• ই-পেপার

প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে ‘সেলসম্যানশিপ টেকনিক’ কর্মশালা

রিসার্চ ডটকমের র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইইউবি

রিসার্চ ডটকমের র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইইউবি

রিসার্চ ডটকমের বেস্ট ইউনিভার্সিটিজ ইন বাংলাদেশ ২০২৫-২৬ র‌্যাংকিংয়ে দেশের শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি)। র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আইইউবির অবস্থান তৃতীয়। র‌্যাংকিংয়ে আইইউবির দুজন গবেষক, ৩৩২টি প্রকাশনা এবং সম্মিলিত এইচ-ইনডেক্স ১১৮ উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং দ্বিতীয় স্থানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এ ছাড়া মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ের র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম অবস্থানে রয়েছে আইইউবি। এর ফলে দুটি আন্তর্জাতিক গবেষণাভিত্তিক র‌্যাংকিংয়ে বিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দেশের সেরা অবস্থান অর্জন করল আইইউবি। রিসার্চ ডটকম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষকদের গবেষণা কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে র‌্যাংকিং প্রকাশ করে। এর আগে নেচার ইনডেক্স র‌্যাংকিংয়েও দেশের শীর্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পায় আইইউবি। একই র‌্যাংকিংয়ে ফিজিক্যাল সায়েন্সেস বা পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে বাংলাদেশে প্রথম হয় বিশ্ববিদ্যালয়টি। আইইউবির উপাচার্য ড. ম. তামিম বলেন, এই অর্জনগুলো প্রমাণ করে যে একাধিক বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে আইইউবির গবেষণা সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দৃশ্যমান হচ্ছে। মানসম্মত গবেষণার পরিবেশ তৈরি, শক্তিশালী গবেষকদল গঠন এবং আন্তর্জাতিক মানের কাজকে উৎসাহিত করাই আমাদের লক্ষ্য। সহ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. ড্যানিয়েল ডব্লিউ লুন্ড বলেন, গবেষণাভিত্তিক র‌্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো প্রকাশনা ও গবেষণার প্রভাবের মতো পরিমাপযোগ্য সূচকের ওপর নির্ভর করে।

 

