রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার সময় খুদে গোয়েন্দা লব্ধ সৈকত দেখল শান্ত শ্রাবণদের বাড়ির ছাদে কি যেন একটা নড়াচড়া করছে। ভালো করে তাকাতে শ্রাবণকে চিনতে পারল, চিৎকার করে বলল, 'এই শান্ত, ছাদের কিনারায় কী করছিস, নিচে নেমে আয়।' 'আমাকে বিরক্ত করো না।' বলল শ্রাবণ। নিজের দুই হাতে একটা করে কাগজের তৈরি ডানা লাগিয়ে রেখেছে সে। চোখ দুটো বন্ধ করে একটু একটু দুলতে শুরু করল, যেন টলছে। 'এই, কী করছ তুমি?' জিজ্ঞেস করল সৈকত। 'নিজেকে সম্মোহিত করছি।' জবাব দিল শ্রাবণ। 'সেটা তুমি মাটিতে দাঁড়িয়ে করতে পারো না?' 'সম্মোহিত হওয়ার পর নিজেকে বলতে যাচ্ছি, আমি একটা পাখি।' বলল শ্রাবণ; তার বয়স আট এবং তার একটা মস্ত দুর্বলতা হলো, যে যা বলে সব সে কোনো রকম সন্দেহ ছাড়াই বিশ্বাস করে ফেলে। 'তারপর আমি আকাশে উড়ব।' 'তুমি উড়বে পাথরের তৈরি ঘুড়ির মতো।' বলল সৈকত। 'নাহ্। তুমি যা ভাবছ তা ঠিক নয়। একটা কাজ করবে। শাকিল বৈশাখ উড়েছে...' 'ধ্যাত, বোকা! প্লেন ছাড়া মানুষ কখনো উড়তে পারে না!' গলা চড়িয়ে বলল সৈকত। 'ছাদ থেকে লাফ দিয়ে একবার দেখই না, হাড়ে হাড়ে টের পাবে ওড়া কাকে বলে।' 'এ রকম একটা কথা বলতে পারো না তুমি।' অভিযোগ করল শ্রাবণ। ছাদ থেকে নেমে এলো সে। 'তবু, তুমি বাধা দেওয়ায় আমি খুশি। কেন যেন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিলাম।' 'কেন তোমার মনে হলো যে তুমি উড়তে পারবে?' জানতে চাইল সৈকত। 'শাকিল বৈশাখ আমাকে বলেছে পারব।' জবাব দিল শ্রাবণ। 'এই ডানা দুটো ৩০ টাকায় আমাকে বিক্রি করেছে সে। আরো ৩০ টাকা চেয়েছিল আমাকে সম্মোহিত করার জন্য। কিন্তু আমার কাছে আর টাকা নেই। কাজেই লাইব্রেরি থেকে সম্মোহনের ওপর লেখা একটা বই নিয়ে এসে প্র্যাকটিস করছি...' 'শাকিল বৈশাখ যদি উড়তে পারে, অল্প কয়টা টাকার বিনিময়ে সেই গোপন বিদ্যা তোমাকে বেচত না সে।' যুক্তি দেখাল সৈকত। 'এটা সে কোটি কোটি টাকায় সামরিক বাহিনীর কাছে বিক্রি করত।' 'কিন্তু সদয় হাসান আমাকে বলেছে সে শাকিল বৈশাখকে উড়তে দেখেছে!' বলল শ্রাবণ। 'সদয় হাসান আর শাকিল বৈশাখ সম্ভবত পরস্পরের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে।' বলল সৈকত। 'মনে আছে, গত বছর হাই স্কুলে কী হয়েছিল?' মাথা ঝাঁকাল শ্রাবণ। গত বছর পরীক্ষার তিন দিন আগে ইংরেজির প্রশ্নপত্র চুরি করেছিল বৈশাখ। ওগুলো ৫০ টাকা করে ছাত্রদের মধ্যে বিক্রি করেছিল হাসান। ধরা পড়ায় দুজনকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে- এক বছর ওই একই ক্লাসে থাকতে হবে। 'আমাকে বোকা বানানো হয়েছে।' বিড়বিড় করল শ্রাবণ। 