গত ১৮ জুলাই কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত সাড়ে সাত বছরে পুলিশের ৭৯ জন সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১০ জনের বেশি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন এবং তাঁদের বড় অংশই কনস্টেবল ও এএসআই পদমর্যাদার। খবরটি সবার জন্য রীতিমতো উদ্বেগের, উৎকণ্ঠার, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনী তথা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য। ৭৯ জন পুলিশ সদসস্যের আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আত্মহত্যাকারীদের অনেক পুলিশ সদস্যই ব্যক্তিগত, পারিবারিক নানা কারণসহ চাকরিজীবনের বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন। এসবের পাশাপাশি অনেকের মানসিকভাবে অসুস্থতা, বদলি ও পদায়ন জনিত সমস্যা, দীর্ঘদিন পরিবার থেকে দূরে থাকা, প্রয়োজন অনুযায়ী ছুটি না পাওয়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ইত্যাদি কারণ জড়িত থাকতে পারে। আর পুলিশের চাকরিতে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ঘুমের ঘাটতি, পারিবারিক টানাপড়েন, অপ্রতুল বেতন তথা আর্থিক সংকট, কর্মস্থলের চাপ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অনীহা প্রভৃতি বিষয় সাধারণত একসঙ্গে কাজ করে থাকে, যা রীতিমতো দুঃখজনক।
পুলিশ সদস্যসহ সবাইকেই স্মরণে রাখতে হবে, মানুষের জীবনে সমস্যা আসে এবং সমস্যা আসবেই। আর এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে জীবনে সমস্যা এলে আত্মহত্যা করে জীবনকে শেষ করে দিতে হবে। বরং জীবনে কোনো ধরনের সমস্যা এলে পুলিশ সদস্যসহ সবাইকে আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান করা উচিত। প্রয়োজনে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কোনো কাউন্সেলরের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। বলা বাহুল্য, আত্মহত্যা হচ্ছে মানবজীবনের এক চরম অসহায়ত্ব। ক্ষণিক আবেগে একটি মহামূল্যবান জীবনের চির অবসান ঘটানো, যা কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। আর আত্মহত্যার মাধ্যমে নিজের মূল্যবান জীবনকে যেমন একদিকে শেষ করে দেওয়া হয়, তেমনি একটি সম্ভাবনারও চির অবসান ঘটে। শুধু পুলিশ সদস্যই নয়, বরং যেকোনো ব্যক্তির আত্মহত্যা করার পেছনে যেসব কারণ সাধারণভাবে নিহিত থাকে, তার মধ্যে রয়েছে বিষণ্নতা, আর্থিক, সামাজিক, পারিবারিক সমস্যা কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত মনঃকষ্ট, বাইপোলার ডিস-অর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, পারসোনালিটি ডিস-অর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিস-অর্ডার, অ্যালকোহল ব্যবহার জনিত ডিস-অর্ডার ইত্যাদি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১২১ মিলিয়ন মানুষ মাত্রাতিরিক্ত বিষণ্নতার শিকার। ডব্লিউএইচওর জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বার্ষিক আত্মহত্যার হার ১১.৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যায়, শুধু ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে আট লাখ। হিসাব মতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে আত্মহত্যা সংঘটিত হচ্ছে। তবে এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। আর বাংলাদেশে বার্ষিক আত্মহত্যার সংখ্যা গড়ে ১০ হাজার ২২০। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আত্মহত্যার পেছনে কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়া, সম্পর্কের ঘাটতি বা বিচ্ছেদ ঘটা, অপরিসীম অর্থকষ্ট, যৌন, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন-নিপীড়ন, মাদকাসক্তি সংক্রান্ত সমস্যা, নানা ধরনের মানসিক অসুস্থতা ইত্যাদি। পাশাপাশি রয়েছে পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয়, প্রিয় বন্ধু-বান্ধবী কিংবা প্রিয় কোনো নেতা, অভিনেতা, শিল্পী, খেলোয়াড়ের আকস্মিক মৃত্যু বা আত্মহত্যার সংবাদ, কর্মস্থল বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সহকর্মী বা সহপাঠীদের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়া, দীর্ঘদিনের বেকারত্ব বা হঠাৎ চাকরিচ্যুতি বা চাকরিতে পদাবনতি ঘটা ইত্যাদি। এসব চিন্তা-ভাবনার ফলে মনের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড রকমের হতাশা ও ক্ষোভের কারণে মানুষ তার নিজের প্রতি আস্থা ও সম্মানবোধ হারিয়ে ফেলে। তখন থেকেই সে সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে এবং একসময় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার কিছু ব্যর্থতা কিংবা কোনো কিছু কারো কাছ থেকে চেয়ে না পাওয়ার বিষয়টিও মানুষকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়।
হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পুলিশে দুই লাখ ১৫ হাজারের বেশি সদস্য কর্মরত। তবে আশ্চর্যের বিষয়, তাঁদের চিকিৎসাসেবার জন্য রাজধানী ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও নেই স্থায়ী কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সেখানে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আরো আশ্চর্যের বিষয়, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেলেও কোথাও নেই পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশ সদস্যদের মানসিক সুস্থতা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি জননিরাপত্তার সঙ্গেও সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময়ের ডিউটি পালন, ছুটির সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ঝুঁকির কাজ এবং ট্রমার অভিজ্ঞতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই এসব বিষয় পুলিশপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে উপলব্ধি করে এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