ক্যাম্পাস সংবাদ

রোভার প্রতিযোগিতায় বিশ্বে তৃতীয়, এশিয়ায় প্রথম ইউআইইউ

সিলেবাসে নেই ডেস্ক
রোভার প্রতিযোগিতায় বিশ্বে তৃতীয়, এশিয়ায় প্রথম ইউআইইউ

ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি)-২০২৬ প্রতিযোগিতায় বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ইউআইইউ)। সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবটিকস (সিএআইআর) দ্বারা পরিচালিত ইউআইইউ মার্স রোভার টিম ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্য মার্স সোসাইটি এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এশিয়ার ২০ বছরের রোভার প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এটি একটি অনন্য অর্জন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। গত ২৭ থেকে ৩০ মে ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্রের মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে (এমডিআরএস) এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইউআইইউ মার্স রোভার টিম ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচবারের মতো এশিয়ায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে। চার দিনব্যাপী চূড়ান্ত রাউন্ডে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন, চরম পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা এবং ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিংএই চারটি মিশনই সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। বিশ্বের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে এসব মিশনে নিজেদের সক্ষমতা ও পরিচালন দক্ষতা প্রমাণ করেছে ইউআইইউ মার্স রোভার। ইউআইইউ মার্স রোভার টিম ইউআরসি-২০২৬ প্রতিযোগিতায় সর্বমোট ৪০৪.৪৪ পয়েন্ট পেয়ে বিশ্বের শীর্ষ রোভার দলগুলোর মধ্যে তৃতীয় এবং এশীয় দলগুলোর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এ ছাড়া প্রতিযোগিতার পোডিয়ামে স্থান পাওয়ার পাশাপাশি দলটি বেস্ট অটোনোমাস সিস্টেম স্বীকৃতি লাভ করেছে। চূড়ান্ত ফলাফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি ইউনিভার্সিটি অব এসঅ্যান্ডটি মার্স রোভার ডিজাইন টিম ৪৬৯.৫৭ পয়েন্ট পেয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ নোভা রোভার ৪১২.৪১ পয়েন্ট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান এবং বাংলাদেশের ইউআইইউ মার্স রোভার টিম ৪০৪.৪৪ পয়েন্ট পেয়ে তৃতীয় হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে। এই প্রতিযোগিতায় প্রাথমিকভাবে সারা বিশ্ব থেকে মোট ১১৬টি বিশ্ববিদ্যালয় দল অংশ নেয়। বিভিন্ন পর্যায়ের মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের মার্স ডেজার্ট রিসার্চ স্টেশনে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য মাত্র ৩৮টি দলকে নির্বাচিত করা হয়। ইউআইইউ মার্স রোভার টিম শুধু বিশ্বের সেরা দলগুলোর মধ্যেই যোগ্যতা অর্জন করেনি, বরং শেষ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, যেমনযুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ড, ভারত, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো ও তুরস্ক থেকে মোট ৩৮টি দল গ্র্যান্ড ফাইনালে অংশ নেয়। অন-সাইট ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জের ২০ বছরের ইতিহাসে ইউআইইউ মার্স রোভার টিম প্রথম এশীয় দল হিসেবে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ পোডিয়ামে স্থান করে নিয়েছে। ইউআইইউ মার্স রোভার টিমের পরামর্শক হিসেবে ছিলেন ইউআইইউ স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন প্রফেসর ড. হাসান সারওয়ার এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ড. সুমন আহমেদ। টিমের মেন্টর হিসেবে ছিলেন ইউআইইউ কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসাইন। ইউআইইউ সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবটিকসের ৯ জন শিক্ষার্থীর একটি দল প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এই প্রকল্পের টিম লিডার হিসেবে ছিলেন শাইফ আল শাদ। এ ছাড়া সিনিয়র লিডে মো. মোসফিকুর রহমান, কো-টিম লিডে শেখ সাকিব হোসেন, মেকানিক্যাল টিম লিডে সিয়াম ইবনে সারওয়ার, অটোনোমাস টিম লিডে মো. সালমান কবির চৌধুরী, সায়েন্স টিম লিডে আয়েশা আক্তার সায়মা, কমিউনিকেশন টিম লিডে সাব্বির আহমেদ, মেকানিক্যাল টিম মেম্বার হিসেবে মো. মিমতিয়াজে ইসলাম হিমেল এবং কমিউনিকেশন টিম মেম্বার হিসেবে মোহাম্মদ তাম্মায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। রোবটিকস, স্বায়ত্তশাসিত ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এমবেডেড সিস্টেম ও মেকানিক্যাল ডিজাইনে উন্নত গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে দলটি বিশ্বমঞ্চে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে আসছে।

বিজয়ী দলকে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মাধ্যমে বরণ করার পাশাপাশি ঐতিহাসিক অর্জনের সাফল্য এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতে ৭ জুন ২০২৬ ইউআইইউ ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ইউআইইউয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ও ট্রেজারার ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুল মোকাদ্দেম, আইএআরের নির্বাহী পরিচালক ও প্রফেসর ইমেরিটাস ড. এম রিজওয়ান খান, স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন প্রফেসর ড. হাসান সারওয়ার, রেজিস্ট্রার ডা. মো. জুলফিকার রহমান এবং ইউআইইউ মার্স রোভার টিমের মেন্টর ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আবিদ হোসাইন। অনুষ্ঠান সঞ্চলনায় ছিলেন ইউআইইউ স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন অফিসের পরিচালক আবু সাদাত।

 

