

অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন। বিশেষত এ সময়ের কিশোর-তরুণদের মধ্যে এই অভ্যাস বেশি দেখা যায়। ফলে গভীর রাতে খাওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এর সঙ্গে স্থূলতার হার ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
রাতের খাওয়ার অসুখ
রাতের খাবারের পর গভীর রাতে আবার খাওয়াদাওয়া করা একেবারেই অনুচিত। দৈনিক মোট ক্যালরির ২৫ শতাংশের বেশি গভীর রাতে গ্রহণ করার অভ্যাসকে বলা হয় নাইট ইটিং সিনড্রোম (NES)। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মধ্যে নাইট ইটিং সিনড্রোম রয়েছে, তাদের সকালের নাশতা বাদ দেওয়ার সম্ভাবনা ১.৮৪ গুণ বেশি। রাতে অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে যেমন ওজন বাড়ে, তেমনি সকালে খেতে না চাওয়ার কারণে খাদ্যাভ্যাসের একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়।
ঘুমের সমস্যা ও স্থূলতা
স্থূলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের অভাব। সম্প্রতি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের (NIH) এক গবেষণায় ‘র্যাপ্টিন’ নামের একটি নতুন হরমোন আবিষ্কৃত হয়েছে, যা ঘুমের সময় নিঃসৃত হয় এবং ক্ষুধা দমন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই হরমোনের মাত্রা কম থাকে। এতে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে এবং স্থূলতার ঝুঁকি তৈরি করে। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের ঘুমের মান খারাপ, তারা সকালের নাশতা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় তিন গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ঘুম কম হলে ‘ঘেরলিন’ (ক্ষুধা উদ্দীপক হরমোন) বেড়ে যায় এবং ‘লেপটিন’ (ক্ষুধা নিরোধক হরমোন) কমে যায়; ফলে রাতে খাওয়ার ইচ্ছা বাড়ে।
করণীয়
♦ নিয়মিত সকালের নাশতা করুন : এটি শরীরের ঘড়ি স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
♦ ঘুমের রুটিন মেনে চলুন : প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমান এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন (সর্বনিম্ন ৭-৮ ঘণ্টা)।
♦ মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন : অনেক সময় মানসিক উদ্বেগ থেকেই রাতে খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
বিশেষ করে যাঁরা রাতে জেগে কাজ করেন বা রাতের শিফটে কর্মরত, তাঁদের জন্য এই সমস্যা আরো প্রকট। ঘুম ও খাদ্যাভ্যাসের এই জটিল সম্পর্ক বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের
অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে স্থূলতা ও নাইট ইটিং সিনড্রোমের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

অনেকে মনে করেন, বৃষ্টিতে ভিজলেই গলা ব্যথা হয়। আসলে আর্দ্র বাতাসে প্রচুর পরিমাণে ব্যাকটেরিয়া স্পোর ও ভাইরাস উড়ে বেড়ায়, যা গলার অভ্যন্তরের শ্লেষ্মা ঝিল্লিতে প্রবেশ করে সৃষ্টি করে প্রদাহ। এ থেকে তৈরি হয় ব্যথার অনুভূতি, যা প্রচলিত ভাষায় ঠাণ্ডাজনিত গলা ব্যথা নামে পরিচিত। ঘরোয়া পরিচর্যায় কিছুদিনের মধ্যেই সেরে যায় এটি; অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে গলা ব্যথা হতে পারে জটিল রোগের উপসর্গ। তাই গলা ব্যথার ধরন অনুযায়ী উপসর্গ জেনে নেওয়া জরুরি।
ধরন
গলা ব্যথার সম্ভাব্য কারণ শনাক্ত করতে ব্যথার ধরন জানা গুরুত্বপূর্ণ। স্ট্রেপ থ্রোট বা টনসিলাইটিস দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
♦ ফ্যারিঞ্জাইটিস : গলার পেছনের অংশ বা ফ্যারিংসের প্রদাহ থেকে দেখা দেয় ফ্যারিঞ্জাইটিস। এতে গলার পেছনের অংশে অস্বস্তি ও ব্যথা অনুভূত হয়। বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে গলা ব্যথার কারণ এটাই।
♦ টনসিলাইটিস : ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে টনসিলে প্রদাহ সৃষ্টি হয়। এতে টনসিল ফুলে যায়, গলা ব্যথার পাশাপাশি খাবার গিলতে সমস্যা এবং গলা ব্যথা হয়। অনেক সময় জ্বরও দেখা দিতে পারে। শিশুদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি হলেও যেকোনো বয়সেই হতে পারে এই রোগ। এ ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