'এখন বুঝতে পারছি বিষয়টা আমি ভালো করে চিন্তা করে দেখিনি। উড়তে পারব, এই আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছিলাম। ভাই সৈকত, তুমি আমার ৩০ টাকা ফিরিয়ে এনে দিতে পারবে?' 'চেষ্টা করে দেখতে পারি। চল, সদয় হাসানের সঙ্গে কথা বলি। বৈশাখের মতো অত চতুর নয় সে।' 'তার চেয়ে বৈশাখের সঙ্গে কথা বলাটাই ভালো হবে বলে মনে করি আমি।' বলল শ্রাবণ। 'হাসান একটা কুস্তিগির টিমের সদস্য। সে আমাদের কোনো প্যাঁচে জড়িয়ে আটকে ফেলতে পারে।' সৈকত ভেবে দেখল শ্রাবণের কথায় যুক্তি আছে। কুস্তিগিরের প্যাঁচে পড়ে কুপোকাত হওয়ার চেয়ে বুদ্ধির প্যাঁচে পড়ে বোকা বনা অনেক ভালো। শাকিল বৈশাখের সঙ্গে কথা বলতে রওনা হলো ওরা। বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে ঘুড়ি বানাচ্ছিল বৈশাখ। সৈকতের বক্তব্য চুপচাপ শুনল সে। শ্রাবণের ৩০ টাকা ফেরত দিতে বলা হচ্ছে তাকে। 'কেন টাকা ফেরত দেব?' জানতে চাইল বৈশাখ। 'উড়তে পারব না, বিশ্বাসের এ রকম অভাব থাকলে সত্যি তুমি উড়তে পারবে না। প্রথমে তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে যে তুমি অবশ্যই উড়তে পারবে, বন্ধু।' তার কথায় কান না দিয়ে চাপ দিতে লাগল সৈকত। অবশেষে বৈশাখ বলল, সে যে উড়তে পারে, এটা সে প্রমাণ করে দেখাবে। ওদেরকে সে বলল, তুমুল তারিকের নার্সারির পেছনে ছোট্ট যে জঙ্গলটা আছে, সন্ধের পর ওখানে যেন ওরা থাকে। সন্ধে হতেই শ্রাবণকে নিয়ে জঙ্গলে ঢুকল সৈকত। 'এখানে অন্ধকার এত গাঢ়, বৈশাখ যদি আবর্জনাভর্তি ট্রাকে চড়ে আমার নাকের পাশ ঘেঁষে চলে যায়, তবু আমি তাকে দেখতে পাব না।' বলল শ্রাবণ। হঠাৎ করে কাছাকাছি একটা গাছের ওপর থেকে অদ্ভুত সব শব্দ ভেসে এলো। পরক্ষণে হড়কে বা পিছলে মাটিতে নেমে এলো শাকিল বৈশাখ। 'দেখলে তোমরা?' গর্বের সুরে চেঁচিয়ে উঠল সে। 'এটাকে বলে ক্র্যাশ ল্যান্ডিং! এ আমার নিতান্তই সৌভাগ্য যে আমি মারা যাইনি।' 'আমরা কিছুই দেখতে পাইনি।' বলল শ্রাবণ। 'অন্ধকার এত গাঢ় যে আমিও কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না, উড়ে এসে ওই গাছে ধাক্কা খেলাম।' বলল বৈশাখ, ডানা দুটো খুলছে। 'তা না হলে আমি তোমাদের পায়ের সামনে প্রজাপতির মতো ল্যান্ড করতাম।' 'তুমি শুরু থেকেই ওই গাছে চড়ে বসেছিলে।' দৃঢ় স্বরে বলল সৈকত। 'তাই নাকি?' খেঁকিয়ে উঠল বৈশাখ। 'ঘটনাচক্রে এর একজন সাক্ষী আছে। সদয় হাসান আমাদের চিলেকোঠার জানালা থেকে টেক অফ করতে দেখেছে আমাকে।' 'এখনই তুমি একবার টেক অফ করে দেখাচ্ছ না কেন?' 'কারণ উঁচু জায়গা থেকে শুরু করতে হবে আমাকে।' জবাব দিল বৈশাখ। 