ফুটবল মাঠের জ্যামিতি

আল সানি
ফুটবল মাঠের জ্যামিতি

২০০১ সালের মে মাসের এক রাতের কথা। জার্মানির মিউনিখে স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল ম্যাচ চলছে। মুখোমুখি বায়ার্ন মিউনিখ ও ভ্যালেন্সিয়া। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষে ম্যাচ গড়াল টাইব্রেকারে। চারদিকে টান টান উত্তেজনা। ভ্যালেন্সিয়ার খেলোয়াড়রা একের পর এক শট নিচ্ছেন। বায়ার্ন গোলরক্ষক অলিভার কান তখন প্রতিবারই নিখুঁত অনুমান করে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। শেষ পর্যন্ত তিনটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে বায়ার্নকে চ্যাম্পিয়ন করেন তিনি। ফুটবলবিশ্ব তখন অলিভার কানের বীরত্ব দেখে মুগ্ধ, কিন্তু ম্যাচ শেষে জানা গেল আসল রহস্য। বায়ার্নের কোচিং স্টাফরা ম্যাচের আগে বিগত কয়েক বছরের পেনাল্টি শটের তথ্য-উপাত্ত জোগাড় করে বিশ্লেষণ করেছিলেন। কোন খেলোয়াড় বিগত ম্যাচগুলোতে গোলপোস্টের কোন কোণ দিয়ে কত শতাংশ শট মেরেছে, এর পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়। এরপর নিখুঁত সম্ভাব্যতা তত্ত্ব কষে অলিভার কানের হাতে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেয় স্টাফরা। পেনাল্টির সেই ভাগ্য পরীক্ষা আসলে স্রেফ ভাগ্য ছিল না। খেলার নেপথ্যে ছিল গাণিতিক খেলা। আমরা গ্যালারিতে বসে বা টিভির পর্দায় চোখ রেখে খেলাকে স্রেফ পা আর বলের তীব্র লড়াই মনে করি। কিন্তু গণিতবিদদের চোখে ফুটবল মাঠটা আসলে কোণ, দূরত্ব আর নেটওয়ার্ক অ্যানালিসিসের এক বিশাল জীবন্ত ক্যানভাস। মাঠের আড়ালের এই গণিত নিয়েই মূলত আধুনিক ফুটবলবিশ্ব এখন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য আর ট্রফি জয়ের নিখুঁত নকশা সাজাচ্ছে। বার্সেলোনা বা ম্যানচেস্টার সিটির ফুটবল মানেই চোখের পলকে ছোট ছোট পাসের এক জাদুকরী ছন্দ, যাকে সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা তিকিতাকা নামে চেনে। আপাতদৃষ্টিতে একে স্রেফ পায়ের কারুকাজ মনে হলেও এর মূল ভিত্তি কিন্তু একদম খাঁটি জ্যামিতি। মাঠে যখন তিনজন খেলোয়াড় নিজেদের মধ্যে পাসিং পজিশন নেন, তাঁরা অবচেতনভাবেই মাঠে একটা নিখুঁত সমবাহু বা সমদ্বিবাহু ত্রিভুজ তৈরি করে ফেলেন। বল যাঁর পায়ে থাকে তাঁর পাস দেওয়ার জন্য সব সময় অন্তত দুটি কোণ খোলা বা ওপেন রাখতে হয়। পেপ গার্দিওলার মতো বিশ্বসেরা কোচরা পুরো ফুটবল মাঠকে গ্রাফ পেপারের মতো ২০টি নির্দিষ্ট জ্যামিতিক জোনে ভাগ করে নেন। কোন জোনে খেলোয়াড়দের অবস্থান কেমন হবে এবং পাসের কোণ কত ডিগ্রি হবে, এর নিখুঁত গাণিতিক ছক ড্রেসিংরুমের বোর্ডে আগেই এঁকে দেওয়া হয়। বিশ্বকাপে যখন আর্জেন্টিনা বা স্পেনের মতো দলগুলো মাঠে নামবে, তখন তাদের এই জ্যামিতিক পজিশনই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে মুহূর্তে এলোমেলো করে দেবে। আবার যখন ম্যানচেস্টার সিটির কেভিন দে ব্রুইনা মাঝমাঠের ল্যাবরেটরি থেকে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পায়ের ফাঁক গলে স্ট্রাইকারের উদ্দেশে বল বাড়িয়ে দেন, তখন তিনি অজান্তেই মাথার ভেতর ত্রিকোণমিতির এক জটিল হিসাব কষে ফেলেন। আধুনিক ফুটবলের ভাষায় একে বলা হয় এক্সপেক্টেড অ্যাসিস্ট বা নিখুঁত পাসিং লাইন। এখানে বলের গতি, ডিফেন্ডারের দূরত্ব এবং স্ট্রাইকারের দৌড়ের গতিপথের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট কোণ তৈরি করতে হয়। ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডে দেখা সাইন বা কসের সূত্রগুলোই মাঠে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে কাজ করে। পাস যদি ১ ডিগ্রি কোণ এদিক-ওদিক হয় তাহলে বল চলে যাবে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারের পায়ে। আর ঠিকঠাক কোণ মেলাতে পারলেই তা পরিণত হয় অসাধারণ গোলে।

