বিশ্বজুড়ে এআই বিপ্লব উচ্চশিক্ষায় কী ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছে বলে আপনি মনে করেন?
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই উচ্চশিক্ষার গতানুগতিক ধারাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এটি একদিকে যেমন গবেষণার গতি ও পরিধি বাড়িয়েছে, তেমনি ব্যক্তিগত শিখন (পারসোনালাইজড লার্নিং) পদ্ধতি ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে শিক্ষাদানে এক আধুনিক মাত্রা যোগ করেছে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এআই যুগের জন্য কতটা প্রস্তুত? আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের এআইসংক্রান্ত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে আমরা এরই মধ্যে কারিকুলাম আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাদানে জোর দিচ্ছি। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে এআই চর্চা ও উদ্ভাবনে উৎসাহিত করতে আমাদের একটি সক্রিয় ‘এআই ক্লাব’ রয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের এআইভিত্তিক গবেষণায় আরো বেশি সম্পৃক্ত করা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি এরই মধ্যে সেন্টার ফর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রোবটিকস রিসার্চ নামের একটি অত্যাধুনিক গবেষণাগার তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশের এআইভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।
এআইকে আপনি সুযোগ হিসেবে দেখেন, নাকি এটি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে? এআইয়ের কারণে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনে নিরুৎসাহ হতে পারে, এমনও মনে করছে অনেকে। এ বিষয়ে আপনাদের
মত কী?
এআই মূলত একটি বিশাল সুযোগ, তবে এটি নিঃসন্দেহে কিছু নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। অতিরিক্ত নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মৌলিক চিন্তাধারা ও জ্ঞান অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই এআইকে অন্ধভাবে অনুসরণ না করে একটি সহায়ক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে এআই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে কিভাবে বদলে দিতে পারে?
আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে এআই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। প্রশাসনিক কাজ থেকে শুরু করে শিক্ষাদান, মূল্যায়ন ও গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠবে এবং শিক্ষাব্যবস্থা আরো বেশি ডেটানির্ভর হবে।
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই টুল ব্যবহারের প্রবণতা কেমন? এ ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী? শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এআই প্রশিক্ষণের জন্য কী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন?
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই টুল ব্যবহারের প্রবণতা অত্যন্ত দ্রুত বাড়ছে। আমার পরামর্শ হলো, এর ব্যবহার হতে হবে সম্পূর্ণ নৈতিক ও গঠনমূলক। এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এরই মধ্যে বিভাগ-নির্বিশেষে সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর জন্য নিয়মিতভাবে এআই লিটারেসি ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে, যাতে সবাই এই আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ও দায়িত্বশীল ব্যবহার শিখতে পারে।
চ্যাটজিপিটি বা এআই ব্যবহার করে অ্যাসাইনমেন্ট বা গবেষণাপত্র তৈরির বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন? কোন পর্যায় পর্যন্ত এআই ব্যবহার গ্রহণযোগ্য এবং কোথায় এটি অসদাচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে?
কোনো বিষয়ের প্রাথমিক ধারণা নেওয়া বা তথ্য গোছানোর জন্য চ্যাটজিপিটির মতো টুলের সহায়তা নেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে; কিন্তু এআই দিয়ে হুবহু কাজ করিয়ে নিজের নামে জমা দেওয়া বা নিজস্ব চিন্তার কোনো প্রয়োগ না করাটা সম্পূর্ণ একাডেমিক অসদাচরণ হিসেবেই বিবেচিত হবে।
অতিরিক্ত এআইনির্ভরতা ঠেকাতে কী ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োজন? এআই কি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা বাড়াবে, নাকি কমিয়ে দেবে?
নির্ভরতা ঠেকাতে প্রজেক্ট ও ব্যাবহারিক কাজের ওপর জোর দিতে হবে। এআইকে সঠিক উপায়ে ব্যবহার করলে এটি রুটিন কাজে মানুষের সময় বাঁচিয়ে সৃজনশীল কাজে মনোযোগ দিতে সাহায্য করবে। তবে এর নেতিবাচক ব্যবহার শিক্ষার্থীদের নিজস্ব সৃজনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে।
পরীক্ষাপদ্ধতি ও মূল্যায়ন ব্যবস্থায় কি পরিবর্তন আনার সময় এসেছে? এআইনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় প্রচলিত পরীক্ষাপদ্ধতি কি অচল হয়ে যাবে? এআই কি ভবিষ্যতে শিক্ষকদের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে?
প্রচলিত মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা এখন অত্যাবশ্যক। মুখস্থবিদ্যার বদলে ক্রিটিক্যাল থিংকিংভিত্তিক মূল্যায়নের দিকে ঝুঁকতে হবে। তবে এআই কখনোই শিক্ষকদের বিকল্প হতে পারবে না; বরং এটি শিক্ষকদের একটি শক্তিশালী সহায়ক মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই সম্পর্কিত কোর্স চালু করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য কি এআই কোর্স থাকা উচিত?
এর প্রয়োজনীয়তা এখন প্রচুর। শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং বা আইটি নয়, কলা, বাণিজ্য বা সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্যও এআইয়ের বেসিক কোর্স থাকা উচিত, কারণ প্রযুক্তির এই প্রভাব এখন সব খাতের জন্যই প্রাসঙ্গিক।
ভবিষ্যতের কর্মবাজার মাথায় রেখে কারিকুলামে কী ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার? আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কী ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে?
কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে কারিকুলামে ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে টিকে থাকতে হলে হাতে-কলমে শিক্ষা এবং স্কিলভিত্তিক আধুনিক কারিকুলামের কোনো বিকল্প নেই।
এআই কি কর্মসংস্থানের জন্য হুমকি, নাকি নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করবে? ভবিষ্যতে কোন ধরনের চাকরিতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন আসবে বলে আপনি মনে করেন?
এআই গতানুগতিক কিছু চাকরি বিলুপ্ত করলেও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর অসংখ্য কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করবে। ডেটা এন্ট্রি বা রুটিন কাজের চাকরিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে, তবে এআই পরিচালনা ও বিশ্লেষণে দক্ষ মানবসম্পদের চাহিদা বহুগুণ বাড়বে। আগামী দিনে এআইকে কে কত দক্ষতার সঙ্গে নিজের পেশাগত কাজে ব্যবহার করতে পারছে, সেটিই কর্মক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীদের অন্যতম বড় একটি যোগ্যতা বা স্কিল হিসেবে বিবেচিত হবে।



পাচ্ছে। গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ, পাঠদান এবং প্রশাসনিক কাজ অনেক সহজ ও দ্রুত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন নতুন বিষয় ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তি তো আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলায়, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতা এগুলো একজন মানুষকে তার স্থায়ী পরিচয় তৈরি করে দেয়। তাই আমরা এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে একজন শিক্ষার্থী শুধু প্রযুক্তিতে দক্ষ পেশাজীবী হবে এমনটা নয়; বরং সমাজের প্রতি তার দায়বদ্ধতা থাকবে, সে নৈতিকতার সঙ্গে জীবন যাপন করবে, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে। এআই আমাদের কাজকে সহজ করবে, হয়তো ক্ষেত্র বিশেষে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে; কিন্তু আমাদের সৃজনশীলতা কিংবা এক মানুষের প্রতি অন্য মানুষের সহমর্মিতা, সহানুভূতি এসব মানবিক বিষয় একান্তই মানুষের কাছে থেকে যাবে। তাই আমি মনে করি প্রযুক্তি এবং মানবিকতার এই সমন্বয়ই আগামী দিনের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সুযোগ।