'ওই গাছগুলোর একটা থেকে টেক অফ করতে পারি আমি, কিন্তু ডালপালা বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তা ছাড়া আমার ডানা ভেঙে গেছে। আমার কাছে অতিরিক্ত ডানাও নেই।' তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকল। শ্রাবণের ৩০ টাকা ফেরত দেবে না বৈশাখ, আর টাকা না নিয়ে যাবে না সৈকত। অবশেষে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে মাথার ওপর হাত তুলল বৈশাখ। বলল, 'ঠিক আছে, কোত্থেকে আমি টেক অফ করেছি তোমাকে আমি সেই জায়গাটা দেখাব। কিন্তু এটাই শেষ। তার পরও যদি আমাকে বিরক্ত করো, আমার দিকে পেছন ফিরলেই আমি তোমার পেটে ঘুষি মারব।' 'উফ্!' বৈশাখের পিছু নিয়ে তার বাড়ির দিকে যাওয়ার পথে বারবার ফিসফিস করছে শ্রাবণ। 'উফ্! বৈশাখদের বাড়ির সামনে অপেক্ষা করছিল সদয় হাসান। বন্ধুর দিকে তাকিয়ে চোখ মটকাল বৈশাখ। সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুরু করল হাসান। 'সত্যি ভাই, কী দেখালে তুমি! আশ্চর্য একটা ফ্লাইট! ঠিক যেন ঈগল পাখির মতো সাবলীল উড়তে দেখলাম তোমাকে। শাকিল বৈশাখ, তুমি বাংলাদেশ বিমানকেও হার মানিয়ে দিয়েছ!' সদর দরজার তালা খুলল বৈশাখ। 'বাড়ির লোকজন বেড়াতে গেছে, আজ আমি একা।' বলল সে। পথ দেখিয়ে ওদের বাড়ির চিলেকোঠায় নিয়ে গেল বৈশাখ। আলো জ্বালার পর জানালার দিকে হেঁটে গেল সে। 'এটা আমার লঞ্চিং প্যাড।' বলল সে, পর্দা গুটিয়ে জানালার কাচ সরাল। 'ঠিক এখানে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি নিই আমি, মুড তৈরি করি- এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিজেকে সম্মোহিত করি। যখন বুঝতে পারলাম আমি প্রস্তুত, সামনের দিকে মাথা বের করে ঝাঁপ দিলাম।' 'ধরো, কোথাও যদি তোমার ভুল হয়ে যায়? লাফ দেওয়ার সময় তুমি যদি পুরোপেরি সম্মোহিত না হও?' 'নিচে খসে পড়ব, ওই ঝোপের ওপর।' বলল বৈশাখ, ইঙ্গিতে বাড়ির পাশে গজানো ঝোপগুলো দেখাল। 'আজ রাতে ওখানে পড়েছিলে?' জিজ্ঞেস করল শ্রাবণ। 'না, আজকের ফ্লাইটটা ছিল একদম নিখুঁত।' বলল বৈশাখ। 'একবার জানালা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর সোজা জঙ্গলের দিকে উড়ে যাই আমি, এতটুকু নিচে না নেমে।' 'ভারি সুন্দর একটা ফ্লাইট ছিল ওটা।' একগাল হেসে বলল সদয় হাসান। 'আমি ওদের একটা কথাও বিশ্বাস করি না।' ফিসফিস করল শ্রাবণ। 'কিন্তু কিভাবে আমরা প্রমাণ করব যে ওই ডানা আর সম্মোহন, দুটোই ভুয়া?' 'প্রমাণ করতে হবে না।' বলল সৈকত। 'আমাদের হয়ে বৈশাখ নিজেই সেটা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছে।' শাকিল বৈশাখ কোথায় ভুল করল?