বিশ্বকাপে রিয়াল মাদ্রিদ বা বায়ার্ন মিউনিখের একঝাঁক তারকা যখন নিজ নিজ দেশের জার্সিতে এই নিখুঁত কোণ মেলাবেন, তখনই গ্যালারিতে উঠবে গোলের উল্লাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর গণিতে গ্রাফ থিওরি বা নেটওয়ার্ক অ্যানালিসিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়, যা এখন ফুটবল দলগুলোর ম্যাচ জেতার প্রধান হাতিয়ার। আধুনিক ফুটবলের ল্যাবে খেলা চলাকালে ১১ জন খেলোয়াড়কে একেকটি নোড এবং তাঁদের মধ্যকার পাসগুলোকে একেকটি এজ হিসেবে ধরা হয়। পুরো ৯০ মিনিটে কোন খেলোয়াড় কার কাছে সবচেয়ে বেশি পাস দিয়েছেন এবং কোন লিংক বা কানেকশনটি সবচেয়ে শক্তিশালীএর একটি নেটওয়ার্ক ম্যাপ তৈরি করা হয়। গত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর্জেন্টিনা বা রানার্স আপ ফ্রান্সের মতো দলগুলো এই গ্রাফ থিওরি ব্যবহার করেই প্রতিপক্ষের মাঝমাঠের মূল লিংকম্যানকে ব্লক করে দেওয়ার গাণিতিক রূপরেখা তৈরি করে। মাঝমাঠের সেই প্রধান নোডটি নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারলেই প্রতিপক্ষের পুরো আক্রমণভাগ পঙ্গু হয়ে যায়। আসন্ন বিশ্বকাপে এই গ্রাফ থিওরিতে যে দল যত বেশি দক্ষ হবে তাদের হাতেই উঠবে সোনালি ট্রফি। ঠিক একইভাবে পেনাল্টি শ্যুট আউটের ওই স্নায়ুক্ষয়ী মুহূর্তে গোলরক্ষক ও শ্যুটারের মধ্যে যা চলে, গণিতের ভাষায় তাকে বলা হয় জিরো-সাম গেম থিওরি। বিখ্যাত গণিতবিদ জন ন্যাশের ন্যাশ ইকুইলিব্রিয়াম সূত্র ব্যবহার করে বড় বড় ক্লাব এবং জাতীয় দলগুলো পেনাল্টি শ্যুট আউটের ডেটা অ্যানালিসিস বা তথ্য বিশ্লেষণ করে।

 

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা

শুধু ডিগ্রি থাকাই এখন যথেষ্ট নয়, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাস্তবসম্মত পড়াশোনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতারও দরকার আছে। তাই শিক্ষার বিভিন্ন ধারা ও বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে জানা জরুরি। এ বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার পিএইচডি শিক্ষার্থী মো. জয়নাল আবেদিন

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা

শিক্ষার্থীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হচ্ছে পড়াশোনার বিষয় বা লাইন নির্বাচন। শিক্ষার্থী ও তাঁদের অভিভাবকরা ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার চিন্তা থেকেই কোনো একটি পথ, বিষয়, ধরন বা পড়াশোনার লাইন বেছে নেন। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট আর আগের মতো নেই। ডিগ্রির পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, যোগাযোগ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মূলত পাঁচ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা বেশি দেখা যায়একাডেমিক শিক্ষা, কোর্সভিত্তিক শিক্ষা, প্রফেশনাল শিক্ষা, স্কিল-বেইসড শিক্ষা ও চার্টার্ড ডিগ্রি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো জানা উচিত।

 

একাডেমিক ও গবেষণাভিত্তিক পড়াশোনা

একাডেমিক শিক্ষা হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে যেসব ডিগ্রি দেওয়া হয়, যেমনবিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর কিংবা পিএইচডিএসবই একাডেমিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত। এই শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। ক্লাস, মিডটার্ম, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন ও চূড়ান্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা হয়। এখানে জ্ঞানচর্চা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, গবেষণা ও তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষকতা, গবেষণা, বিসিএস, ব্যাংকিং, করপোরেট চাকরি ও বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এ ধরনের পড়াশোনার মূল্যায়ন অবশ্যই আছে। তবে শুধু ডিগ্রি থাকলেই এখন আর সফলতা নিশ্চিত হয় না; বরং সফট স্কিল, ইংরেজি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাও জরুরি হয়ে উঠেছে। কারণ বাংলাদেশের বাস্তবতায় শুধু ডিগ্রি নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।

