটাক। ডায়েট কোমল পানীয় ও কৃত্রিম মিষ্টান্নর মধ্যে এটি রয়েছে, তাই এসব বাদ দিতে হবে। চকোলেটের মধ্যে থাকা বেটা ফিনাইল-ইথাইলামিন পদার্থটিও মাইগ্রেনের অন্যতম ট্রিগার। এর পাশপাশি চকোলেটের মধ্যে ক্যাফেইনও আছে। এ দুটি কারণে মাইগ্রেন রোগীদের যতটা সম্ভব চকোলেট এড়িয়ে চলতে হবে। মিল্ক বা হোয়াইট চকোলেটের চেয়ে ডার্ক চকোলেট বেশি বিপজ্জনক।
লেখক : কনসালট্যান্ট
অরোরা স্পেশালাইজড হাসপাতাল