বলা বাহুল্য, আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর বেশির ভাগই প্রতিরোধযোগ্য। বেশির ভাগ ব্যক্তিই আত্মহত্যার সময় কোনো না কোনো গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। পাশাপাশি আত্মহত্যা প্রতিরোধে কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলোকে প্রটেক্টিভ ফ্যাক্টর বলা হয়। যেমন—জীবনের খারাপ সময়গুলোতে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা জন্মানো, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মবিশ্বাস জন্মানো, সমস্যা সমাধানের কার্যকর দক্ষতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে অন্যের কাছ থেকে ইতিবাচক সহায়তা লাভের চেষ্টা করা ইত্যাদি। এসব ফ্যাক্টরকে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে রক্ষাকারী বা প্রতিরোধী বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। তা ছাড়া সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, অনুশাসন, ভালো বন্ধু, প্রতিবেশী ও সহকর্মীর সঙ্গে সামাজিক সুসম্পর্ক প্রভৃতি আত্মহত্যার প্রবণতা হ্রাসে সহায়তা করে। পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত নিদ্রা, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান ও মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকা তথা স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং শারীরিক ও মানসিক যেকোনো অসুস্থতায় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা লাভের সুযোগ আত্মহত্যার প্রবণতা কমায়। সুতরাং পুলিশ সদস্যদের হতাশা ও মানসিক অশান্তি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনমাফিক সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে দ্রুত পেশাদার কাউন্সেলর নিয়োগ করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি শুধু আত্মহত্যার ঘটনা-পরবর্তী তদন্ত নয়, বরং এ বিষয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, তাঁদের জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করা এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে তাঁদের বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজন পুলিশ সদস্যদের জন্য থাকার ব্যারাকগুলোর আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করা। সর্বোপরি প্রয়োজন তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, যা এখন সময়ের দাবি। পুলিশপ্রধান, সরকার তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট সবাই এ ক্ষেত্রে একযোগে আন্তরিকভাবে এগিয়ে এলে পুলিশ বাহিনীকে সর্বাধুনিক বাহিনীতে পরিণত করা সম্ভব। সম্ভব পুলিশকে জনগণের সত্যিকারের বন্ধুতে পরিণত করা। পুলিশ বাহিনীতে বিরাজমান নানা রকম সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সরকার আন্তরিক হলে এবং ওই সব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। তবে সবচেয়ে বড় কথা, পুলিশ সদস্যসহ সবাইকেই জীবনের গুরুত্ব ও মূল্য সম্পর্কে বুঝতে হবে। তাঁদের বুঝতে হবে, জীবন একটিই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে আর কোনো কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। পুলিশ সদস্যসহ সবারই স্মরণে রাখা প্রয়োজন, জীবনকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তাহলে জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়। তাই সবার উচিত আত্মহত্যার পথ পরিহার করে জীবনকে ভালোবাসতে শেখা; জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে শেখা এবং জীবনকে সুন্দরভাবে উপভোগ করতে শেখা।
লেখক : অধ্যাপক (আইন বিভাগ), ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং মেন্টর, রিমোর্ট লার্নিং ইন ক্রাইসিস অ্যান্ড ইমার্জেন্সিস ফাউন্ডেশন প্রোগ্রাম, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি (যুক্তরাজ্য)



এই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়েই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করা দরকার। শিশুরা এমন ভাষা শিখল কোথা থেকে? শিশু জন্মের সময় কোনো রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। সে জানে না কাকে অপমান করতে হয়, কাকে বিদ্রুপ করতে হয় কিংবা কিভাবে প্রতিপক্ষকে হেয় করতে হয়। এসব সে শেখে পরিবার থেকে, আশপাশের সমাজ থেকে, টেলিভিশনের পর্দা থেকে, ফেসবুকের ভিডিও থেকে, ইউটিউবের শর্টস থেকে এবং সর্বোপরি বড়দের কাছ থেকে। অর্থাৎ শিশুর মুখে যে ভাষা আমরা শুনি, সেটি আসলে আমাদেরই ভাষা। 

রপ্তানি খাতের প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি এখনো তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাত দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিয়েছে। কিন্তু একটিমাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্রেতারা এখন শুধু কম দামের পণ্য নয়; পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রম অধিকার, কার্বন নিঃসরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।