কোর্সভিত্তিক পড়াশোনা

বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ডিপ্লোমা, ভোকেশনাল ট্রেনিং, সার্টিফিকেট কোর্স, আইটি ট্রেনিং ও টেকনিক্যাল শিক্ষার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। কারণ এই শিক্ষাব্যবস্থায় কম সময়ে দক্ষতা অর্জন করে দ্রুত চাকরিতে প্রবেশ করা যায়। এ ধরনের শিক্ষায় থিসিস বা গবেষণার চাপ নেই বললেই চলে। এখানে হাতে-কলমে কাজ শেখায় জোর দেওয়া হয়; যেমনহোটেল ম্যানেজমেন্ট, নেটওয়ার্কিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, মেডিক্যাল টেকনোলজি, আইটি সাপোর্ট ইত্যাদি। অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক কারণে দ্রুত আয় করতে চান। তাই তাঁরা এই ধরনের কর্মমুখী বা কারিগরি শিক্ষা বেছে নেন। তবে এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এখানে গভীর তাত্ত্বিক জ্ঞান তৈরি হয় না। তাই কোর্স নির্বাচনের আগে প্রতিষ্ঠানের মান যাচাই করাও জরুরি।

 

প্রফেশনাল শিক্ষা কেন জরুরি

বাংলাদেশে ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, ফার্মেসি ও আর্কিটেকচার দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে সম্মানজনক শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কারণ এই শিক্ষাগুলো শুধু ডিগ্রি নয়, বরং সরাসরি একটি পেশার সঙ্গে যুক্ত। একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার সমাজে বিশেষ মর্যাদা পান। দীর্ঘ মেয়াদে এ ধরনের পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার স্থিতিশীল। তাই এ ধরনের শিক্ষায় প্রতিযোগিতাও অনেক বেশি। মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষায় লাখো শিক্ষার্থী অংশ নেন, কিন্তু সুযোগ পান অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী।

 

দক্ষতানির্ভর শিক্ষা

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তনশীল শিক্ষাব্যবস্থা হলো দক্ষতানির্ভর শিক্ষা। গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, এআই, সাইবার সিকিউরিটি, ভিডিও এডিটিং, ইউআই/ইউএক্স ডিজাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো দক্ষতার চাহিদা এখন বিশ্বব্যাপী। এসব শিক্ষা বা দক্ষতার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, দ্রুত আয় শুরু করা যায়। আন্তর্জাতিক বাজারেও কাজের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশে এখন হাজারো তরুণ ঘরে বসে ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে বিদেশি ক্লায়েন্টের কাজ করছেন। তবে এই লাইনে সফল হতে হলে আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধারাবাহিক শেখার মানসিকতা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন।  এ ক্ষেত্রে ডিগ্রির চেয়ে দক্ষতাকে বেশি মূল্যায়ন করা হয়।

 

চার্টার্ড ডিগ্রির চ্যালেঞ্জ ও সুবিধা

বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং অথচ উচ্চ সম্ভাবনাময় শিক্ষাব্যবস্থাগুলোর একটি হলো চার্টার্ড শিক্ষা। আইসিএবি, আইসিএমএবি ও আইসিএসবির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অ্যাকাউন্টিং, অডিট, ফিন্যান্স, ট্যাক্সেশন ও করপোরেট গভর্ন্যান্সের ওপর প্রফেশনাল কোর্স পরিচালনা করছে। এই ব্যবস্থায় সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিদিন ক্লাস, প্রেজেন্টেশন বা উপস্থিতির চাপ কম থাকলেও খুব কঠিন পরীক্ষা হয়। পাসের হার কম হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী মাঝপথে হতাশ হয়ে পড়েন। তবে যাঁরা সফলভাবে সব ধাপ অতিক্রম করতে পারেন, তাঁদের কপাল খুলে যায়। করপোরেট জগতে তাঁরা উচ্চ বেতনের চাকরি পান। তাঁদের দ্রুত ক্যারিয়ার গ্রোথেরও সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে চার্টার্ড পেশাজীবীদের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