♦ ল্যারিঞ্জাইটিস : স্বরযন্ত্রের প্রদাহের কারণে কণ্ঠস্বর ভেঙে যায় বা বসে যায়। ভাইরাসের সংক্রমণ বা দীর্ঘ সময় উচ্চৈঃস্বরে কথা বলার কারণে এটি হতে পারে।
♦ স্ট্রেপ থ্রোট : গলায় ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে এটি হয়ে থাকে। উপসর্গের মধ্যে আছে তীব্র গলা ব্যথা, জ্বর এবং টনসিলে সাদা দাগ দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যান্য কারণ
সংক্রমণ ছাড়াও অন্যান্য রোগের উপসর্গ হিসেবেও গলা ব্যথা হতে পারে। এর মধ্যে আছে—
♦ এসিড রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) : পাকস্থলীর এসিড গলায় উঠে এসে গলায় জ্বালাপোড়া ও ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
♦ দাঁতের সংক্রমণ : মাড়ির প্রদাহ, দাঁতের ফোড়া বা আক্কেল দাঁতের জটিলতা থেকেও গলায় ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
♦ কানের সংক্রমণ : মধ্যকর্ণের সংক্রমণে অনেকেই গলা ব্যথা অনুভব করেন।
♦ টনসিলোলিথ (Tonsillolith) : টনসিলে খাদ্যকণা জমে ছোট পাথরের মতো বস্তু তৈরি হলে গলা ব্যথা, মুখে দুর্গন্ধ এবং গিলতে অস্বস্তি হতে পারে।
♦ থাইরয়েড বা লালাগ্রন্থির প্রদাহ : গয়টার, থাইরয়ডাইটিস বা লালাগ্রন্থির সংক্রমণেও গলায় ব্যথা দেখা দিতে পারে।
♦ ক্যান্ডিডিয়াসিস (Candidiasis) : রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে বা দীর্ঘদিন অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা স্টেরয়েড ইনহেলার ব্যবহারের ফলে ফাঙ্গাল সংক্রমণ হয়ে গলা ব্যথা হতে পারে।
ঝুঁকিতে যারা
♦ শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে বেশি দেখা যায়
♦ ধূমপায়ীরাও সহজে আক্রান্ত হন
♦ অ্যালার্জিতে আক্রান্ত ব্যক্তি
♦ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল
♦ ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
ঘরোয়া পরিচর্যা
ভাইরাসজনিত গলা ব্যথা উপশমে ঘরোয়া পরিচর্যা করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
♦ কুসুম গরম লবণ পানি দিয়ে গার্গল করা
♦ পর্যাপ্ত পানি পান
♦ গরম স্যুপ বা অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ
♦ গলাকে বিশ্রাম এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলা কমানো
♦ প্রয়োজনে গরম পানির ভাপ নেওয়া
♦ জ্বর বা ব্যথা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে।
প্রতিরোধ
♦ অণুজীবী সংক্রমণ এড়াতে নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে
♦ কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখতে হবে
♦ অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে
♦ ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে
♦ বৃষ্টিতে ভিজে গেলে দ্রুত শুকনো পোশাক পরতে হবে। ঘুমানোর সময় এসি বা ফ্যান ব্যবহার কমাতে হবে
♦ পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য ও নিয়মিত পানি পান নিশ্চিত করতে হবে
♦ দীর্ঘ সময় উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা বা চিৎকার করা এড়িয়ে চলতে হবে
♦ অ্যালার্জির কারণ থেকে দূরে থাকতে হবে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত—
♦ গলা ব্যথা এক সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে
♦ শ্বাস নিতে কষ্ট হলে
♦ খাবার বা পানি গিলতে সমস্যা হলে
♦ উচ্চ জ্বর দীর্ঘ সময় থাকলে
♦ টনসিল বা ঘাড় অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেলে
♦ মুখ পুরোপুরি খুলতে না পারলে
♦ কণ্ঠস্বর তিন সপ্তাহের বেশি ভাঙা থাকলে
♦ বারবার গলা ব্যথা ফিরে এলে
♦ মুখ দিয়ে রক্ত এলে।
গলা ব্যথার চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করবেন চিকিৎসক। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন নয়।
লেখক : মেডিক্যাল অফিসার
ডেলটা হেলথ কেয়ার