শুধু ডিগ্রিই যথেষ্ট নয়

একসময় সমাজে ধারণা ছিল, অনার্স-মাস্টার্স শেষ করলেই চাকরি পাওয়া যাবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এখন চাকরিদাতারা শুধু সার্টিফিকেট নয়, বাস্তব দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে স্নাতকধারীরা চাকরি পাচ্ছেন না। কারণ তাঁদের বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা নেই। অন্যদিকে একজন দক্ষ সফটওয়্যার ডেভেলপার বা ডিজিটাল মার্কেটিং অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছাড়াও আন্তর্জাতিক মার্কেটে দাপট নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তাই বর্তমান যুগে ডিগ্রি ও দক্ষতার সমন্বয় করতে পারলেই ভালো ক্যারিয়ার   গড়া সম্ভব।

 

চাকরির বাজারে পরিবর্তন

বাংলাদেশের চাকরির বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে সরকারি চাকরি বা ব্যাংকিংকেই সবচেয়ে নিরাপদ ক্যারিয়ার মনে করা হতো। এখন প্রযুক্তিনির্ভর পেশার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এআই, ডেটা অ্যানালিটিকস, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো খাতে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি রিমোট জব ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুযোগও বাড়ছে। ফলে একজন বাংলাদেশি তরুণ এখন দেশের বাইরে না গিয়েও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করতে পারছেন। ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে সবচেয়ে মূল্যবান হবে প্রবলেম সলভিং স্কিল, কমিউনিকেশন স্কিল, ক্রিয়েটিভিটি ও টেকনোলজি অ্যাডাপ্টেবিলিটি।

 

অভিভাবকদের নতুন করে ভাবতে হবে

বাংলাদেশে এখনো অনেক পরিবার মনে করে, শুধু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারি কর্মকর্তা হলেই জীবন সফল! ফলে অনেক শিক্ষার্থী নিজের আগ্রহের বিরুদ্ধে গিয়ে অভিভাবকের চাপে পড়াশোনা করেন। পরে তাঁরা হতাশ হয়ে পড়েন। বাস্তবে সবাই তো একই ক্ষেত্র বা কাজে দক্ষ নন। কেউ গবেষণায় ভালো, কেউ প্রযুক্তিতে, কেউ সৃজনশীল কাজে, আবার কেউ নেতৃত্বে। একজন শিক্ষার্থীর দক্ষতা, আগ্রহ ও ব্যক্তিত্ব বুঝে তাঁকে পথ বেছে নিতে সহায়তা করা উচিত। কারণ জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বিষয় বা ক্যারিয়ার দীর্ঘ মেয়াদে সন্তানের মানসিক চাপ ও ব্যর্থতার কারণ হতে পারে।

 

ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থা

ভবিষ্যতে শুধু মুখস্থনির্ভর পড়াশোনা দিয়ে টিকে থাকা কঠিন হবে। ভবিষ্যতের শিক্ষা হবে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানকেন্দ্রিক। এআই ও অটোমেশন অনেক প্রচলিত চাকরির স্থান দখল করে নিচ্ছে। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা অনেক বেড়ে যাবে। তাই ভবিষ্যতে শুধু তাঁরাই সফল হবেন, যাঁরা নতুন প্রযুক্তি শিখতে পারবেন, দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবেন এবং সৃজনশীলভাবে চিন্তা করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির পাশাপাশি কোডিং এআই, কমিউনিকেশন স্কিল, লিডারশিপ ও এন্টারপ্রেনারশিপের মতো দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

 

সফলতা কোন পথে

সফলতা নির্ভর করে একজন মানুষের আগ্রহ, পরিশ্রম, ধৈর্য, দক্ষতা ও মানসিকতার ওপর। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক যেমন সফল হতে পারেন, তেমনি একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপার, ডাক্তার বা গ্রাফিক ডিজাইনারও নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফল হতে পারেন। আসল বিষয় হলো নিজের শক্তি ও আগ্রহ বুঝে সঠিক পথ নির্বাচন করা এবং ধারাবাহিকভাবে নিজের উন্নয়ন করা। সব সময় শেখার মানসিকতা রাখতে হবে।